বছরে বছরে বাড়ে কমে রেলের জমি

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ০১:৫৩ এএম

ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৬২ সালে দেশে রেলওয়ের সূচনা। সেই সময় থেকে শুরু করে দেশভাগের পর উত্তরাধিকার সূত্রে বিশাল ভ‚সম্পদ পেয়েছে রেলওয়ে। স্বাধীনতার পর থেকে হাজার হাজার একর জমির দখল হারিয়েছে রাষ্ট্রীয় এ সংস্থাটি। কিন্তু বেদখল জমির পরিমাণ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানাতে পারেননি রেলওয়ের কর্মকর্তারা। সংস্থাটির হালনাগাদ তথ্যানুসারে, ৬১ হাজার ৮৬০ একর জমির মধ্যে বেদখল হয়ে গেছে ৩ হাজার ৮৪১ একর। অথচ আধুনিক পদ্ধতিতে জরিপের পর ২০১৪ সালে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শেলটেক কনসালট্যান্ট লিমিটেডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেলের জমির পরিমাণ ৫৯ হাজার ৭৫৫ একর। তাদের হিসাবে বেদখল জমির পরিমাণ ৪ হাজার ৬৩৬ একর। এছাড়া ১ হাজার ৮৪১ একর জমির কোনো হদিস নেই। এসব জমির কোনো দলিল-নথিও নেই রেলওয়ের ভ‚সম্পত্তি বিভাগে।

রেলের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে বেদখল জমির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। দখলদারের তালিকায় রয়েছে খোদ সরকারি আধা-সরকারি সংস্থার নাম। বাদ যায়নি শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। পিছিয়ে নেই রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও। পূর্বাঞ্চলে অবৈধ দখলে রয়েছে ৮৫৪ দশমিক ২৬ একর জমি। পশ্চিমাঞ্চলে রেলের বেদখল জমির পরিমাণ ২ হাজার ৯৮৭ একর; এর মধ্যে শুধু পাকশীতে দখল হয়েছে ২ হাজার ৪৭০ একর জমি। এছাড়া অনেক জমির নথি এখনো কলকাতায় রয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন তারা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দখলদাররা রেলের ‘হারিয়ে যাওয়া’ ১ হাজার ৮৪১ একর জমির দলিল, পর্চা ও নথি গায়েব করেছে। এর সঙ্গে রেলের কর্মকর্তারাও জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারাই রেলের ভ‚সম্পত্তির দলিল কার্যালয় থেকে ‘গায়েব’ করে ফেলেছেন। আর তা নিজেদের নামে রেকর্ড করে নিয়েছে দখলদাররা।

রেলওয়ের হালনাগাদ তথ্য বলছে, সারা দেশে রেলের জমি ৬১ হাজার ৮৬০ দশমিক ২৮ একর। এর মধ্যে রেলের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে ৩১ হাজার ৫৬৮ দশমিক ৯৪ একর জমি। এখনো অব্যবহৃত রয়েছে ১০ হাজার ৮৪৩ দশমিক ১৫ একর জমি। এছাড়া লাইসেন্স/লিজ দেওয়া জমির পরিমাণ ১৪ হাজার ৪৭৩ দশমিক ২৪ একর। পুরোপুরি বেদখল হয়ে গেছে ৩ হাজার ৮৪১ দশমিক ৫৩ একর। এছাড়া রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে রিজিউমকৃত রেলভ‚মি ৭১৬ দশমিক ৭৩ একর। আর কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্র্তৃপক্ষের (বেজা) জন্য রিজিউমকৃত রেলভ‚মির পরিমাণ ৪১৬ দশমিক ৬৯ একর।

সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে ঢাকা বিভাগে জমি ছিল ১৬ হাজার ৭০০ দশমিক ৬২ একর। ১১ বছর পর ২০১২ সালে ৪ হাজার ৫০৩ দশমিক ১৭ একর কমে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১২ হাজার ১৯৭ দশমিক ৪৫ একর। তবে ২০১৩ সালে শেলটেকের করা জরিপে ২ হাজার ২২৭ দশমিক ৯ একর বেড়ে জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৪৪২ দশমিক ৩৫ একর। রেলের হিসাবে ২০০১ সালে চট্টগ্রাম বিভাগে জমি ছিল ৭ হাজার ৭০১ দশমিক ৪৮ একর এবং ২০১২ সালে ৫৭৬ দশমিক ৭৭ একর কমে তা হয় ৭ হাজার ১২৪ দশমিক ৭১ একর। এক বছর পর শেলটেকের জরিপে রেলের হিসাবের চেয়ে ১ হাজার ২৩ দশমিক ৫৫ একর বেড়ে জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ হাজার ১৪৮ দশমিক ২৬ একর।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বেদখল জমি উদ্ধারে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি রেলপথ মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন সময়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা নদী ও সড়ক দখলমুক্ত করতে অভিযান চালালেও এ কাজে পিছিয়ে রেল। কালেভদ্রে উচ্ছেদ অভিযান হলেও উদ্ধার করা জমি ফের দখল হয়। উচ্ছেদ অভিযান ও আইনি লড়াই দুই জায়গায় পিছিয়ে এ সংস্থা। তবে সম্প্রতি রাজধানীর শাহজাহানপুরে রেলের জমি উচ্ছেদ করা হয়।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রেলের ইজারা দেওয়া জমির একটি বড় অংশ বেহাত হয়েছে। কৃষি কাজের জন্য ইজারা দেওয়া জমি ব্যবহার হচ্ছে বাণিজ্যিক কাজে। সেখানে বহুতল ভবন, মার্কেট নির্মিত হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নামেও দখল হয়েছে রেলের জমি। পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে চাইলেও জমি উদ্ধার করা যায় না। এছাড়া মামলা করে ও আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে দখল পোক্ত করেছে দখলদাররা।

শেলটেকের ২০১৪ সালের প্রতিবেদেনে বলা হয়, ১৩ হাজার ৩৩ একর লাইসেন্স জমি লিজ দিয়ে রেল উপার্জন করেছে ২৩ দশমিক ৬ কোটি টাকা। তবে ইজারা দেওয়া জমি সঠিকভাবে ব্যবহার করলে সেই অর্থের পরিমাণ দাঁড়াত ২০০ কোটি টাকায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোফাজ্জেল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয়টি আমার জানা নেই। পরে জেনে বলতে পারব।’

বেদখল জমি উদ্ধার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রেল সচিব বলেন, ‘কিছু কিছু এরিয়া অনেক জটিল অবস্থাতে আছে। যেমনÑ সৈয়দপুর-পার্বতীপুরের জমি দখলমুক্ত করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছি। অনেক বেশি পরিমাণ বেদখল দীর্ঘদিন ধরে।’ ঢাকায় রেললাইনের আশপাশে বেদখল জমিগুলোতে খুব হালকা স্থাপনা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এগুলো আমরা যেকোনো সময় উচ্ছেদ করতে পারি কিংবা করি। দখলের পরপর আবার বস্তি উঠতে থাকে। আমরা আবার উচ্ছেদ করি সে প্রক্রিয়াটা চলমান প্রক্রিয়া।’

মোফাজ্জেল হোসেন আরও বলেন, ‘বাস্তবতা হলো জমি উদ্ধার করে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখতে হলে সেটা বেড়া দিতে হবে। তারপর সেখানে দারোয়ান নিয়োগ দিতে হবে। এত লোকবল আমাদের নেই। কোনো ধরনের স্থায়ী স্থাপনা যাতে না হয় সেদিকে নজর রাখি। ঢাকা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত তৃতীয় এবং চতুর্থ লাইনের কাজ যখন শুরু হবে তখন আশপাশে আর বেদখল হওয়ার জায়গা থাকবে না।’ নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করে রেলের জমি উদ্ধারের জন্য রেলমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জমি দখলে রেলের কর্মকর্তারা জড়িত কি না এ প্রশ্নের জবাবে রেল সচিব বলেন, ‘জড়িত থাকতে পারে আবার নাও পারে। রেলের কর্মকাণ্ড এত বড়, প্রতিটি ইঞ্চি জায়গা নজরদারিতে রাখা দুরূহ কাজ। নিম্ন পর্যায়ের কিছু দুষ্ট লোক জড়িত থাকতে পারে। তবে কখনো কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।’ রেলের বেশকিছু জমি বিক্রির জন্য শেলটেক প্রতিবেদনে সুপারিশ করলেও মন্ত্রণালয় কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের জমির প্রয়োজন হয় তাহলে তারা আমাদের কাছে চাইলে আমরা যাচাই-বাছাই করে যদি দেখি ৫০ বছরে সেই জমি আমাদের কাজে না লাগবে না, তাহলে আমরা সেই জমি তাদের হস্তান্তর করে থাকি।’

বেদখল জমি সম্পর্কে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আনোয়ারুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রেলের জমি যখন প্রয়োজন হবে তখন ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তুলে দেব। জমি দখলের কারণে আমাদের কোনো কাজ তো আটকে নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘রেলের জমির তদারকি কিন্তু রেলপথ মন্ত্রণালয় নিজে করে না। এগুলো মূলত প্রশাসন ক্যাডারের লোকেরা দেখভাল করে। ঢাকা, চিটাগংয়ে বসে এত বিশাল সম্পত্তি নজরদারিতে রাখা সম্ভব নয়।’ রেলের ১ হাজার ৮৪১ একর জমি ‘গায়েব’ প্রসঙ্গে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘শত বছরের পুরনো বেশকিছু নথি যেগুলো আমাদের কাছে নেই সেগুলো এখনো কলকাতায় রয়েছে। শেলটেক আমাদের কিছু জমির কাগজ উদ্ধার করে দিয়েছে। তবে এখনো অনেক কাগজপত্র নেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত