দোকানদার ও মুরগি চোর এঁকেছেন। পরে ফিলিপাইনের ফিল কার্টুন অ্যানিমেশন স্টুডিওতে গিয়েছেন তৈরির সময়। কাজ করেছেন রাম মোহনের সঙ্গে। পরে ইউনিসেফের মীনা নিয়ে করা পাখিরা উড়বেই গল্পটিও প্রখ্যাত শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য্যের। তার জবানে মীনা লিখেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন মহুবার রহমান
ইউনিসেফের মীনা কার্টুন ও অ্যানিমেটেশন ফিল্ম; সেটির শুরু থেকে আমি যুক্ত ছিলাম; প্রথম মীনার সঙ্গে ছিলাম। পরে আর ছিলাম না। সে ইতিহাস হলো–এক ব্রিটিশ ভদ্রমহিলা, নাম ‘রেচেল কার্নেগি’, নারী শিশুদের শিক্ষাকে যখন উন্নয়নের বিষয় হিসেবে ইউনিসেফের মাধ্যমে এলো, তিনি সেখানে এ বিষয়ে কী কী কাজ করা যায় সেগুলো ঠিক করলেন; কোন কোন দেশে সেসব কার্যক্রম পরিচালিত হবে, সেগুলো তারা চিহ্নিত করলেন। দেশগুলোর মধ্যে বেশি গুরুত্ব পেল দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল ও ভারত। তারা দেশগুলোকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন–এ অঞ্চলগুলোর মেয়েদের শিক্ষাকে আরও উৎসাহিত করা প্রয়োজন। তখন আরও ব্যাপকভাবে চতুর্থ, পঞ্চম শ্রেণির পর স্কুল থেকে মেয়েরা ঝরে পড়ত। লেখাপড়ায় তাদের অনেক কম মনোযোগ ছিল। তারা বললেন, মেয়েরা কীভাবে শিক্ষিত হবে–এই বিষয়কে আরও উৎসাহিত করার জন্য এ প্রকল্প। তাতে পরামশর্ক ও কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া হলো তাকে। তিনি ঢাকার ইউনিসেফ অফিসে এলেন এবং এই প্রকল্পের শুরু থেকে তিনি যুক্ত; তার চমৎকার পরিকল্পনা ছিল; এসে কারা কার্টুন, অ্যানিমেশন করেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। তখন অ্যানিমেশন আমাদের দেশে তেমন কেউ করতেনই না। বাচ্চাদের জন্য লেখেন, শিল্পী, সাহিত্যিক, ছড়াকার, সবাইকে এর সঙ্গে যুক্ত করতে তিনি ইউনিসেফকে একটি কর্মশালার আয়োজন করতে বললেন। সেখানে তিনি মীনার কথা প্রথম বলে উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা জানালেন। তিনি দেশগুলো পুরো ঘুরেছেন। তিনি একটি নামও পছন্দ করেছিলেন–‘মীনা’। খসড়া একটি গল্প তৈরি করেছিলেন। সেটিই মীনার আদি গল্প। সেখানে সবার মতামতে কিছু যুক্ত হলো, মার্জিত, অন্যরকমও করা হলো। তবে আসল গল্প তারই থাকল। ইউনিসেফের সেই কর্মশালায় আমন্ত্রিত হয়ে আমরা গিয়েছিলাম। আমাদের সিনিয়র শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার, রফিকুন নবী, আমি; আরও কিছু জুনিয়র শিল্পী; ছড়াকার, বাচ্চাদের লেখক ছিলেন। মীনা কার্টুন নিয়ে প্রথম আলোচনা হলো আমাদের। সেখানেই জানতে পারলাম, রেচেল তার আগেই রাম মোহনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তিনি ছবির পরিচালক হবেন ঠিক করা আছে। মোহন অ্যানিমেশন করেন, তার স্টুডিও আছে। যেহেতু ভারতেও মীনা প্রচার করা হবে; সবকিছু মিলে তার সঙ্গে আগেই যোগাযোগ করে রেচেল আমাদের কাছে এসেছেন। ঢাকায় মীনার গল্পে আমাদের ফিডব্যাক দেওয়ার কাজ করতে হলো। কারণ মীনার একটি গল্পেই প্রতিটি দেশের যোগসূত্র থাকতে হবে। আমাদের কিন্তু কোনোকিছু ফাইনাল না করেই আলাপে, পরামর্শে, কাজে বসতে হলো। জানি, কেবল রাম মোহন আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচালক নিযুক্ত হয়েছেন। কিন্তু ছবিটির যে চরিত্রগুলো অঙ্কন, অ্যানিমেশন ফিল্মটিতে যে চরিত্রগুলো থাকবে–মীনা, রাজু, টিয়াপাখি মিঠু; দোকানদার, চোর–ইত্যাদি যেসব চরিত্র প্রথম ছবিটিতে ছিল; কোন পরিবেশে, কোন ল্যান্ডস্কেপে, কোন দেশকে কীভাবে বোঝা যাবে, মানে কোনো বিশেষ একটি দেশ এখানে বোঝা যাবে নাকি চারটি দেশই বোঝা যাবে দেখে–এই বিষয়গুলো নিয়ে কর্মশালাটি হলো। রেচেল বললেন, আপনারা আপনাদের মতো সবাই এই চরিত্রগুলোকে ডিজাইন করুন। নবী স্যার মীনা, রাজুকে আঁকলেন। মুস্তাফা মনোয়ার তাদের আঁকেননি। তিনি একটি ল্যান্ডস্কেপ করলেন। সেটি নির্বাচিত হয়েছে। আমি মীনা, রাজু, মিঠুদের আঁকলাম। আগে তো আমরা কাজগুলো করিনি। ফলে অ্যানিমেশনের আলাদা ড্রইং স্টাইল আমরা জানতাম না। ফলে আমাদের মতো করেছিলাম। আমি মীনা ধরে একটি বাচ্চা মেয়ের চেহারা এঁকেছিলাম। তারা যেভাবে বলেছিলেন, সেভাবে মীনার বয়সকে ধরার চেষ্টা করেছি। রাজু তার ছোট ভাই, টিয়া এঁকেছি। অ্যানিমেশনের ড্রইং আমি মিস করেছিলাম। আরও কয়েকজন শিল্পী তাদের আঁকলেন। পরে সব রেচেল সংগ্রহ করে সেগুলো নিয়ে নেপাল, পাকিস্তান গিয়ে সেসব দেশ থেকেও সেভাবে শিল্পীদের সব কাজ নিয়ে নিলেন। ভারত থেকে রাম মোহন ছাড়া আলাদাভাবে আর একটি মেয়ে নাম ভুলে গিয়েছি; তার কাজ নিয়েছেন। আমাদের সবার সবকিছু মোহনকে ইউনিসেফের মাধ্যমে দিলেন। তিনি সব নিয়ে একটি সাধারণ মীনার গল্প ও চরিত্র তৈরি করলেন। আমাদের কাজ তার মীনা, রাজু তৈরিতে তাকে সাহায্য করেছে। তিনি হয়তো তাদের পোশাক, চেহারা সবকিছু আমাদের কাজ থেকে সমন্বয় করে নিয়েছিলেন। সেখানে সবাই আছে, চারটি দেশই সেই গল্প দেখে মনে করবে_ আমাদের মীনা, আমাদের রাজু। এই কাজটি মোহন করলেন ও এরপর পুরো স্টোরি বোর্ড করলেন। অ্যানিমেশনের স্টোরি বোর্ড লিখিত থাকে না, ছবি দিয়ে দিয়ে একের পর এক চিত্রনাট্যের মাধ্যমে বোর্ড তৈরি করতে হয়। এসব কাজ শেষ করে ফেলার পর ছবিটি প্রযোজনার সময় ইউনিসেফ থেকেই চারটি দেশ থেকে চারজন শিল্পীকে আমন্ত্রণ জানানো হলো। বাংলাদেশ থেকে আমাকে নিমন্ত্রণ জানাল হলো। নেপাল, পাকিস্তান, ভারত থেকে দিল্লির একটি মেয়েকে আমন্ত্রণ জানানো হলো। দুজন পুরুষ ও দুজন নারী শিল্পী। পাকিস্তানের শিল্পীর নাম নিগার নাজার এমন একটি। নেপালের রাজু বাবু সাক্কা অ্যানিমেশন করতেন। সেখানে থেকেই তিনি একটি অ্যানিমেশন দলের সঙ্গে কাজ করতেন। পাকিস্তানের শিল্পী আমার মতো পত্রিকার কার্টুন করতেন। দিল্লির মেয়েটি কার্টুন, অ্যানিমেশন, বুক ডিজাইন করতেন। আমরা চারজন গেলাম ফিলিপাইনের মেট্রো ম্যানিলাতে। সেখানে ছবিটির প্রযোজনার কাজ হবে। কেননা, পুরো সেটআপ করে প্রযোজনা করা মুম্বাইতে বসে মোহনের পক্ষে সম্ভব ছিল না। যদিও সম্ভব হতো, তারপরও এটি অনেক বড় কাজ ছিল; অনেকগুলো ছবি মীনা থেকে তৈরি হবে। ফলে ম্যানিলার ‘ফিল কার্টুন’ নামের স্টুডিওতে এই কাজ হলো। তারা প্রচুর কমিশনের কাজ করেন। তাদের যে অ্যানিমেশন শিল্প, একে ইন্ডাস্ট্রিই বলব; আমরা এখন আমাদের যে গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি দেখি–কেউ সেলাই করছেন, কেউ বোতাম লাগাচ্ছেন, কেউ সিল মারছেন, কেউ জামায় ইস্ত্রি করছেন; এমন বিভিন্ন ভাগ আছে অ্যানিমেশন ফিল্ম তৈরির সে স্টুডিওতে। এখন অ্যানিমেশন ফিল্ম অনেক সহজ হয়ে গেছে, তখন নব্বইয়ের শুরুতে; সেল অ্যানিমেশন বলে একে; প্রতিটি আলাদা আলাদা এক্সপোজার নিয়ে সেলের ওপর ট্রান্সপারেন্ট শিটে খুব কষ্ট করে কাজগুলো করা হতো। পুরো ছবির কাজটিই ভীষণ কঠিন ছিল। এই সুবিধাগুলো তাদের ছিল। ফিল কার্টুন বিশ্বখ্যাত ও অ্যানিমেশন শিল্পের মূল প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ডিজনির সহযোগী প্রতিষ্ঠান ছিল। তারা তাদের টম অ্যান্ড জেরির কাজ করত সেখান থেকে; অ্যানিমেশন কার্টুন গল্প রিং স্টোনের কাজও তারা বাইরে থেকে অর্ডার নিয়ে ম্যানিলা থেকে গার্মেন্ট শিল্পের মতো করে দিত। ফলে তাদের সব সুবিধাই ছিল। সেখানে মোহন আসলেন। এখান থেকে রেচেলের সঙ্গেই আমি গেলাম। অন্য তিন শিল্পীরাও সেখানে গেলেন। আমরা প্রায় এক মাসের মতো ছিলাম। আমাদের মীনা তৈরি হচ্ছে সেখানে; মোহনের নানা বিষয় নিয়ে আমাদের দফায় দফায় আলোচনা হচ্ছে; কিন্তু মূল গল্পে আমরা তখন আর সেখানে কাজ করছি না।
আমাদের নিয়ে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো–আপনারা দেখুন কীভাবে অ্যানিমেশন তৈরি হয়; সেখানে তাদের যারা পারদর্শী তারা আমাদের কিছু ক্লাসও নিলেন। তাদের পরিচালকও আমাদের অ্যানিমেশনের ক্লাস নিলেন। অন্যান্য বিভাগের পরিচালকরাও আমাদের ক্লাস নিলেন। মোহন ব্যক্তিগতভাবে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করলেন যে তার স্টোরি বোর্ডে কিছু সমস্যা তিনি সমাধান করতে পারেননি। কোনো একটি ঘরের নকশা, কোনো একটি গাছের পাতার শেপ, ঘরের ভেতরের জিনিশগুলোর বিস্তারিত ইত্যাদি তৈরিতে আমরা সাহায্য করলাম। আমরা ঠিক করে দিলাম, তিনি সেগুলো ছবিতে ব্যবহার করলেন। একটি চরিত্র যেটিতে রাম মোহন নিজে ভালোভাবে সন্তুষ্টির সঙ্গে করতে পারেননি বলে সেই দোকানদার ও মুরগি চুরি করে নিয়ে যায়–সেই চোর চরিত্র–এই দুটি চরিত্র আমি তৈরি করেছি। দোকানদারের মুখটি আমারই করা। এই কাজগুলোতে খুব উৎসাহের সঙ্গে, বিনয়ের সঙ্গে তিনি আমাদের সংযুক্ত করেছেন। ল্যান্ডস্কেপের ব্যাপারও তাই। মোহনের স্ত্রীও তখন ছিলেন। কথা হয়েছে। ঢাকায়ও তিনি কারও কারও কর্মশালায় পরে এসেছিলেন। তখনো দেখা হয়েছে। তার কথা যখন ওঠে আমি অবাক হয়ে যাই, তাকে দেখেও অবাক বনেছি–একজন ভদ্রলোক যিনি ফাইন আর্টসের ছাত্র না হয়েও রসায়নে লেখাপড়া করে অ্যানিমেশন ফিল্মে কীভাবে এলেন? অ্যানিমেশন ফিল্ম করতে গেলে ড্রইং জানতে হয়, ছবি আঁকার সব ধরনের উপলব্ধি ও বোধ থাকতে হয়। ক্যামেরার সেন্স থাকতে হয় মানে ছবি আঁকা থেকে শুরু করে ক্যামেরার সব কাজ জানতে হয়। এই সবগুলো বিষয়ে তিনি এতই অভিজ্ঞ যে তাকে বলা হয়–ভারতে অ্যানিমেশন ফিল্মের জনক। খামাখা নয়, তার আগে যে টুকটাক অ্যানিমেশন সেখানে হয়নি তা নয়; কিন্তু এই কোয়ালিটিগুলো তিনি তার ব্যক্তিগত ইচ্ছে থেকে অর্জন করেছিলেন। সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসেও ডিজনির অ্যানিমেটরদের সঙ্গে ইন্টার্নশিপ, তাদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন। ফলে আমার জীবনে রাম মোহন একটি বিশাল ঘটনা, সাংঘাতিক অভিজ্ঞতা হয়েছে তার সঙ্গে কাজ করার সূত্রে। মানুষ হিসেবে অসাধারণ। তিনি কখনোই তার কাজ নিয়ে পরে বলেননি। তাকে দেখে কখনো বোঝা যায়নি, তিনি এত বড় মাপের মানুষ। আমার বিষয়ে তার একটি অবজারভেশন (পর্যবেক্ষণ) ছিল। তিনি আমার ড্রইং, আঁকা, কার্টুন কাজ দেখেছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে আমাকে বলেছিলেন, ‘শিশির তুমি কিন্তু ঢাকায় গিয়ে অ্যানিমেশন শুরু করো।’ সেখানে কিন্তু মীনার সঙ্গে যুক্ত আরও তিন শিল্পী ছিলেন, তারপরও আমার কাজের বিষয়ে তার এই ব্যক্তিগত মতামত তার অভিজ্ঞতা থেকে আমাকে দিয়েছিলেন। ‘কেননা তোমার সাংঘাতিক ভালো কাজ হবে’, বলেছিলেন তিনি। আশা করছিলেন, শিশির ভট্টাচার্য্য যাতে অ্যানিমেশন নিয়মিত করেন। যা হোক আমি তো আর অ্যানিমেশনের দিকে যাইনি। পত্রিকায় কার্টুনই করতাম। কারণ অ্যানিমেশনে কাজ করা সম্ভব ছিল না এই কারণে এই শিল্পে অংশ নেওয়া এতই জটিল সংযোগ যে একবার যুক্ত হয়ে গেলে অন্য কিছু আর করা যাবে না। একেবারে শতভাগ অ্যানিমেশনে মনোযোগ দিতে হয়। ফলে শিক্ষকতাসহ নানাভাবে শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থেকে আর সেদিকে যেতে পারিনি। কিন্তু বাংলাদেশে যারা অ্যানিমেশন শিল্পের শুরুর দিকের কর্মী; তাদের প্রথম দিকের কর্মশালাগুলোতে এক ধরনের দিকনির্দেশনার কাজগুলো করেছিলাম। তারা আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। এখন আর দরকার পড়ে না। কারণ তারা সবাই অভিজ্ঞ হয়ে গিয়েছেন। কম্পিউটার অ্যানিমেশনের অনেক টুলস বা উপকরণ তৈরি হয়েছে, ফলে অ্যানিমেশন অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে। আগের সেই খুব কঠিন সেল অ্যানিমেশন এখন আর নেই।
মীনা ফিল্ম সেই ফিল কার্টুন থেকে তৈরি হলো। পরিচালক হলেন রাম মোহন। ক্রেডিট লাইনে রেচেল কার্নেগির নাম আছে, তিনি কে সেখানে বলা আছে। প্রথম ছবিটিতেই এগুলো আছে। এরপর থেকে আস্তে আস্তে মীনা-১, মীনা-২, মীনা-৩ এভাবে ছবিটি ধারাবাহিকভাবে তৈরি ও দেশে, দেশে প্রকাশিত হলো। সবগুলোর সঙ্গে রাম মোহন ছিলেন। শেষের দিকে বোধহয় রাম মোহন পরিচালক থাকলেও প্রযোজনাগুলো বিভিন্ন জায়গাতে হতো। বাংলাদেশেও হয়েছে, কাউকে কাউকে দায়িত্ব দিয়ে করা হয়েছে। তিনি দেখে ঠিক করে দিয়েছেন। মুক্তি পেয়েছে মীনা। শেষ ছবিতে তার যুক্ততা ছিল কি না জানি না। অনেকদিন অ্যানিমেশনের এই বিষয়গুলো থেকে দূরে আছি। প্রথম একটি দুটি ছবি দেখার পর আর মীনা দেখার সময় হয়নি যে!
পরে মীনা খুব জনপ্রিয় হয়ে গেল। বাংলাদেশে, নেপালেও খুব জনপ্রিয় হয়ে গেল। আমাদের দেশে প্রথমটি প্রচার হওয়ার পর সাংঘাতিক প্রভাব পড়ল। মীনা দেখার জন্য সব শিশু পাগল ছিল। অল্প হলেও আমার ইনভলবমেন্ট বা সংযুক্তি আছে- ভেবে, দেখে মজা পেতাম। ভারতে কেমন হয়েছে জানি না, কিন্তু পাকিস্তানেও বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। এর অনেকদিন পরে, প্রায় সাত, আটটি মীনা হয়ে যাওয়ার পর ইউনিসেফ ভাবল, মীনার কার্যকারিতা কতটুকু প্রভাব ফেলছে? মেয়েরা যাতে স্কুলে যায়, তারা যেন স্কুল থেকে ঝরে না পড়ে এবং তাদের যেন গুরুত্ব দেওয়া হয়–এই তো মীনার উদ্দেশ্য। এখানে নারী অধিকার ইত্যাদি বিষয় ছিল না। মীনার মূল উদ্দেশ্য ছিল মেয়েরা যাতে শিক্ষিত হয়। একটি শিক্ষিত মেয়ে হলে সে প্রতিযোগিতায় নামবে, সেভাবে চাকরি পাবে; স্বাভাবিকভাবেই তারা কর্মক্ষেত্রে চলে আসবে। আসল বিষয়টি হলো শিক্ষা। সবাই বলে, তৃতীয় বিশ্বে মেয়েরা পিছিয়ে আছে, সেটির বড় কারণ তাদের লেখাপড়ার অভাব। স্কুলে গেলেও মায়েরা দুদিন পরেই বলেন, না তোর আর স্কুলে যাওয়ার দরকার নেই; তুই ঘরের কাজ কর। মেয়েদের এত লেখাপড়া শিখে কী হবে? এই বিষয়গুলো মীনার গল্পেও আছে। এসব কারণে মীনা খুব জনপ্রিয় হয়ে গেল। কিন্তু যখন বেশ কটি ছবি বেরুল, ইউনিসেফ কী চিন্তা করল; তারপর মূল জায়গা থেকে মীনাকে সরিয়ে নেওয়া হলো। সে ইউনিসেফের পারপাস (উদ্দেশ্য) সার্ভ করতে লাগল। তাকে দিয়ে পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, উন্নয়ন ইত্যাদি নানা ধরনের কাজ করানো হতে লাগল। এই সব বিষয়ে মীনাকে দিয়ে জ্ঞান দেওয়া হতে লাগল। মীনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকুন, খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে হাত ভালো করে ধুয়ে নিন, খালি পায়ে ঘুরবেন না স্যান্ডেল পরুন, শিশুদের দিকনির্দেশনা দেওয়া–ইত্যাদি কাজগুলো করতে লাগল।
তাতে এক ধরনের সমস্যা তৈরি হলো। সেটি তারা পরে টের পেলেন। আমরাও দেখেছি। তখন ইউনিসেফ মীনা ফ্যাসিলিটেটর গাইডস নামে মীনা কী এটি বোঝানোর জন্য আরেকটি কর্মশালা করল। সেখানে আমি অংশগ্রহণ করেছি। সেই সময় মীনা যে স্বাধীন, বাচ্চা মেয়ে; তাকে তো বড়দের মতো করে কথা বলিয়ে লাভ নেই; তার যে আচরণ; তখন সেখানে আরেকজন পরামর্শক (কনসালটেন্ট); তিনিও ব্রিটিশ ছিলেন, নামটি এখন আর মনে পড়ছে না; অন্য এক মহিলা; তিনি আবার সাংবাদিকসহ নানা কাজে যুক্ত ছিলেন; তিনিও কর্মশালাটি করলেন; আমরা কথাগুলো বললাম। সেখানে আলোচনা হলো, মীনা ফ্যাসিলিটেটর গাইডের জন্য কী কী হতে পারে? তখন আরেকটি কাজ হলো–শিক্ষকদের জন্য; যারা মীনা সম্পর্কে ছাত্র, ছাত্রীদের বলবেন, তার উদ্দেশ্য জানাবেন; তারা যাতে মীনাকে ভুলভাবে উপস্থাপন না করেন। তখন মীনার সেই ফ্যাসিলিটেটর গাইডে অনেকে অনেক গল্প করলেন, লিখলেন, আঁকলেন। সেখানে আমার স্টোরি বা গল্পটি নির্বাচন করা হলো। সেটির একটি ইলাসট্রেশন, কিছু বই ইত্যাদি করা হলো। সেই কাজের সঙ্গেও যু্ক্ত ছিলাম। তারা আমার গল্পটিই গাইডের জন্য নির্বাচন করলেন। সেই ছোট্ট গল্পটি ইউনিসেফে আছে। মীনা, রাজু, মিঠু–তাদের নিয়েই গল্প; কিন্তু নাম ছিল ‘পাখিরা উড়বেই’। পুরো পাতার ছবি দিয়ে, ছোট্ট অল্প লেখা নিয়ে একটি বই হয়েছিল।
সেটির মূল বিষয় ছিল–মীনা তখন যে বিষয়গুলো মিস বা ভুল করে যাচ্ছিল, তুলে আনছিল না, সেগুলোকে আরও তুলে আনা। তখন তারা সিলেবাসের বাইরের যেসব বিষয় আছে সেগুলো নিয়ে ভাবছে, কাজ করছে। তারা জঙ্গলে আসছে; দেখছে, তারা গাছপালা, ফুল, প্রজাপতি, পাখি দেখছে। মীনা, রাজু দুজনেই আছে; মিঠু তাদের সঙ্গে আছে। হঠাৎ তারা দেখল, গাছের মধ্যে পাখির বাসা। রাজু ঝাঁপিয়ে পড়ল, সঙ্গে সঙ্গে মীনা থামাল–এই এভাবে করে কাজ করো না; আগে দেখ। তারপর তারা দেখল, সেখানে দুটি ডিম। পাখির বাসাটির যত্ন নেওয়া শুরু করল। পরে তারা দেখল, সেখানে মা পাখি চুপ করে বসে আছে। তারা পাখিদের কোনোভাবেই বিরক্ত করল না। তারা যে যার মতো দেখছে, বনে বেড়াচ্ছে; সেখান থেকে ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরুল; তারা দেখল। বড় হয়ে পাখি উড়ল–এই যে স্বাধীনভাবে তারা যে সবকিছু অবজারভ বা পর্যবেক্ষণ করল–এখান থেকে সবার শিক্ষাটি হলো প্রকৃতির কোনো কিছুতে আমাদের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। আমরা যেমন প্রাকৃতিকভাবে বড় হচ্ছি, তেমনিভাবে গাছপালা, ফুল, পাখি সবাই প্রাকৃতিকভাবেই থাকছে, বড় হচ্ছে সারা দুনিয়াতে। এই শিক্ষাটি মীনার কোনো গল্পে ছিল না। এটি আমারই করা। এই গল্পের ইলাসট্রেশনও আমার করা। আমাদের একটি দল ছিল, তারা আমাকে সাহায্য করেছেন। তারা আমার তত্ত্বাবধানে কাজ করেছেন। এটি অ্যানিমেশন ফিল্ম ছিল না, হতে পারত, কিন্তু পরে আর করা হয়নি। এই বইটি পরে বেশ কাজে দিয়েছে। এই আমার মীনার সঙ্গে কাজের গল্প।
