নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সমাবেশ ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০১৯, ১২:০৯ এএম

ভোলায় প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে ‘সর্বদলীয় মুসলিম ঐক্য পরিষদ’। বোরহানউদ্দিনে এক তরুণের ‘হ্যাকড হওয়া’ ফেইসবুক আইডি থেকে মহানবীকে (সা.) নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্যের জেরে পুলিশের সঙ্গে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে একদল লোকের সংঘর্ষে চারজন নিহত হওয়ার পর গতকাল সোমবার ভোলা জেলা স্কুল মাঠে সর্বদলীয় মুসলিম ঐক্য পরিষদের ব্যানারে প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পুলিশের বাধায় পূর্বঘোষিত স্থানে সমাবেশ করতে না পেরে বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ভোলা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন এবং প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করে তারা। সমাবেশ থেকে কট‚ক্তি করায় অভিযুক্ত বিপ্লব চন্দ্র শুভর মৃত্যুদণ্ডসহ ছয় দফা দাবি জানিয়ে তা বাস্তবায়নে ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম বেঁধে দেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে। এ সময় পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনেও বিক্ষোভ করে তারা। এছাড়া ভোলার ঘটনায় গতকাল রাজধানী ঢাকা, শরীয়তপুর, নেত্রকোনা, মাগুরা, ফেনী

 ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিভিন্ন ইসলামি সংগঠন এবং ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে।

এদিকে বোরহানউদ্দিনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয় পাঁচ হাজার জনকে আসামি করে একটি মামলা করেছে পুলিশ। গত রবিবার রাতে বোরহানউদ্দিন থানায় এসআই আবিদ হোসেন বাদী হয়ে এ মামলা করেন। এছাড়া ফেইসবুকে মহানবীকে (সা.) নিয়ে কট‚ক্তির ঘটনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা আলাদা একটি মামলায় বিপ্লবসহ তিনজনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।

ভোলা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সর্বদলীয় মুসলিম ঐক্য পরিষদের যুগ্ম সদস্য সচিব মাওলানা মিজানুর রহমান। এতে ভোলার পুলিশ সুপার এবং বোরহানউদ্দিন থানার ওসিকে প্রত্যাহার, নিজের ফেইসবুক আইডি থেকে মহানবীকে (সা.) নিয়ে কট‚ক্তি করেছেন বলে অভিযোগ ওঠা বিপ্লব চন্দ্র শুভর মৃত্যুদণ্ড, সংঘর্ষে নিহত চারজনের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া, আহত লোকজনের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা এবং গ্রেপ্তারদের মুক্তিসহ ছয় দফা দাবি জানানো হয়। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এসব দাবি পূরণ না হলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

সর্বদলীয় মুসলিম ঐক্য পরিষদের আহŸায়ক মাওলানা বশিরউদ্দিন, যুগ্ম আহŸায়ক মাওলানা তৈয়বুর রহমান, মাওলানা আতাউর রহমান, মাওলানা মহিউদ্দিন, মাওলানা মাহবুবুর রহমান, সদস্য সচিব মাওলানা তাজউদ্দিন এবং সদস্য মাওলানা ইয়াকুব আলী জিহাদী, মাওলানা তরিকুল ইসলাম, মাওলানা মোসলেহউদ্দিন, মাওলানা ইউসুফ, মাওলানা আবদুর রহমান ও মাওলানা মোস্তফা কামালসহ কমিটির অন্য নেতারা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

আন্দোলনের ব্যাপারে জানতে চাইলে ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহŸায়ক আতাউর রহমান গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রশাসন এখন পর্যন্ত আমাদের সব দাবি মেনে নেয়নি। তাই আমরা দাবি পূরণের জন্য ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছি। এছাড়া আগামীকাল (আজ মঙ্গলবার) আমরা ভোলার সব থানায় বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচি পালন করব।’

 

ভোলা জেলায় সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ : আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে ভোলা জেলায় সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। গতকাল সকাল থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা জারি থাকবে বলে জানিয়েছেন ভোলার জেলা প্রশাসক মাসুদ আলম ছিদ্দিক।

তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জনগণের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। উদ্ভ‚ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে রয়েছে। পুরো শহরে চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।’

 

৫ হাজার জনকে আসামি করে মামলা : বোরহানউদ্দিনে গত রবিবারের সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা হয়েছে। এ মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় পাঁচ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। রবিবার রাতে বোরহানউদ্দিন থানায় এসআই আবিদ হোসেন বাদী হয়ে মামলাটি করেন। এই মামলার পর থেকে এলাকায় গ্রেপ্তার আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

বোরহানউদ্দিন থানার ওসি এনামুল হক গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় এই মামলা করা হয়েছে। তবে পরিস্থিতি এখন শান্ত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে বোরহানউদ্দিনে চার প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন রয়েছে। বিজিবি, পুলিশ ও র‌্যাবের টহল জোরদার করার পর থেকেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।’

ভোলার সহকারী পুলিশ সুপার শেখ সাব্বির হোসেন গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংঘর্ষের ঘটনায় ৩০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০ জন চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত ১৫ জনকে আটক করেছে।’

 

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় বিপ্লবসহ ৩ জন কারাগারে : ফেইসবুকে কট‚ক্তির ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বোরহানউদ্দিন থানায় আলাদা একটি মামলা করেছে।

ভোলার পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফেইসবুকে কট‚ক্তির ঘটনায় বিপ্লব চন্দ্র শুভ, মো. শাকিল ও লিমনসহ তিনজনের বিরুদ্ধে এই মামলা করা হয়। পরে আজ (গতকাল সোমবার) তাদের আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। বিপ্লব নামে যে ব্যক্তির ফেইসবুক আইডি থেকে ধর্মীয় উসকানিমূলক পোস্ট ছড়ানো হয়েছে তাকেসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পাশাপাশি তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও ফেইসবুক আইডির ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য আদালতের কাছে অনুমতি চাওয়া হয়েছে।’

ভোলার জজ আদালতের পুলিশ পরিদর্শক রথীন্দ্রনাথ বিশ্বাস গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় তিনজনের রিমান্ড ও তাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষার অনুমতির আবেদন আদালতে পেশ করা হয়েছে। এখনো রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য হয়নি। রিমান্ড শুনানি ও মঞ্জুর না হওয়া পর্যন্ত আসামিরা জেল হাজতে থাকবেন।’

 

জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি : বোরহানউদ্দিনে সংঘর্ষের ঘটনায় গত রবিবার রাতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন জেলা প্রশাসক মাসুদ আলম ছিদ্দিক। ভোলার স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মাহমুদুর রহমানকে এ কমিটির প্রধান করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (আইটি অ্যান্ড এডুকেশন) আতাহার মিয়া এবং ভোলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মহসিন আল ফারুক।

এদিকে সর্বদলীয় মুসলিম ঐক্য পরিষদ ঘোষিত বিক্ষোভ সমাবেশ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে গতকাল সকাল থেকে ভোলা জেলা শহরের সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ ছিল। পরে বিকেল ৪টার পর বাস চলাচল স্বাভাবিক হয় বলে জানিয়েছেন ভোলা জেলা বাস মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শফিকুল ইসলাম।

বোরহানউদ্দিনে সংঘর্ষে আহত ৪৭ জন ভোলা সদর হাসপাতাল এবং ৩৫ জন বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের অধিকাংশই গুলিবিদ্ধ বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গত রবিবার বোরহানউদ্দিনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক যুবকের বিচারের দাবিতে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে বিক্ষোভ থেকে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশ বলছে, বিপ্লব চন্দ্র বৈদ্য নামে ওই যুবকের হ্যাক হওয়া আইডি থেকে ধর্মীয় অনুভ‚তিতে আঘাত হানার বক্তব্য ছড়ানোর ঘটনা থেকে এ পরিস্থিতির সূত্রপাত। একপর্যায়ে পুলিশের গুলিতে চারজন নিহত হন। নিহত চারজনকে নিজেদের কর্মী-সমর্থক বলে দাবি করেছে তৌহিদী জনতা। সংঘর্ষে পুলিশের ১০ সদস্যসহ দেড় শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত