এক সময় টেস্ট ক্রিকেটই ছিল ‘আসল ক্রিকেট’। কিন্তু কালের পরিক্রমায় সাদা পোশাকের ক্রিকেটটা আসলেই সাদামাটা হয়ে গেছে। রঙিন পোশাক আসার পর থেকে টেস্টের জনপ্রিয়তা ক্রমেই কমতে শুরু করে। ওয়ানডে বিশ্বকাপ ও চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির প্রবর্তনে টেস্টের জনপ্রিয়তা আরও নিচে নামে। অবশেষে একবিংশ শতাব্দীতে এনে টি-টোয়েন্টি টেস্ট ক্রিকেটকে আরও পেছনে ঠেলে দেয়। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে টেস্ট ম্যাচে দর্শকশূন্য গ্যালারি। ‘আসল ক্রিকেট’ নিয়ে বিপদে পড়ে যায় আইসিসি। অনেক পরিকল্পনা শেষে টেস্টকে বাঁচানোর সেরা উদ্যোগ বের করে ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ‘টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ’Ñ যার মাধ্যমে বড় ফরম্যাটেও একটি প্রতিযোগিতার আমেজ দেওয়া গেছে। ক্রিকেটের বরপুত্র সাবেক ওয়েস্ট ইন্ডিজ গ্রেট ব্রায়ান লারা জানালেন, এই চিন্তাটা আরও আগেই আসা উচিত ছিল। এতে করে ২০০০-এর পর টেস্টের জনপ্রিয়তার পারদ নিচে নামত না।
লারাকে নিয়ে একটি সুখবর হচ্ছে আবারও ব্যাট-প্যাডে দেখা যাবে তাকে। ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের একটি সংস্থা বিশ্বব্যাপী নিরাপদ সড়কের সচেতনতা বাড়ানোর পরিকল্পনায় একটি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট আয়োজন করবে। সেই টুর্নামেন্টে শুধুই সাবেক ক্রিকেটাররা খেলবেন। সেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজ লিজেন্ডস দলকে নেতৃত্ব দেবেন লারা। শচিন টেন্ডুলকার ভারতের, ব্রেট লি অস্ট্রেলিয়ার, জন্টি রোডস দক্ষিণ আফ্রিকার ও তিলকারতেœ দিলশান শ্রীলঙ্কান লিজেন্ডস দলের অধিনায়ক। মোট পাঁচ দল নিয়ে হবে টুর্নামেন্টটি। এই আসরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপকে সাধুবাদ ও আমন্ত্রণ জানিয়ে গেলেন টেস্টে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ইনিংসের মালিক। ২০০৪ সালে ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৪০০ রানে অপরাজিত ছিলেন তিনি।
অনুষ্ঠানে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে লারা জানান, ‘এটা অবশ্যই দুর্দান্ত একটি উদ্যোগ। আইসিসিকে ধন্যবাদ তারা টেস্টের জন্য এমন একটি পরিকল্পনা করেছে। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ আরও আগেই শুরু করা উচিত ছিল। এতে অবশ্যই টেস্টের প্রতি খেলোয়াড় ও সমর্থকদের আগ্রহ বাড়বে, খেলাটির জনপ্রিয়তাও বাড়বে। এখন একটি টেস্টকে শুধুই একটি ম্যাচ হিসেবে কেউ দেখবে না, সবাই জানবে এই ম্যাচটি কোনো কিছু পাওয়ার জন্য খেলা হচ্ছে। আমি সত্যিই খুশি টেস্টের এমন প্রক্রিয়া দেখে। এটা আমার প্রিয় ফরম্যাট, এজন্যই আমি এত খুশি। আইসিসিকে আবারও ধন্যবাদ, দেরিতে হলেও তারা টেস্টের জন্য একটি চ্যাম্পিয়নশিপের ব্যবস্থা করেছে।’
কিন্তু এতদিন জনপ্রিয়তার দিক থেকে টেস্টের পিছিয়ে পড়ার কারণ কী ছিল। সমর্থকদের কাছে কেন এই ফরম্যাট অনাগ্রহে থাকত বা সাম্প্রতিক সময়ে বেশিরভাগ ক্রিকেটারদের টেস্ট বিমুখতার কারণ কী? এ ব্যাপারে লারা জানান, ‘অবশ্যই এর কারণ হলো একঘেয়েমি। দেখুন, একজন ক্রিকেটার ক্যারিয়ারে ১৬-১৭ বছর টেস্ট খেলছে, হয়তো বা সে রেকর্ডের পর রেকর্ড করছে, সেঞ্চুরির পর সেঞ্চুরি করছে, অনেক কিছু অর্জন করছে, কিন্তু তার মনে রাখার মতো কিছু থাকত না। বা একটি দল সিরিজের পর সিরিজ জিতছে কিন্তু তাদের সাফল্যের পুরস্কার ছিল না। যেমন অ্যাশেজে চ্যাম্পিয়ন হওয়া বা একটি ট্রফি জেতার ব্যবস্থা আছে, যা এই সিরিজকে জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে। এর বাইরে যেকোনো দলের টেস্ট লড়াই শুধুই একটি সিরিজ হয়ে থাকত। ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টিতে দেখুনÑ কোনো একটি বিশ্বকাপজয়ী দলকে আমরা কীভাবে দেখছি বা ওই দলের খেলোয়াড়কে বিশ্বকাপজয়ী সদস্য বলছি। কিন্তু টেস্টে তো এমন কিছু নেই। এতে ক্রিকেটারদেরও একঘেয়েমি ধরে যায়। মানে আপনি কষ্ট করছেন কিন্তু কোনো বিনিময় নেই। কিন্তু এখন এটা হবে না। এমনকি বাংলাদেশ বা আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে পিছিয়ে থাকা দলগুলোর সঙ্গেও ক্রিকেটাররা একটি ম্যাচ গুরুত্ব দিয়ে খেলবে। কারণ তারা এখন জানে যে এই ম্যাচটি তাদের শিরোপার দিকে নিয়ে যাবে। সমর্থকরাও জানবে এই ম্যাচের গুরুত্ব আছে, এটি শুধুই একটি সিরিজ নয়। এই পরিবর্তনটা আগে ছিল না। এ কারণে সবসময়ই টেস্ট পিছিয়ে ছিল। শিরোপা জেতার প্রতিযোগিতা না থাকায় টেস্ট জনপ্রিয়তা হারিয়েছিল।’
ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটেই একটি চ্যাম্পিয়নশিপ করার পরিকল্পনা থেকে এই টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শুরু। ২০১৩ সালে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সবকিছু ঠিকঠাক করে ২০১৯-২১ দুই বছরের চক্রে ৯ দলের জন্য এই টুর্নামেন্টের সময় বের করা হয়। পরবর্তী টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চক্র ২০২১-২৩ এ দুই বছর। ২০২১ সালে বর্তমান চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল হবে ইংল্যান্ডের লর্ডসে। এতে দুই ম্যাচের সিরিজে এক দল সর্বোচ্চ ৬০ পয়েন্ট পাবে প্রতি টেস্ট জয়ের জন্য। টাই হলে ৩০ আর ম্যাচ ড্র হলে দুই দল পাবে সমান ২০ পয়েন্ট। তিন ম্যাচের সিরিজে এক ম্যাচে জয়ের জন্য ৪০ পয়েন্ট, টাই ২০ আর ড্রতে ১৩। চার ম্যাচের সিরিজে জয়ের জন্য ৩০ পয়েন্ট, টাই ১৫ এবং ড্র ১০ পয়েন্ট। আর পাঁচ ম্যাচের সিরিজে জয়ের জন্য ২৪, টাই ১২ ও ড্র ৮ পয়েন্ট এনে দেবে দলগুলোকে।
বর্তমানে সর্বোচ্চ দুটি সিরিজ খেলে সবচেয়ে এগিয়ে ভারত। দুই ম্যাচের একটি সিরিজে দুটি ম্যাচ জেতায় ১২০ এবং তিন ম্যাচের একটি সিরিজে দুটি ম্যাচ জেতায় ৮০ পয়েন্ট তাদের। মোট চার ম্যাচ জিতে ২০০ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে তারা।
