বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধে ১০ বছরের বেশি সময় আগে দুই দেশ সম্মত হলেও থামেনি সীমান্ত হত্যা; বরং বেড়েছে। গুলির পাশাপাশি নানা ধরনের নির্যাতনেও হত্যার শিকার হচ্ছে বাংলাদেশিরা। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), অধিকার এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যমতে, শুধু চলতি বছর জানুয়ারি থেকে গত ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলি ও নির্যাতনে
প্রাণ গেছে ২৪ বাংলাদেশির। এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১৮ জন ও পরবর্তী সাড়ে তিন মাসে কমপক্ষে আরও ৬ জন মারা গেছেন।
মানবাধিকারকর্মী ও পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সীমান্তে নাগরিকদের মৃত্যুতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে যতটা জোরালো প্রতিবাদ জানানোর রেওয়াজ অতীতে ছিল, এখন সেটা ততটা জোরালো বলে মনে হয় না। সীমান্ত এলাকার অনেকে হয়রানির ভয়ে বিএসএফের নির্যাতনের কথা স্বীকারও করেন না। তাছাড়া বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের মধ্যে যে সুসম্পর্কের কথা প্রচার করা হচ্ছে; সেটা আর বাস্তবতা এক নয়। সুসম্পর্ক থাকলে
এত বেশিসংখ্যক সীমান্ত হত্যা ঘটত না বলে মনে করেন তারা।
সরকারি-বেসরকারি তথ্যমতে, ২০০৯ সাল থেকে চলতি বছর ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত সীমান্তে কমপক্ষে ৩১৮ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। একই সময় কিছু ভারতীয় নাগরিকও নিহত হয়েছেন। তবে তাদের বিস্তারিত পরিসংখ্যান ভারতীয় গণমাধ্যম, বিজিবি বা সীমান্তসংশ্লিষ্ট কারও কাছে পাওয়া যায়নি।
ভারতের গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার রাজশাহী সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফের গোলাগুলিতে বিএসএফ জওয়ান বিজয়ভান সিংহ নিহত ও অন্য একজন আহত হয়েছেন। এর আগে ২০১১ সালে হিলি সীমান্তে বিটন বর্মণ নামে এক ভারতীয় যুবক নিহত হন। বিজিবি বলছে, বৃহস্পতিবার সকালে বাংলাদেশের ভেতরে চারঘাট থানার শাহরিয়ার খাল এলাকায় ঢুকে তিন ভারতীয় জেলে মাছ ধরছিল। মা ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচির আওতায় সেখানে একজন মৎস্য কর্মকর্তার উপস্থিতিতে বিজিবির অভিযান চলছিল। ওই সময় এক ভারতীয় জেলে বিজিবির হাতে আটক হলে বিএসএফের চার সদস্য ‘অনুমতি ছাড়াই’ শূন্যরেখা পেরিয়ে তাদের ছাড়িয়ে নিতে আসেন। তখন বিজিবি পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে ভারতীয় জেলেকে হস্তান্তরের কথা বললে বিএসএফ তাকে ‘ছিনিয়ে নেওয়ার’ চেষ্টা করে এবং গোলাগুলির সূত্রপাত হয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ১৩ অক্টোবর চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাসুদপুর সীমান্তে বিএসএফ গুলিতে জোহরুল ইসলাম ও গত ১৪ আগস্ট চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদার ঠাকুরপুর সীমান্তে আবদুল্লাহ নামে দুই বাংলাদেশি নিহত হন। এর আগে গত ১১ জুলাই চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের ওয়াহেদপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে সাদাম হোসেন ও একই এলাকার রয়েল নামে দুজন নিহত হন। এর বাইরেও আরও একাধিক ব্যক্তি সীমান্ত হত্যাকাÐের শিকার হয়েছেন গত সাড়ে তিন মাসে।
আসকের তথ্যমতে, ২০১৮ সালে বিএসএফের গুলি ও নির্যাতনে মারা গেছে ১৪ বাংলাদেশি। অধিকারের প্রতিবেদনে এই সংখ্যা ১১ জন। যেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জাতীয় সংসদে দেওয়া তথ্যমতে, এই সংখ্যা মাত্র ৩ জন। অধিকার তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলেছে, ২০১৮ সালে নিহত ১১ জনের মধ্যে গুলিতে ৮ জন ও নির্যাতনে ৩ জন মারা গেছেন। তারা হচ্ছেন কুড়িগ্রামের রৌমারীতে কদম আলী, লালমনিরহাটের বুড়িমারীতে মনজরুল আলম, ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরে আলী হোসেন, সিলেটে মামুনুর রশীদ, ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে সাইদুল ইসলাম ও রাব্বানী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে মোহাম্মদ জেম, আবদুর রহিম, ফটকি, শরিফুল ইসলাম ও ডালিম মাঝি। ২০১৮ সালে বিএসএফের হাতে আহত হয়েছেন ২৪ জন। তাদের মধ্যে ১৭ জন গুলিতে, ৫ জন নির্যাতনে ও ২ জন বোমায়। একই সময় ১৬ জন বিএসএফ কর্র্তৃক অপহৃত হন।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সীমান্তে আহত হয়েছেন পাঁচজন এবং অপহরণের শিকার ১৯ জন। এর মধ্যে গত ২৭ মে নওগাঁর সাপাহার সীমান্তে আজিমউদ্দিন নামে এক বাংলাদেশি রাখালের দুই হাতের ১০ আঙুলের নখ উঠিয়ে নেওয়া হয়। তার আগে গত ১০ মে সাতক্ষীরার কুশখালী সীমান্তের কাছে কবিরুল ইসলাম নামে একজনকে পায়ুপথ ও মুখে পেট্রল ঢেলে হত্যার অভিযোগ রয়েছে বিএসএফের বিরুদ্ধে। চলতি বছর জানুয়ারিতে মাত্র ১০ দিনে ঠাকুরগাঁও সীমান্তে মারা যান ৩ জন। রানীশংকৈল উপজেলার ধর্মগড় সীমান্তে গুলিতে জাহাঙ্গীর আলম রাজু (২১), হরিপুর উপজেলার মিনাপুর সীমান্তে জেনারেল (১৮) ও জগদল সীমান্তে নিহত হয় স্কুলছাত্র সোহেল রানা বাবু (১৪)।
গত ১১ জুলাই জাতীয় সংসদে সীমান্ত হত্যা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, ২০০৯ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ১০ বছরে সীমান্তে বিএসএফের হাতে ২৯৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ৬৬ জন, ২০১০ সালে ৫৫, ২০১১ সালে ২৪, ২০১২ সালে ২৪, ২০১৩ সালে ১৮, ২০১৪ সালে ২৪, ২০১৫ সালে ৩৮, ২০১৬ সালে ২৫, ২০১৭ সালে ১৭ এবং ২০১৮ সালে ৩ জন হত্যার শিকার রয়েছেন।
সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা অনেকটা কমে এসেছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে বলেছিলেন, তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সীমান্তে হত্যা ক্রমান্নয়ে কমছে। ২০০৯ সালে যেখানে হত্যা হয়েছিল ৬৬ জন; ২০১৮ সালে তা কমে ৩ জনে দাঁড়িয়েছে। সীমান্তে বিএসএফ কর্র্তৃক বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা বন্ধের বিষয়ে বিজিবি সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে এবং সরকার ক‚টনৈতিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সীমান্ত এ ধরনের হত্যাকে শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে বিএসএফ একমত পোষণ করে আসছে বলেও মন্ত্রী দাবি করেন। পরে এক সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘সীমান্ত হত্যা বাড়ার অন্যতম কারণ সীমান্তবর্তী এলাকার কিছু লোকের বেপরোয়া আচরণ। তাদের বিষয়ে বিজিবি ও বিএসএফের প্রতিবদেন একই।’
বিজিবির সদর দপ্তর পিলখানায় গত ১২-১৫ জুন বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনে সীমান্ত হত্যার বিষয়ে আলোচনা হয়। ওই সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএসএফ মহাপরিচালক রজনীকান্ত মিশ্র বলেছিলেন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড হচ্ছে না, অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু হচ্ছে। তিনি স্বীকার করেন, সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে।
সম্প্রতি পিলখানায় এক অনুষ্ঠানে সীমান্ত হত্যা নিয়ে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলাম বলেন, ‘অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের কারণে সংঘটিত সব হত্যাকাণ্ড সীমান্ত হত্যা নয়। সীমান্তে নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ড ঘটছে ভারতীয় সীমান্তের ১০-২০ কিলোমিটার ভেতরে। নো ম্যানস ল্যান্ডের মধ্যে বাংলাদেশের ১৫০ গজ ও ভারতের ১৫০ গজ এলাকায় হত্যা হলে সেটাকে সীমান্ত হত্যা বলা যাবে। অন্যথায় এগুলো হত্যাকাণ্ড।’ তিনি বলেন, কোনো হত্যাকাণ্ডই গ্রহণযোগ্য নয়। বিজিবি প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীও আমাদের এ বিষয়ে আশ্বস্ত করেছে। চোরাচালানোর জন্য কিছু বাংলাদেশি ঝুঁকি নিয়ে সীমান্তের ওপারে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা খাসিয়া বা ভারতীয় নাগরিকদের হাতেও মারা যায়। মহাপরিচালক আরও বলেন, আমরা বিএসএফকে বরাবরই ননলিথাল (প্রাণঘাতী নয়) এমন অস্ত্র ব্যবহারের কথা বলেছি। তারা আমাকে আশ্বস্ত করেছে, বিষয়টি দেখবে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে সতর্ক করবে।
সীমান্ত হত্যা বেড়ে যাওয়া ও প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার বিষয়ে জানতে চাইলে আসকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা শুনছি বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে সম্পর্ক এখন স্মরণকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। তারা যৌথ টহল দিচ্ছে, ডিজি পর্যায়ে বছরে দুবার সম্মেলন হচ্ছে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বৈঠকও হয়। সেখানে বারবারই সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোটায় আনার কথা বলা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, প্রতি বছরই বিএসএফের গুলিতে বেশকিছু বাংলাদেশি নিহত হয়। অতিসম্প্রতি মাছ ধরাকে কেন্দ্র বিএসএফ-বিজিপি গোলাগুলি হয়েছে। প্রতি বছর যে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়Ñ এ ঘটনা প্রমাণ করে বিএসএফের সঙ্গে বাস্তবতা ও সুসম্পর্ক নিয়ে আমাদের বক্তব্য এক নয়। আমাদের সম্পর্ক উচ্চমাত্রায় থাকলে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের মানুষ নিহত হতো না। বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে যেসব অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে তাও ঘটত না।
