আমদানির আড়ালে অর্থপাচার

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ০১:৩৮ এএম

গাজীপুরের এনজেড এক্সেসরিজ লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের চীন থেকে পলিয়েস্টার সুতার একটি চালান আসে চট্টগ্রাম বন্দরে। আমদানিকারকের নিয়োজিত সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান যথারীতি যাবতীয় দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে চালানটি ডেলিভারি নিতে যায় বন্দর ইয়ার্ডে। ঠিক এ সময় একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে তথ্য পেয়ে কাস্টমস কর্মকর্তারা কন্টেইনারটি খুলে দেখতে পান সুতার বদলে সেখানে রয়েছে বালি আর মাটি।

গত জুন মাসে বন্দরে ধরা পড়ে প্রাণ ডেইরি লিমিটেড নামে প্লাস্টিক দানা ঘোষণায় আসা ৩০ কন্টেইনার সৌদি আরবের উন্নতমানের সিমেন্ট। ৫ লাখ ৬৬ হাজার ডলারের ৫১০ টন প্লাস্টিক দানার জন্য ঋণপত্র খুলেছিল প্রতিষ্ঠানটি। ঋণপত্রের বিপরীতে দুবাই থেকে গত ২৬ মে চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছে চালানটি। ৬ জুন পণ্যটি খালাসের উদ্যোগ নেয় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের নিয়োজিত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। কাস্টমস কর্মকর্তারা কন্টেইনারগুলো খোলার পর সেগুলোতে পাওয়া যায় সৌদি আরবের জেবল আলি গ্রুপের সিমেন্ট।

ক্যাসিং ফর ইভিএম ঘোষণায় গত আগস্ট মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে পাঁচ কন্টেইনার প্লাস্টিক পণ্য নিয়ে আসে ঢাকার ম্যাপল হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ক্যাসিং হিসেবে শুল্কও পরিশোধ করে আমদানিকারকের নিয়োজিত সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান। ডেলিভারি নেওয়ার পূর্বে একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে কন্টেইনার খুলে ঘোষিত পণ্যের বদলে পাওয়া যায় তৈরি প্লাস্টিক পণ্য।

এভাবে প্রায় প্রতি মাসেই চট্টগ্রাম বন্দরে ধরা পড়ছে মিথ্যা ঘোষণায় আনা একাধিক পণ্যের চালান। কখনো এক পণ্যের বদলে অন্য পণ্য, কখনো বেশি দামি পণ্যের ঘোষণায় কম দামি পণ্য, আবার কখনো আমদানি পণ্য ছাড়াই আসছে খালি কন্টেইনার। আমদানি বাণিজ্যের আড়ালে অর্থপাচার আর শুল্ক ফাঁকির ঘটনা অহরহ ঘটছে। এর মধ্যে দুয়েকটি ঘটনা ধরা পড়লেও কাস্টমসের চোখ ফাঁকি দিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে অনেক চালান। আবার কখনো কখনো অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে আমদানি হওয়া পণ্যও নির্বিঘেœ যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বন্দর থেকে ডেলিভারি হয়ে যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আমদানি-রপ্তানি পণ্যবাহী গাড়ি যাতায়াতের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরে ১২টি গেট থাকলেও সেখানে কাস্টমসের স্ক্যানার রয়েছে মাত্র পাঁচটি। সম্প্রতি আরও দুটি স্ক্যানার আনার পর এর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতটি। পর্যাপ্ত স্ক্যানার না থাকার কারণে আমদানি করা অনেক পণ্য স্ক্যানিং ছাড়াই ডেলিভারি হয়ে যায়। সেই সুযোগে নির্বিঘেœ বের হয়ে যায় মিথ্যা ঘোষণায় আসা অনেক পণ্যের চালান।

মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির আড়ালে মানি লন্ডারিং (অর্থপাচার) ঠেকাতে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজে এন্টি মানি লন্ডারিং শাখা খোলা হলেও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে স্থবির হয়ে আছে এর কার্যক্রম। মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে অর্থপাচারের ঘটনা হরহামেশা ঘটলেও চট্টগ্রাম কাস্টমসের এন্টি মানি লন্ডারিং ইউনিটে এ পর্যন্ত মামলা হয়েছে মাত্র দুটি।

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের যুগ্ম কমিশনর নুর উদ্দিন মিলন দেশ রূপান্তরকে বলেন, পণ্য আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে মানি লন্ডারিং ঠেকাতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজ। এন্টি মানি লন্ডারিং ইউনিট তার একটি অংশ। তিনি বলেন, অস্তিত্বহীন দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে পণ্য আমদানি করে অর্থপাচারের অভিযোগে এ ইউনিট থেকে গত ৩১ আগস্ট মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে দুটি মামলা করা হয়েছে।  ইতিমধ্যে আটক হওয়া আরও কয়েকটি আমদানি পণ্যের চালানে মানি লন্ডারিংয়ের উপাদান পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, বন্দরের সব গেটে স্ক্যানার বসানো সম্ভব হলে এবং প্রত্যেকটি চালান যথাযথভাবে স্ক্যানিং করা গেলে এটি অনেকটা কমে আসত

বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, পণ্য আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে অর্থপাচারের ঘটনা যেমন ঘটে তেমনি রপ্তানিকারকের প্রতারণা কিংবা ভুলের কারণেও অনেক সময় এক পণ্যের পরিবর্তে অন্য পণ্য চলে আসে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত