সরকারের পাওনা প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে দেশের শীর্ষ দুই মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর গ্রামীণফোন ও রবি আজিয়াটাতে প্রশাসক বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এ বিষয়ে গত মঙ্গলবার ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে অনুমতি চেয়েছে বিটিআরসি।
পাওনা পরিশোধ না করায় গত ৫ সেপ্টেম্বর গ্রামীণফোন ও রবির লাইসেন্স বাতিলের নোটিস পাঠায় বিটিআরসি। পরবর্তী সময়ে পাঠানো গ্রামীণফোন ও রবির জবাব পর্যালোচনার পর বিটিআরসি প্রশাসক বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে গ্রামীণফোন ও রবিতে
আলাদা দুই প্রশাসক বসাতে অনুমতি চেয়েছে বিটিআরসি। একই সঙ্গে ওই দুই প্রশাসককে সহযোগিতা করতে আরও তিনজন বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া হবে, যাদের আইন, প্রকৌশল ও আর্থিক বিষয়ে অভিজ্ঞতা থাকবে।
এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রামীণফোন ও রবিতে প্রশাসক বসাতে বিটিআরসির চিঠি আমরা পেয়েছি। আইনানুগভাবে বিটিআরসির যা করণীয় তা করবে, মন্ত্রণালয় বিটিআরসিকে সহায়তা করবে। ওই দুই অপারেটরের কাছে পাওনা আদায়ে যে সমঝোতার চেষ্টা চলছিল, তারা শর্তপূরণ না করায় তা ভেস্তে গেছে।’
এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরকে পাঠানো এক বিবৃতিতে গ্রামীণফোনের হেড অব রেগুলেটরি এবং অ্যাকটিং হেড অব কমিউনিকেশন হোসেন সাদাত জানান, বিটিআরসির কাছ থেকে কোনোরকম নির্দেশনা না পাওয়ায় আমরা অনুমাননির্ভর কিছু বলতে চাই না। বিটিআরসির ভিত্তিহীন এবং বিবদমান নিরীক্ষাসংক্রান্ত দাবিটির গঠনমূলক সমাধানের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী, ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের নির্দেশনা ও সহায়তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। স্বচ্ছ, বন্ধুত্বপূর্ণ ও সময়োচিত সমাধানের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে আমাদের বিবেচনাধীন আছে। আমরা সম্প্রতি সরকারের কাছ থেকে নতুন কিছু নির্দেশনা পেয়েছি, যা বিষয়টিকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, বিটিআরসির ভিত্তিহীন বিধিনিষেধ ও লাইসেন্স-সংক্রান্ত কারণ দর্শানোর নোটিসটি এখনো বলবৎ আছে। এর ফলে গ্রামীণফোনের ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও গ্রাহকসেবা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি লাইসেন্স বাতিলের নোটিসের জবাবে গ্রামীণফোন ও রবি আদালতে বিচারাধীন বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়ার ক্ষেত্রে উল্টো বিটিআরসির এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। গ্রামীণফোন ও রবির জবাবে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও তাতে দুই অপারেটরই টেলিযোগাযোগ আইনের দুটি ধারার প্রয়োগের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। তারা বলেছে, আইনের ২৬ ধারা অনুযায়ী পাবলিক ডিমান্ড রিকোভারি (পিডিআর) অ্যাক্টে পাওনা আদায়ে মামলা করতে পারত বিটিআরসি; কিন্তু তা না করে আইনের ৪৬ ধারায় লাইসেন্স বাতিলের মতো পদক্ষেপে চলে গেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। জবাবে আরও বলা হয়, বিটিআরসি যে অডিটের ভিত্তিতে এই কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে, তা বিতর্কিত। আর এর পরিপ্রেক্ষিতে বিটিআরসি যে লিগ্যাল নোটিস পাঠিয়েছে, তারও আইনগত কোনো ভিত্তি নেই। কারণ আরও আগে থেকেই আদালতে এ বিষয়ে একটি মামলা বিচারাধীন।
দুই অপারেটরের নোটিসের জবাব পাওয়ার পর তা পর্যালোচনা শেষে গ্রামীণফোন ও রবিতে প্রশাসক বসানোর সিদ্ধান্ত নেয় টেলিযোগাযোগ কমিশন, যাতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়েরও সায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
গ্রামীণফোন ও রবির কাছে সরকারের পাওনাকে কেন্দ্র করে বিটিআরসির বিরোধ মেটাতে গত ১৮ সেপ্টেম্বর অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের উদ্যোগে সমঝোতা বৈঠক হয়, যেখানে টেলিযোগাযোগমন্ত্রী, বিটিআরসি চেয়ারম্যান, এনবিআর চেয়ারম্যান ছাড়াও গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাইকেল ফোলি উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে চলমান বিরোধ সমঝোতার মাধ্যমে সমাধানের সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া দুপক্ষই যে নোটিস বা আইনি প্রক্রিয়ায় গেছেÑ তা প্রত্যাহার করা হবে বলে জানানো হয়। ওই বৈঠকে দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ফল পাওয়ার আশা ব্যক্ত করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। তবে শর্ত পালন না করায় সমঝোতার ওই উদ্যোগ থমকে যায়।
যন্ত্রপাতি আমদানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে গ্রামীণফোন ও রবি আজিয়াটার কাছে সরকারের পাওনার পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের কাছে ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি ও রবির কাছে ৮৬৭ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত যন্ত্রপাতি আমদানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে গ্রামীণফোনের কাছে বিটিআরসির পাওনা ও এর সুদ মিলিয়ে উল্লিখিত পরিমাণ টাকা দাবি করে গত ২ এপ্রিল চিঠি পাঠায় বিটিআরসি। তবে বকেয়া অর্থ পরিশোধ না করায় গত ৪ জুলাই গ্রামীণফোনের ৩০ শতাংশ ও রবির ১৫ শতাংশ ব্যান্ডউইথ কমিয়ে দেয় বিটিআরসি। এই নির্দেশনা কার্যকরের পর থেকে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা নানা সমস্যায় পড়েন। এ কারণে গত ১৭ জুলাই ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে অপারেটর দুটিকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিটিআরসি। এতে করে অপারেটর দুটির নতুন প্যাকেজ অনুমোদন বন্ধ হয়ে যায়। এরপরও বকেয়া আদায়ে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় গ্রামীণফোন ও রবির বিদ্যমান প্যাকেজ নবায়ন না করার প্রস্তাব সংক্রান্ত একটি উদ্যোগের অনুমোদন চেয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় বিটিআরসি। পরবর্তী সময়ে গ্রামীণফোন ও রবির লাইসেন্স বাতিল কেন করা হবে না সে মর্মে নোটিস পাঠায় বিটিআরসি। এরপর লাইসেন্স বাতিলের নোটিসের জবাব পাওয়ার পর এই দুই অপারেটরে প্রশাসক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে বিটিআরসি।
অবশ্য সরকারের পাওনার বিষয়ে গত ২৫ আগস্ট রবি ও ২৬ আগস্ট গ্রামীণফোন ঢাকার দেওয়ানি আদালতে দুটি মামলা করে। নিরীক্ষা আপত্তির ‘পাওনা’ টাকা আদায়ে বিটিআরসির দাবিকে ‘অযৌক্তিক ও ত্রুটিপূর্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করে মীমাংসার দাবি জানায় গ্রামীণফোন ও রবি।
