নৃশংস হত্যার শিকার শিশু তুহিনের মা

বাপ-চাচা জড়িত থাকলে তাদেরও যেন শাস্তি হয়

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ০১:৪৬ এএম

সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে নৃশংসভাবে হত্যার শিকার শিশু তুহিন মিয়ার মা মনিরা বেগম তার সন্তান হত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তুহিন হত্যায় তার বাপ-চাচারা জড়িত থাকলে তাদেরও যেন কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়।’ গত সোমবার ভোরে তুহিনের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধারের পর সেদিনই স্বামীর বাড়ি কেজাউড়া গ্রাম ছেড়ে দুই সন্তান নিয়ে পাশের জকিনগর গ্রামে বাবার বাড়ি গিয়ে উঠেছেন মনিরা বেগম। সেখানে বসেই গতকাল বুধবার বিকালে তিনি দেশ রূপান্তরকে এ কথা বলেন।

তুহিনকে হত্যার রাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে মনিরা বলেন, ‘দুই বছর ধরে ছেলে আমার বাপের কাছেই রাতে ঘুমায়। আমি থাকি এক রুমে, বাপ-ছেলে থাকে অন্য রুমে। ছেলে আমার কাছে ঘুমায় না। প্রতি রাতের মতো মঙ্গলবার রাত ১০টায় সবাই ভাত খাই। ভাত খেয়ে ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে আমি আমার ঘরে চলে যাই এবং ঘুমিয়ে পড়ি। হঠাৎ রাতে শুনি ঘরের দরজা খোলা, আমার ছেলেকে ঘরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যখন তাকে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়, এর কিছুক্ষণ পরই অসুস্থ হয়ে পড়ি। সকালে অন্য মানুষের কাছে শুনি, আমার ছেলেকে খুন করা হয়েছে।’

মনিরা বেগম আরও বলেন, ‘কেউ কি চায় তার ছেলেকে মেরে ফেলতে? মেরে ফেলার জন্য অন্যের কাছে নিয়ে দিতে। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। আমি যেমন ছেলেকে মানুষ করেছি, তার বাপও একইভাবে তাকে মানুষ করেছে। এর পরও যেই আমার ছেলে হত্যায় জড়িত থাকুক, তার শাস্তি চাই। যদি বাপ-চাচা জড়িত থাকে, তাহলে তাদেরও যেন শাস্তি দেওয়া হয়।’

কেজাউড়া গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমন নৃশংস ঘটনার পর আমার ছেলে আমার কাছে রাতে ঘুমাবে কি না সন্দেহ আছে। দুনিয়াতে বাপ আর ছেলের মধ্যে সব বিশ্বাস উঠে যাবে মনে হচ্ছে। আমরা এই ঘটনার সঠিক বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

গ্রামের আরেক বাসিন্দা সামছুজ্জামান মিতা বলেন, ‘মানুষ যখন হিংসার বশীভূত হয়ে যায়, তখন সে মানুষ থাকে না, পশুতে পরিণত হয়। তার হিতাহিত জ্ঞান ও মানবিক বোধ কিছুই থাকে না। সে তার মনে যা চায় তাই করতে পারে। আমরা শিশু তুহিনের হত্যায় এই ঘটনায় তাই বুঝলাম।’

এদিকে হত্যা মামলায় শিশু তুহিনের বাবা আব্দুল বাসির এবং চাচা জমশেদ আলী ও মোছাব্বির আলীকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে পুলিশ। গত মঙ্গলবার রাত থেকে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে দিরাই থানার ওসি কে এম নজরুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আসামিদের তিন দিনের রিমান্ডে এনেছি। নানা বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছি। এর বেশি কিছু তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়।’

গত সোমবার ভোরে দিরাইয়ের রাজানগর ইউনিয়নের কেজাউড়া গ্রামে কৃষক আব্দুল বাসিরের ছেলে তুহিন মিয়ার ঝুলন্ত লাশ পাওয়া যায় বাড়ির কাছের একটি কদম গাছে। শিশুটির পেটে দুটি বড় ছুরি গাঁথা এবং কান ও লিঙ্গ কাটা অবস্থায় পাওয়া যায়। পুলিশ সেদিন প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে দাবি করেছিল, তুহিন হত্যাকাণ্ডে পরিবারের সদস্যদের কেউ জড়িত। পরে সোমবার রাতে তুহিনের মা মনিরা বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাত পরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করেন। ওই মামলায় তুহিনের বাবা আব্দুল বাসির, চাচা জমশেদ আলী, মোছাব্বির আলী, নাছির উদ্দিন এবং চাচাত ভাই শাহরিয়ার হোসেনকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। পরে গত মঙ্গলবার সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, শিশু তুহিন মিয়াকে তার বাবাই হত্যা করেছে। তুহিনকে ঘুমন্ত অবস্থায় বাবা আব্দুল বাছির রাতের অন্ধকারে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যান। পরে বাসির, তার এক ভাই ও ভাতিজা মিলে গলা কেটে হত্যা করেন তুহিনকে। পুলিশের ভাষ্য, গ্রামের বিরোধে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতেই পাঁচ বছর বয়সী শিশুটিকে হত্যা করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত