গৃহকর্মীরা নানা ধরনের শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতন ও শোষণের শিকার হয়। ক্ষেত্রবিশেষে পাচারের ঘটনাও ঘটে। নির্যাতনের পর্যায়গুলো হচ্ছে মানসিক নির্যাতন পরে শারীরিক নির্যাতন। বিভিন্ন প্রকারের শোষণ। পর্যাপ্ত খাবার না দেওয়া, রাতেও ঘুমের সুযোগ কম দেওয়া হয়। শিশু গৃহকর্মীর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের ঘটনা খুন পর্যন্ত গড়াচ্ছে। নির্যাতনের শিকার অনেকে আত্মহত্যাও করছে। অল্প বয়সী মেয়ে শিশুরা মূলত নির্যাতনের শিকার হলেও, ছেলে শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের শহরগুলোতে অনেক সময় গৃহকর্মীদের ঘরের মধ্যে রেখে বাইরে থেকে বাড়িতে তালাও দিয়ে রাখা হয়। অন্যদিকে, বিদেশে বাংলাদেশি গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনাও আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। কোনো কোনো নির্যাতনের ঘটনা পৈশাচিক। অবর্ণনীয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে এ ঘটনা বেশি। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন তো আছেই; যৌন নির্যাতন বা হয়রানির পরিমাণ বেড়েই চলেছে।
‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন’-আইটিইউসি ২০১২ সালে বাংলাদেশের গৃহকর্মীদের নিয়ে একটি জরিপের বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যাচ্ছে, শুধুমাত্র ঢাকা এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে গৃহকর্মীর সংখ্যা বিশ লাখের মতো। এদের মধ্যে ৮৩ শতাংশ নারী, যাদের অনেকে বয়সে শিশু কিংবা কিশোরী/তরুণী। আইটিইউসি’র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গৃহকর্মীদের মধ্যে ৩৩ শতাংশ রাতে রান্নাঘরে ঘুমান। এছাড়া বসার এবং শোয়ার ঘরের মেঝেতে ঘুমান গড়ে ২০ শতাংশ গৃহকর্মী। কারও কারও আবার ঘুমাতে হয় স্টোররুমে। অন্যায়, নির্যাতন অধিকাংশ গৃহকর্মী বা কাজের মেয়ে পড়ালেখার সুযোগ পান না। বিনোদনেরও অভাব রয়েছে। কমপক্ষে ৫৩ শতাংশ গৃহকর্মীর সঙ্গে বাজে ভাষায় কথা বলা হয়। কাজ হারানোর আতঙ্কও কাজ করে তাদের মধ্যে। যৌন নির্যাতনের শিকার গৃহকর্মীর সংখ্যা ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)’র হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখন ২৫ লাখ গৃহকর্মী বা গৃহশ্রমিক আছে। গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে এমন শিশুর সংখ্যা ১ লাখ ২৫ হাজার, যাদের বয়স ৫ থেকে ১৭ বছর। এর মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগই মেয়েশিশু।
২০১৩ সালে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, আইএলওর এক প্রতিবেদন বলছে, সারা বিশ্বে গৃহকর্মীর সংখ্যা প্রায় ৫৩ মিলিয়ন। এর মধ্যে ৮৩ শতাংশই নারী। তবে প্রকৃত সংখ্যাটি যে আরও কয়েক মিলিয়ন বেশি হতে পারে, সে কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে ১৫ বছরের কমবয়সী শিশু গৃহকর্মীদের সংখ্যা আইএলওর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি ২০০৮ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ৭৪ লক্ষ। আইনের বাইরে আইএলওর প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বের গৃহকর্মীদের প্রায় ৩০ শতাংশই শ্রম আইনের সুবিধাবঞ্চিত। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক (৪৫ শতাংশ) গৃহকর্মী সাপ্তাহিক ছুটি পান না। তাছাড়া তাদের এমন কোনো বার্ষিক ছুটি নেই, যার জন্য তাদের অর্থ প্রাপ্য (পেইড লিভ)। প্রসূতি সুরক্ষা প্রতি তিনজনের একজন গৃহকর্মী এই সুবিধা পায় না বলে জানিয়েছে আইএলও। এ সবগুলো বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রায় একই চিত্র। বাংলাদেশি প্রবাসী গৃহকর্মীর ক্ষেত্রেও একই চিত্র। ক্ষেত্রমতে অনেক বেশি।
বাংলাদেশের গৃহশ্রমিক নির্যাতনের বেশিরভাগ ঘটনারই বিচার হয় না। মামলা হলেও পরে চাপের মুখে সমঝোতা বা সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে মামলাগুলো আর কার্যকর থাকে না। ‘বাংলাদেশ লেবার আইন-২০০৬’-এ গৃহকর্মীকে শ্রমিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। ফলে অপরাধীরা শাস্তি পাচ্ছেন খুব কম। প্রতিকারের ব্যবস্থার ক্ষেত্রও কম। এ আইনটি ২০১৮ সালে সংশোধনী আনা হলেও গৃহকর্মকে শ্রমের মর্যাদা দেওয়া হয়নি। এ আইনটি যথেষ্ট শক্তশালী। আইনে গৃহকর্মীর শ্রমকে স্বীকৃতি দিলে সহজেই প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা সহজ হতো। গৃহকর্মীদের কাজ এখনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আইনি স্বীকৃতি পায়নি বাংলাদেশে। তাই আজও তারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, মজুরি পাচ্ছে কম। এদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো শ্রমঘণ্টা নেই, নেই ইচ্ছামতো কোথাও যাওয়ার অধিকার। গৃহকর্মী মানেই যেন কম টাকা দিয়ে বেশি ঘণ্টা কাজ করানো। এভাবে গৃহকর্মীদের প্রতারিত করে তাদের নিয়োগদাতারা অবৈধভাবে বছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে বলে জানায় ‘ইন্টারন্যাশনাল ডমেস্টিক ওয়ার্কার্স ফেডারেশন’।
আইএলওর হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মীর সংখ্যা প্রায় ২১ লক্ষ। বাংলাদেশের নারী শ্রমিকদের মধ্যে বড় একটা অংশ এখন গৃহশ্রমিক হিসেবে বিদেশে যায়। আমরা রেমিট্যান্সও পাচ্ছি বেশ। কিন্তু তাদের ওপর নির্যাতনের হারও অনেক বেশি। প্রকাশ্যে যে অভিযোগ আসছে তার সংখ্যাও কম নয়। নির্যাতনের কথা অপ্রকাশ্যেই থেকে যাচ্ছে অনেক। হিসাবে আসলে নির্যাতনের ভয়াবহতাই উঠে আসবে। এ অবস্থাকে দাসত্বের নবরূপ বলা যেতে পারে। এটা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এর ফলে নির্যাতিত গৃহমালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া খুবই কঠিন ব্যাপার। কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে এমন দেশে আমরা কেন গৃহশ্রমিক পাঠাব?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১ কোটি ৪৬ লাখ ৭৮৯ জন বাংলাদেশি শ্রম অভিবাসীর মধ্যে ৭ লাখ ২৭৮ জন নারী রয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে কাজের জন্য বিদেশে যাওয়া নারীদের ৮০ শতাংশের গন্তব্য সৌদি আরব। মোট কর্মীর ৩০ শতাংশই সে দেশে রয়েছেন। এসব নারী অভিবাসীরা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গৃহকর্মী, হাসপাতাল, পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন কলকারখানায় কর্মরত। পুরুষ কর্মীর তুলনায় উপার্জিত অর্থ নারীরা বেশি দেশে পাঠাচ্ছেন। যেখানে বেশিরভাগ পুরুষ শ্রমিক গড়ে ৫০ ভাগ টাকা পাঠান, সেখানে গড়ে নারী শ্রমিকরা ৯০ ভাগ টাকা দেশে পাঠান বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। কিন্তু কাজের নিরাপদ পরিবেশ না থাকায় সৌদি আরব থেকে প্রায় প্রতি মাসেই নারী গৃহকর্মীরা ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর অন্তত ১ হাজার ৩৫৩ জন নারী সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছেন। তাদের প্রায় সবাই নির্যাতনের কারণে ফিরে আসার কথা বলেছেন। চলতি বছরের বছর প্রথম তিন মাসে দেশটি থেকে ফিরেছেন কমপক্ষে ৬৩৬ জন নারী গৃহকর্মী।
বিদেশে অবস্থানরত নারী শ্রমিকদের বড় অংশকেই নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। শারীরিক নির্যাতন, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না দেওয়া, কর্মঘণ্টা বেশি, ফোন ব্যবহারের সুযোগ না থাকার চিত্র প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যমে প্রচার হচ্ছে। বাংলাদেশি নারীকর্মীদের পূর্ণ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কূটনীতি শক্তিশালী নয় বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন। জিরো মাইগ্রেশনে নারী শ্রমিকরা এখন বিদেশ যেতে পারছেন। কিন্তু জিরো মাইগ্রেশনে নারী শ্রমিক পাঠানো সর্বমহলে প্রশংসিত হলেও প্রত্যেক নারীকর্মী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোতে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা দালালি দিতে বাধ্য হচ্ছেন। দালালের মাধ্যমে নারীকর্মী সংগ্রহ করার কারণে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে কর্মী পাঠানোর সার্ভিস চার্জের প্রাপ্ত অর্থ থেকে উল্লিখিত অর্থ দালালকে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। বিপরীতে বিদেশে অবস্থানরত নারী শ্রমিকদের বড় অংশই যৌন হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশে নারী নির্যাতনের হার অনেক বেশি।
বিদেশে কাজ করতে গিয়ে নির্যাতিত নারীদের অনেকেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দেশে ফিরছেন। জানা যায়, প্রবাসী নারীরা এসব বিষয়ে নানা অভিযোগ করলেও এগুলোর নি®পত্তির সংখ্যা হতাশাজনক। বিদেশের মাটিতে অসংখ্য নারীকর্মী কাজ করলেও তাদের সমস্যা এবং সহযোগিতার জন্য তেমন নেই কোনো শেল্টার হোম, দ্রুত সহযোগিতা পাওয়ার জন্য নেই হটলাইন। অনেক দেশেই নারীকর্মীরা নির্যাতনের শিকার হয়ে সহযোগিতা চাইলেও পাচ্ছেন না। কিছু ক্ষেত্রে নারীরা তাদের হেনস্তার কথা বলেন না। লেবার উইংগুলোতে নারী কর্মকর্তা কম থাকায় এমনটা হয়ে থাকতে পারে। ওমানের অনেক বাড়িতে বাংলাদেশি গৃহকর্মীরা বন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ এক প্রতিবেদনে জানায়। ভারত নেপাল শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো প্রবাসী গৃহ-শ্রমিকদের নিরাপত্তার ব্যাপারে অধিক কঠোর। তাদের চুক্তিপত্রে যথেষ্ট কঠোরতা দেখানো হয়।
অনেক নারী যৌন হেনস্তা বা নির্যাতনের শিকার হওয়া সত্ত্বেও প্রকাশ করতে বা প্রতিকার পেতে লজ্জাবোধ করেন। তাই বলা যায়, গণমাধ্যমে যা প্রকাশ হচ্ছে বাস্তবে গৃহশ্রমিক নিগ্রহ বা নারী নির্যাতনের হার অনেক বেশি! এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ভাষা সমস্যা। গৃহকর্মীরা যেখানে যাচ্ছেন সে দেশের ভাষা ও ইংরেজি না জানার কারণে মালিক-কর্মী ভুল বোঝাবুঝি বেশি হচ্ছে। জনশক্তি পাঠানোর সময় কর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে যথাযথ চুক্তি করতে হবে। ভাষা সমস্যা সমাধানের জন্য কর্মী পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট দেশের এবং ইংরেজি ভাষা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। কাজেরও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। অদক্ষ কর্মী পাঠানো থেকে বিরত থাকতে হবে। এ ছাড়া সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতে নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর হার বৃদ্ধি করা যেতে পারে। যেখানে নারী শ্রমিক নির্দ্বিধায় ও খোলাখুলি সমস্যার কথা বলতে পারেন। এতে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে সরকারের সুবিধা হবে। সমস্যার সংশ্লিষ্ট নারীকর্মীর পরিচয় গোপন রাখতে হবে। যাতে নির্যাতিত অন্য নারীকর্মীরা পরবর্তী সময়ে নিঃসংকোচে তাদের সমস্যার কথা শেয়ার করতে পারেন।
কোথায় কোথায় গৃহশ্রমিক নির্যাতন বেশি হচ্ছে সেসব চিহ্নিত করে নিয়োগকর্তা বা এজেন্সির ‘কালো তালিকা’ করতে পারে সরকার। বিদেশে নির্যাতিতদের ক্ষেত্রে আইনি সহায়তা দিয়ে তাদের দেশে ফেরত আনতে হবে। হাইকমিশন বা দূতাবাসের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। বাংলাদেশে গৃহকর্মীদের দুর্দশার কথা জানতে হবে। এসব ক্ষেত্রে মহিলা কর্মকর্তা/কর্মী নিয়োগ দিলে সুবিধা হবে। দেশে-বিদেশে গৃহকর্মী বা গৃহশ্রমিকদের ‘শ্রমিক হিসেবে’ স্বীকৃতি ও শ্রম আইনে তাদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। গৃহকর্মীদের সুরক্ষা নীতি তৈরি ও বাস্তবায়ন করতে হবে। জনসচেতনতা সৃষ্টি করে গৃহকর্মীদের অধিকারের বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে বিভিন্ন উদ্যোগও নিতে হবে।
লেখক
উপপরিচালক, বিআরডিবি, কুষ্টিয়া
