দলে এমপিদের কর্তৃত্ব কমাতে গঠনতন্ত্র সংশোধনের দাবি

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ০২:৩৩ এএম

আওয়ামী লীগকে এমপিদের নিয়ন্ত্রণ থেকে বাঁচাতে হবে বলে মনে করেন দলটির তৃণমূলের নেতারা। তারা মনে করেন, তা না হলে আওয়ামী লীগ দুর্বল থেকে দুর্বলতর হবে দিনে দিনে। দলটির লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও আদর্শও বাধাগ্রস্ত হবে। এজন্য জাতীয় সম্মেলনে দলের গঠনতন্ত্রে এমন একটি সংশোধনী আনা উচিত বলে তারা মনে করেন। যার ফলে এমপিদেরও গুরুত্ব দিতে হয় তৃণমূল নেতাদের। এর মধ্য দিয়ে দল ও সরকারের মধ্যে ভারসাম্য এলে এমপিদের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তৃণমূল নেতারা আরও বলেন, দলীয় পরিচয় বহন করে এমপি নির্বাচিত হলেও পরে দলীয় নেতাদের উপেক্ষা করেন ওইসব নেতা।

আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতারা দেশ রূপান্তরকে আরও বলেন, দলীয় মনোনয়ন নিয়ে যারা সংসদসহ বিভিন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন তখন দলের ওপর নির্ভরশীল থাকেন, নির্বাচিত হওয়ার পর দলকে তাদের ইচ্ছেমতো, খেয়াল-খুশিমতো পরিচালিত করতে চান। তখনই দলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। এমপি আধিপত্য ধরে রাখতে এমপি লীগ তৈরি করেন। তাতে রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হয়, দলের আদর্শ-উদ্দেশ্য বিলীন হতে থাকে। তবে তারা এও বলেন, সংসদ সদস্যদের ভোট পলিটিকস আছে তাই বিভিন্ন মত ও পথের মানুষের সঙ্গে তাদের ওঠাবসা থাকবে এটাই স্বাভাবিক কিন্তু সেখানে দলের পদ-পদবিধারী নেতাদের উপেক্ষা করা, পকেট লীগ তৈরি করে

 

দলে আধিপত্য বিস্তার করা এসব যখন শুরু হয় তাতে দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তৃণমূলের এসব নেতা আরও বলেন, আওয়ামী লীগের আসন্ন সম্মেলনে এমপি ও তৃণমূল নেতাদের মধ্যে যে দূরত্ব সৃষ্টি হয় এবং এমপিদের আধিপত্য বিস্তারের যে রাজনীতি তা দূর করতে দলের এমপি এবং তৃণমূল নেতা উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনতে গঠণতন্ত্রে সংশোধন আনা উচিত। এ ব্যাপারে গঠনতন্ত্রে কোনো বিধিনিষেধ থাকলে দলের আদর্শ-উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ব্যাহত হবে না। তৃণমূলের নেতারা বলেন, জনপ্রতিনিধিরা যে দল থেকে মনোনীত হয়ে দায়িত্ব পালন করেন তারা নিজেরা একটা বলয় তৈরি করে নেন। ওই বলয় দ্বারা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নির্যাতিত-নিপীড়িত হন। গত দশ বছরেই এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে।

তারা আরও দাবি করেন, যারা দলের পদ-পদবি বহন করবে তাদের সরকারে থাকার দরকার নাই। যারা সরকারে থাকবে তাদের দলে থাকার দরকার নাই। তৃণমূল নেতাদের আরও পরামর্শ হলো, দলের কোনো সাংগঠনিক জেলার শীর্ষ পদে থেকে কোনো নেতা নির্বাচন করলে শীর্ষ পদ ছেড়ে দিয়ে সাধারণ একটি পদ নিতে পারেন। তাতে নেতৃত্ব সৃষ্টি হবে।

ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মাসুদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রায় সারা দেশেই আওয়ামী লীগের একটি প্রতিপক্ষ রয়েছে সেটা হলো এমপি লীগ। যদিও তারা আওয়ামী লীগ থেকেই টিকিট নিয়ে এমপি হয়েছেন। ভোটের আগে দলের ওপর নির্ভরশীল থাকেন, পাস করে ফেললেই দলকে ইচ্ছেমতো খেয়াল খুশিমতো পরিচালিত করতে চান। সেখানে ব্যত্যয় ঘটলেই এমপি লীগ তৈরি করে। এমপি লীগ তৈরি করতে গিয়ে আওয়ামী লীগে আগাছা-পরগাছা হয়। এসব আগাছা-পরগাছা আওয়ামী লীগকে দমন-পীড়ন করে কর্র্তৃত্ব ও আধিপত্য দুটোই নিয়ে যায়। তিনি বলেন, অনুপ্রবেশের সুযোগ এভাবেই তৈরি হয়। এর ফলে দলের বদনাম হয়। দলের আদর্শ-উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হয়। তিনি বলেন, গণভবনে যে কয়বার গিয়েছি বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ হলে বলেছি এসব ব্যাপারে। মাসুদ বলেন, এবার গঠনতন্ত্রে এমপিদের জেলার নেতাদের মধ্যে ভারসাম্য আনতে এবার গঠনতন্ত্রে সংশোধন আনা উচিত। এমন একটি ধারা সংযোজন করা উচিত দলের কাজ নেতারাও করবে এমপিরা করবে সম্মিলিতভাবে। কারও কাজে কেউ বাধা হয়ে দাঁড়ালে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আপনাআপনি শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় আসবে ওই নেতা। তিনি আরও বলেন, দল থাকলে দেশ বাঁচবে, জনগণ বাঁচবে এবং আমি বাঁচব।

কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরফানুল হক রিফাত দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের ভেতরে একটি ট্রেন্ড চালু হয়েছে এমপিরাই রাজনীতিক, দলের অন্য পদদারী নেতারা অরাজনৈতিক। জেলা আওয়ামী লীগের নেতা হলেও রাজনীতি করতে হবে এমপির কর্র্তৃত্বে। তিনি বলেন, সারা দেশেরই একই চিত্র। রিফাত আরও বলেন, প্রত্যেকটি সাংগঠনিক জেলায় সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। এজন্য আসন্ন সম্মেলনে ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য গঠনতন্ত্রে একটি ধারা সংযোজন করা উচিত। তিনি বলেন, একচ্ছত্র ক্ষমতা অহমিকা বোধ সৃষ্টি করে।

পঞ্চগড় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার সাদাত সম্রাট দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারী যারা তাদের অধিকাংশ দলে জায়গা পেয়েছে দলীয় এমপিদের কারণে। তিনি বলেন, এমপিরা এমপি লীগ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ দুর্বল গয়ে পড়েছে। সম্রাট বলেন, জনপ্রতিনিধি ও আওয়ামী লীগের নেতাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে আসন্ন সম্মেলনে দলের গঠনতন্ত্রে একটি ধারা সংযোজন করা উচিত। নয়তো দল দুর্বল হবে। আদর্শ-উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ব্যাহত হবে।

বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান মজনু দেশ রূপান্তরকে বলেন, হাইব্রিড লীগকে আওয়ামী লীগ থেকে বিদায় করতে হবে। কারা হাইব্রিড লীগ সৃষ্টি করেছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা তো আপনারা জানেন। মজনু বলেন, সারা দেশে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ হাইব্রিড লীগ। আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করতে হলে হাইব্রিড লীগ তাড়িয়ে দলকে সাজাতে হবে। আসন্ন জাতীয় সম্মেলনে ও দলের তৃণমূল সম্মেলনে কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকরা নিশ্চয়ই তাই করবেন।

নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুভাষ চন্দ্র বোস দেশ রূপান্তরকে বলেন, কার্যত আওয়ামী লীগ নেতাদের কোনো কাজই নাই। আমাদের দেশের মানুষ ক্ষমতাকেন্দ্রিক। তাদের অনেক চাওয়া-পাওয়া থাকে। ফলে এমপিদের ক্ষমতা থাকায় এমপিকেন্দ্রিক একটি বলয় সব এলাকায় থাকে। এ ক্ষেত্রে ওই এমপির তুলনায় ওই এলাকার মানুষের দলীয় নেতার কোনো আবেদন থাকে না। ফলে দলীয় নেতা যে হন তার কোনো কদরও থাকে না কর্মীদের কাছে। অনেক ক্ষেত্রে এমপিরাও চান দলের পদ-পদবি বহন করা নেতাকে নিষ্ক্রিয় করে রাখতে। এর ফলে দলীয় কাজ হয় না দলের নেতাদের দিয়ে।

তবে এমপি লীগ বলে যেসব অভিযোগ তৃণমূল নেতাদের রয়েছে সে সম্পর্কে আওয়ামী লীগের সভাপতিমÐলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, এবার জাতীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলকে ঢেলে সাজানো হবে। দলের অভ্যন্তরে যেসব দলাদলি আছে তাও শেষ হয়ে যাবে সম্মেলনের পরে।

সাংগঠনিক সম্পাদক ও নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেসব এলাকায় এ ধরনের সমস্যা আছে জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে এসব সমস্যা শেষ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, গঠনতন্ত্রে ভারসাম্য রক্ষার ধারা সন্নিবেশিত আছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত