ভারতের অর্থনীতি নিয়ে নোবেলজয়ী অভিজিৎ

দুর্দশার মূলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কেন্দ্রিক ক্ষমতাচর্চা

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০১৯, ০৪:১৬ এএম

নিজের সম্পর্কে বিজেপির সমালোচনাকে ‘হতাশার’ বলে উল্লেখ করেছেন নোবেলজয়ী ভারতীয় বাঙালি অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। গত রবিবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বিজেপি নেতা পীযূষ গোয়েল ও রাহুল সিনহার সমালোচনার জবাবে এমন মন্তব্য করেন। সে সময় ভারতীয় অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়েও কথা বলেন। এই সংকটের পেছনে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কেন্দ্রিক ক্ষমতার অতি চর্চাকে দায়ী করেন অভিজিৎ।

গত শুক্রবার ভারতে এসেছেন ফরাসি স্ত্রী এস্থার ডাফলো ও মার্কিন অর্থনীতিবিদ মাইকেল কেমারের সঙ্গে এ বছর যৌথভাবে নোবেলজয়ী অভিজিৎ। আজ মঙ্গলবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার বৈঠক করার কথা রয়েছে।

অভিজিৎ দেশে আসার আগেই শুক্রবার বিজেপি নেতা ও ভারতের কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল বলেন, ‘নোবেল পাওয়ার জন্য আমরা অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়কে অভিনন্দন জানাই। আপনারা সবাই জানেন, উনি বামপন্থি মানসিকতার। কংগ্রেস-ঘোষিত ন্যায় প্রকল্পকে উনি সমর্থন দিয়েছিলেন। ন্যায় প্রকল্পের গুণগান গেয়েছেন। ভারতের মানুষ উনার অর্থনৈতিক তত্ত¡কে খারিজ করে দিয়েছে।’

আর বিজেপির জাতীয় সম্পাদক রাহুল সিনহা বলেছেন, ‘বামপন্থি অর্থনীতি এ দেশে চলে না। বিদেশের কোথাও অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের তত্ত¡ কাজে লাগতে পারে। ভারতে দারিদ্র্য দূরীকরণে তার তত্ত¡ কাজে আসবে না। মহাত্মা গান্ধীর নীতিতেই ভারতের আর্থিক উন্নতি সম্ভব।’

রাহুল সিনহা আরও বলেন, ‘বিদেশিনীকে বিয়ে করলে নোবেল পাওয়া যায়, যেমনটা অধ্যাপক অমর্ত্য সেনও পেয়েছিলেন। অভিজিৎ দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন ফ্রান্সের এস্থার ডাফলোকে। অমর্ত্য সেনও দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন বিদেশি।’

গতকাল দ্য ওয়ারকে দেওয়া টানা ৪৭ মিনিটের সাক্ষাৎকারে ক্ষমতাসীন বিজেপির ওই দুই নেতাসহ অন্যদের মন্তব্যকে হতাশাজনক বলার পাশাপাশি ভারতীয় অর্থনীতির বর্তমান সংকট নিয়েও কথা বলেন অভিজিৎ। তিনি বলেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে রয়েছে সব ধরনের ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কেন্দ্রিক হওয়া। এটা বর্তমান সংকটের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রেখেছে। এ ছাড়া পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) আরোপে বিজেপি সরকারের তাড়াহুড়োও একটা বড় কারণ। 

তবে দেশটিতে জিএসটি আরোপ অপরিহার্য ছিল উল্লেখ করে অভিজিৎ বলেন, মোদি সরকারের  চেয়ে অন্য কোনো সরকার বিষয়টিকে ভালোভাবে বাস্তবায়ন করতে পারত না। 

দেশটির করপোরেট ও আয়কর কর্তনের প্রসঙ্গেও কথা বলেন এই নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ। তার মতে করপোরেট কর কর্তনের সিদ্ধান্ত বিনিয়োগবান্ধব হয়নি। আর আয়কর কাটার সিদ্ধান্তও যথাযথ হয়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। 

এ ছাড়া দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে হলে সরবরাহকারী ও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর কাছে থাকা বকেয়া সরকারকে অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন অভিজিৎ।

কৃষি ব্যয় ও শহরে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও কৃষকের ফসলের যৌক্তিক দাম দিতে না পারায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলেও দাবি করেন অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। তার মতে সারা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শ্লথগতির অন্যতম একটি কারণ এটিই। 

এ অবস্থায় ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য ভারতের শ্রম বণ্টন সংস্কার পরিবর্তনের আহŸান জানান তিনি। শিল্প কারখানার জন্য জমির অধিগ্রহণ আরও সহজ করার কথা বলেন অভিজিৎ। 

তিনি বলেন, এ ধরনের সংস্কার যেকোনো সংকটাপন্ন অর্থনীতির ক্ষেত্রেই লাগসই। অভিজিৎ ভারত সরকারকে এই সংকটের সম্ভাবনাকে ‘নষ্ট’ না করার আহŸান জানান। 

তিনি বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ ক্ষমতায়ন নিশ্চয়তা আইনেরও যেটুকু প্রয়োগ থাকা দরকার ছিল সরকার সেটা করেনি। এজন্যই গ্রামীণ অর্থনীতির আবশ্যিক চাওয়াগুলোর কোনো উন্নয়ন হয়নি।

অভিজিৎ বিনায়ক দ্য ওয়ারকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে দেশটিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার নিয়েও কথা বলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত