ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা তারেকুজ্জামান রাজীবকে আটক করেছে র্যাব। গতকাল শনিবার রাতে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সড়কের ৪০৪ নম্বর বাড়িতে আত্মগোপনে থাকা রাজীবকে আটক করা হয়। রাত ১টার দিকে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল মো. সারওয়ার-বিন-কাশেম সাংবাদিকদের বলেন, তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, তিন রাউন্ড গুলি, নগদ ৪৩ হাজার টাকা, পাসপোর্ট ও কয়েক বোতল বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়েছে। রাতভর তাকে নিয়ে বাসাসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হবে।
এর আগে রাত পৌনে ১২টায় র্যাবের গণমাধ্যম শাখা থেকে পাঠানো খুদে বার্তায় বলা হয়, ‘চলমান ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিক উল্টোপাশের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবকে আটক করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ওই বাড়িটি শনিবার রাত ১০টার দিকে ঘিরে ফেলে র্যাব-১ এর একটি দল। র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি দল বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে। আটতলা ওই বাড়ির সপ্তম তলায় একটি ফ্ল্যাটে বন্ধুর বাসায় আত্মগোপনে ছিলেন রাজীব। সেখানে দুটি ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালানো হয়। পরে রাজীবের বাসাতেও তল্লাশি করে র্যাবের আরেকটি দল।
র্যাবের গণমাধ্যম শাখার এএসপি কামরুজ্জামান জানান, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ওই বাসায় রাজীব অবস্থান করছেন এবং ক্যাসিনো ও জুয়ার আসর চলছেÑ এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালিয়ে রাজীবকে আটক করা হয়েছে। এর আগে শনিবার বিকেল থেকেই রাজীবকে গ্রেপ্তারের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।
গোয়েন্দা তথ্যে জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন ক্লাবে ক্যাসিনো ও জুয়ার বোর্ড চালাতে রাজিবের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দারা জানান, কাউন্সিলর রাজীবের গ্রামের বাড়ি ভোলা জেলায়। ঢাকায় থাকেন মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদিয়া হাউজিং এলাকায়। রাজীবের বাবা তোতা মিয়া ও চাচা ইয়াসিন মিয়া মোহাম্মদপুর এলাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। রাজীব ছিলেন টং দোকানদার। একসময় তিনি যুবলীগের রাজনীতি শুরু করেন। যুবলীগের রাজনীতি শুরুর পর কিছু তরুণের সমন্বয়ে মোহাম্মদপুর এলাকায় মোটরসাইকেল বাহিনী গড়ে তোলেন। সাবেক একজন প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে মহড়ায় কাজ করত রাজীবের বাহিনী। ওই প্রতিমন্ত্রীকে রাজীব ‘বাবা’ ডাকেন। ওই প্রতিমন্ত্রীর আশীর্বাদে তিনি ২০১৪ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাউন্সিলর পদে মনোনয়ন পান। কেন্দ্র দখল ও ভোট জালিয়াতি করে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী বজলুর রহমানকে পরাজিত করে কাউন্সিলর হন রাজীব। এরপরই দ্রুত ‘ভাগ্য বদল’ হয় তার। চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখলের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হন রাজীব ও তার পরিবারের লোকজন। তার দখল ও চাঁদাবাজিতে সহযোগী হিসেবে কাজ করেন যুবলীগ নেতা শাহ আলম জীবন, ‘সিএনজি কামাল’, আশিকুজ্জামান রনি, ফারুক ও রাজীবের শ্যালক ইমতিহান হোসেন ইমতিসহ অনেকে। রাজীবের চাচা ইয়াসিন প্রায় ২৫ কোটি টাকায় ইকবাল রোডে একটি বহুতল বাড়ি কিনেছেন। ৬-৭ বছর আগেও রাজমিস্ত্রির কাজ করা ইয়াসিন এত টাকা দামের বাড়ি কেনায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা হয়।
রাজীব ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। কাউন্সিলর হওয়ার আগে মোহাম্মদিয়া হাউজিংয়ের শাহাদাত হোসেনের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন রাজীব। এখন ওই বাড়ির পাশেই জনৈক বারী চৌধুরীর জমি দখল করে বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি করেছেন রাজীব।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, রহিম ব্যাপারীঘাট মসজিদের কাছে আবদুল হক নামের এক ব্যক্তির ৩৫ কাঠার একটি প্লট যুবলীগের কার্যালয়ের নামে দখলে নেন রাজীব। ওই জমির পাশেই জাকির হোসেনের প্রায় আট কাঠার একটি প্লট দখলের চেষ্টা করেন তিনি। পরে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে ওই জমি উদ্ধার করেন জাকির। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের পাশের ময়ূর ভিলার মালিক রফিক মিয়ার জমি দখল করেছেন রাজীব। মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের পাশে সাত মসজিদ হাউজিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী নজরুল ইসলামের তিন কাঠার প্লট দখলের অভিযোগ রয়েছে রাজীবের লোকজনের নামে। এ ছাড়া রাজীবের সহযোগিতায় তার চাচা ইয়াসিন চাঁদ উদ্যানের ৩ নম্বর রোডে তিনটি প্লট দখল করে রেখেছেন।
তারা জানান, মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান, চন্দ্রিমা হাউজিং, সাত মসজিদ হাউজিং, ঢাকা উদ্যানসহ বিভিন্ন প্রকল্পে রাজীব ও তার লোকজনের বিরুদ্ধে দখলবাজির অভিযাগ রয়েছে। রামচন্দ্রপুর মৌজার ৫৮১ ও ৫৮২নং দাগে দুই বিঘা জমি দখল করে মার্কেট তৈরির অভিযোগও করেন স্থানীয়রা। এ ছাড়া কাঁটাসুর, জাফরাবাদ ও রামচন্দ্রপুর মৌজায় সুজনসখীর খাল ও হাইক্কার খাল এবং জলাধার দখল করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে রাজীব তার নিজস্ব লোক দিয়ে ট্রাকস্ট্যান্ড, লেগুনা ও অটোরিকশা থেকেও চাঁদা নেন। এসব কাজের জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে তার আলাদা লোক নিয়োগ করা রয়েছে। ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে ব্যাটারিচালিত ৮০০ রিকশা থেকে মাসে এক হাজার টাকা করে চাঁদা নেয় তার লোকজন।
গত মাসের শুরুতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, রাজধানী ঢাকায় অবৈধভাবে ক্যাসিনো চালিয়ে যাচ্ছে যুবলীগ নেতারা। এরপর গত ১৪ সেপ্টেম্বর দলের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় যুবলীগ নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকায় ক্যাডার-চাঁদাবাজ বাহিনী গড়ে তুলে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে সে। আমার সংগঠনে চাঁদাবাজ দরকার নেই। এরপর জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে দেশ ছাড়ার এক দিন আগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয় ক্যাসিনো দমন অভিযান। যুক্তরাষ্ট্র সফরেও যেখানেই অনিয়ম-দুর্নীতি সেখানেই অভিযান চালানোর কথা বলেন তিনি। দেশে ফেরার পরও একই মনোভাব পুনর্ব্যক্ত করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, দলমত-আত্মীয়-পরিবার বলে কিছু নেই, কেউ ছাড় পাবে না।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় অর্ধশত অভিযান চালিয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। এ সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৯ জন প্রভাবশালী; মামলা হয়েছে ২৩টি; বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়েছে অন্তত ৩০০ জনের। অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, যুবলীগ নামধারী ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া (জি কে) শামীম, কৃষক লীগ নেতা শফিকুল আলম ফিরোজ, মোহামেডান ক্লাবের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, অনলাইন ক্যাসিনোর হোতা সেলিম প্রধান, যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও সহসভাপতি এনামুল হক আরমান এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান ওরফে পাগলা মিজান ওরফে ফ্রিডম মিজান। এ ছাড়া গেণ্ডারিয়ায় আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক ভূঁইয়া এনু ও তার ভাই রূপন ভূঁইয়ার বাসায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা, অস্ত্র, স্বর্ণালঙ্কার ও মাদকদ্রব্য উদ্ধার করে র্যাব। সর্বশেষ গতকাল আটক করা হয় তারেকুজ্জামান রাজীবকে।
