ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে আবদুল্লাহপুর রুটে চলাচলকারী প্রজাপতি-পরিস্থান বাসের চালক বাদল মিয়া। প্রতিদিন ভোর ৫টায় রাজধানীর বসিলা ব্রিজের মুখে গাড়ি নিয়ে লাইনে দাঁড়ান। যাত্রা শুরু সকাল ৬টায়, শেষ রাত ১টার দিকে। দিন-রাত ২০ ঘণ্টা কাটে তার গাড়ি নিয়ে। কাটে না শরীর-মনের অবসন্নতা। তবে দরিদ্র জীবনের ঘানি টানতে পরের দিন ভোরে ফের গাড়িতে উঠতে হয় তাকে। মালিকের শর্ত অনুযায়ী, দৈনিক তিন ট্রিপ থেকে আয় করতে হয় ৯ হাজার টাকা। এর মধ্যে সড়কে দিতে হয় কয়েক স্তরে চাঁদা। তারপর যা থাকে তা দিয়ে পরিশোধ করেন সহকারীর মজুরি। এতসব চাপ নিয়ে সড়কে শৃঙ্খলা না থাকায় প্রতিদিন বাদলকে এক ধরনের যুদ্ধে শামিল হতে হয়। এর মধ্যে আছে মালিকের আয়ের লক্ষ্যপূরণে যাত্রী তোলার চাপ, সময় বাঁচিয়ে এগিয়ে যাওয়া, যানজট এড়াতে অহেতুক চেষ্টাসহ এমন হাজারো ঝক্কি। এসব করতে গিয়ে একটু এদিক-সেদিক হলেই ট্রাফিক পুলিশের কাছে গুনতে হয় জরিমানা। বাদলের দাবি, প্রতিদিন তিনি ২-৩ হাজার টাকার মামলায় পড়েন। এই টাকার অর্ধেক মালিক, বাকি অর্ধেক চালক ও তার সহকারীকে পরিশোধ করতে হয়। এতে দিনশেষে তার ৫০০ টাকাও টেকে না।
রাজধানীর গুলশানের ঢাকা চাকা বাসের চালক আবদুল আজিজ। তার দৈনিক মজুরি ১ হাজার ৪০০ টাকা। প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত ট্রিপ দিতে হয় ১৬টি। মালিকপক্ষের আয়ের শর্ত নেই। ফলে বাড়তি চাপও নেই আজিজের। এতে পুলিশি মামলায় পড়তে হয় না তাকে। গাড়িতে নেই ঘষামাজা, ফিটনেসও মজবুত। আবদুল আজিজ জানান, ঢাকা চাকায় নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি আল মক্কা পরিবহনের চালক ছিলেন। তখন মালিকের শর্ত অনুসারে আয়, সড়কের চাঁদাসহ প্রতিদিন মামলার চাপে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল জীবন। আগের মতো এখনো কর্মঘণ্টা বেশি হলেও সংসার চলছে ভালো।
রাজধানীতে চলাচলকারী এ দুই ধরনের গণপরিবহনের শ্রমিকদের জীবিকা ও কর্মের রয়েছে বড় পার্থক্য। তবে শ্রম আইন মেনে এ দুই পরিবহন শ্রমিকদের নিয়োগ হয় না, নেই নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, মালিকদের ইচ্ছা-অনিচ্ছায় ঘোরে তাদের ভাগ্যের চাকা। তবুও ঢাকা চাকায় কর্মরত শ্রমিকদের শৃঙ্খলা আছে। অন্য পরিবহন শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এমনটি নেই। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রায় ১৮-২০ ঘণ্টার বিশ্রামহীন কাজের চাপ, শরীর চাঙ্গা রাখতে মাদকে জড়ানো, নিম্ন মজুরি, চাকরির অনিশ্চয়তা, মালিক-যাত্রী-প্রশাসনের লাঞ্ছনা, অর্থকষ্ট, অনিশ্চিত জীবন, শেষ জীবনে দুর্গতি, পারিবারিক অশান্তিসহ নানা কারণে এক ধরনের টালমাটাল জীবন পার করছেন দেশের কয়েক লাখ গণপরিবহন শ্রমিক। এর বড় প্রভাব সড়কের ওপর পড়ছে বলে মনে করছেন পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিবহন খাত দেশের অর্থনীতির রক্ত প্রবাহের মতো। এখানে মালিক, সরকার, চাঁদাবাজ, প্রশাসনসহ বেশ কয়েকটি পক্ষ জড়িত। কিন্তু এ খাতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে প্রথম টার্গেট হন দরিদ্র শ্রমিকরা। সুকৌশলে পরিবহন শ্রমিকদের পুরো জাতির শত্রæ হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। অথচ এই শ্রমিকদের আইন অনুযায়ী, কোনো নিরাপত্তা, সার্ভিস বুক, ঝুঁকি ভাতা, গ্র্যাচুইটি, পেনশন কিছুই নাই। এ এক বেপরোয়া জীবন, দিনশেষে যারা মৃত্যুকে কোলে নিয়ে বেঁচে আছেন।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবমতে, ২০১৯ সালের মে পর্যন্ত ঢাকায় চলাচল করা ১৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৬০টি পরিবহনের মধ্যে বাস ৩৪ হাজার ৪৮২টি। এসব বাসে কমপক্ষে এক লাখ শ্রমিক কাজ করেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজউদ্দিন আহমেদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে দৈনিক মামলা হয় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার। মাস শেষে এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায়
এক লাখ। চলতি বছর গত ৯ মাসে সাড়ে আট লাখের মতো মামলা হয়েছে।
মামলার চাপে কাবু বাসচালকরা দেশ রূপান্তরের কাছে ট্রাফিক সার্জেন্টদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, সার্জেন্টদের ইচ্ছা-অনিচ্ছায় চলে ঢাকার সড়ক। কারণে-অকারণে মামলা দেওয়ার প্রতিযোগিতা রয়েছে তাদের মধ্যে। সামান্য প্রতিবাদ করলে ৪০০ টাকার মামলা ১ হাজার টাকা করে দেন। গাড়ি নষ্ট হলে না সরিয়ে রেকার বিল নেন। এসব খরচের বড় অংশ যেহেতু শ্রমিকদের মজুরি থেকে কাটা হয়, ফলে দিনশেষে সংসার খরচও থাকে না।’
কয়েকজন ট্রাফিক পরিদর্শকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দৈনিক মামলার ওপর নির্ভর করে কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা নির্ধারণ করা হয়। যিনি সবচেয়ে বেশি মামলা দিতে পারেন, মাসিক সভায় তাকে পুরস্কৃত করা হয়। এ বিষয়ে মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকার পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা না আসার প্রধান কারণ অতিরিক্ত গাড়ি। এজন্য মামলার সংখ্যা বাড়ছে। নির্দিষ্ট পরিমাণ মামলা দেওয়ার জন্য সার্জেন্টদের নির্দেশ দেওয়া থাকে। তবে প্রতিযোগিতা করে দেওয়া হয় কি না, আমার জানা নেই।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার কারণে একজন চালক ও তার সহকারী দৈনিক ঘুমানোর জন্য সময় পান গড়ে ৩ ঘণ্টার কম। শতকরা ৯০ পরিবহন শ্রমিক মাদক সেবনে অভ্যস্ত। তাদের অধিকাংশের দাবি, মাত্রাতিরিক্ত মানসিক চাপ সামাল দিতে মাদকে জড়ান তারা। এর প্রভাব পড়ছে তাদের পারিবারিক জীবনেও।
দেশ রূপান্তরকে কয়েকজন শ্রমিক বলেন, মাদক সেবন ও সময় দিতে না পারায় তাদের পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে। এসব কারণে তাদের স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়েছে। এসব শ্রমিকের স্বাস্থ্যও ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সড়কে থাকায় দিন কাটে রুটি-কলা খেয়ে। রাতে জোটে ভাত। দীর্ঘ কর্মসময়ে পায়খানা-প্রস্রাবও ঠিকমতো করার সুযোগ মেলে না। খাবার, বিশুদ্ধ পানিও জোটে না তাদের। পুষ্টিকর খাদ্য ও প্রয়োজনমতো ঘুমের অভাবে স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে তাদের। সঞ্চয় না থাকায় অসুস্থ হয়েও কাজ করতে হয়। তা না হলে পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকতে হয়। এছাড়া দুর্ঘটনায় পড়ে ক্ষতিপূরণ না পাওয়া, যাত্রীদের কাছ থেকে লাঞ্ছনাসহ বিভিন্ন কারণে অসহনীয়ভাবে কাটে পরিবহন শ্রমিকদের জীবন। এতকিছুর পরও মালিকদের দেওয়া আয়ের লক্ষ্যপূরণ করতে না পারলে চাকরিচ্যুত হতে হয় তাদের।
ইদরিস আলী নামে এক চালক সহকারী বলেন, ‘এটা কোনো জীবন নয়, এই জীবনের চারআনাও মূল্য নাই। শরীরের বল শ্যাষ হইলে ভিক্ষা কইরা আমাদের খাইতে হয়।’
পরিবহন শ্রমিকদের অধিকার প্রসঙ্গে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) সাবেক মহাপরিদর্শক ড. মঞ্জুর কাদের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও কর্মপরিবেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গরম ইঞ্জিনের ওপর টানা ১৮ ঘণ্টা গাড়ি চালালে চোখ, কাঁধ, পিঠ ও পেশির ব্যাপক ক্ষতি হয়। শরীরে দৈনিক তিন হাজার ক্যালরির বেশি তাপ এদের উৎপাদন করতে হয়। এজন্য সুষম খাবার ও কমপক্ষে আট ঘণ্টা বিশ্রামের প্রয়োজন। এসব না পাওয়ায় পরিবহন শ্রমিকরা কম বয়সে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মালিক, সরকার ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর অসহযোগিতার কারণে এ খাতের শ্রমিকদের জীবন ভয়ানক হয়ে উঠেছে। গাড়ির কাগজ না থাকলে সার্জেন্টরা চালকের নামে মামলা দেয়। মালিকের নামে দেয় না। বিআরটিএ’র কর্মকর্তারা অসাধু কাজে লিপ্ত। মালিকরা নিয়োগপত্র দেয় না। ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা দেয় না। যখন-তখন ছাঁটাই করে। আর শ্রমিক সংগঠনগুলো শ্রমিকদের সংগঠিত করতে না পারায় এদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানো যাচ্ছে না।’
তবে সব দোষ শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘তারা অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার নিতে চায় না। দৈনিক মজুরি নিতে আগ্রহী। তারাই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে।’
সড়ক-পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ড. শামসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিবহনের প্রাণ শ্রমিক। উন্নত বিশ্বের মতো একটা অপারেটর দিয়ে পরিবহন চালাতে হবে। শ্রমিকদের চাকরিজীবীর মতো সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। তাহলে তাদের আয়ের চাপ থাকবে না। তারা ঘষাঘষি, ধাক্কাধাক্কি করবে না। পরিবহন শ্রমিকদের অর্থনৈতিক মুক্তি দিতে পারলে সড়কে নিরাপত্তাও আসবে। ২০০৫ সালেই এ পরিকল্পনা হয়ে গেছে। এরপরও অনেক হাতড়িয়ে সরকার কোনো সমাধান আনতে পারছে না।’
