সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন আইন করার এক বছর পর অবশেষে তা কার্যকর হতে যাচ্ছে। আগামী ১ নভেম্বর থেকে সারা দেশে ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ কার্যকর হবে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। যদিও এ আইনের আওতায় এখনো বিধিমালা জারি করা হয়নি।
২০১৭ সালে তৈরি করা নতুন আইনের খসড়া গত বছর ৬ আগস্ট অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। খসড়ায় বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর দায়ে মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাজা আরও বেশি রাখার কথা বলা ছিল। তবে সড়ক পরিবহন শ্রমিক নেতাদের আপত্তির কারণে খসড়াটি চ‚ড়ান্ত করা সম্ভব হচ্ছিল না। এ অবস্থায় গত বছর রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর শুরু হওয়া
ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ওই বছরের আগস্ট মাসে খসড়া আইনের অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। সংসদে বিল পাসের পর গত বছর অক্টোবরে রাষ্ট্রপতি অনুমোদন দেওয়ার পর আইনটি জারি হয়।
নতুন আইনের আওতায় একটি বিধিমালা প্রণয়নের কাজ করছিল সরকার। সেটি চূড়ান্ত করার আগেই গত মঙ্গলবার জারি করা প্রজ্ঞাপনে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপনে ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ আগামী ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার তারিখ নির্ধারণ করেছে।
গতকাল এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে সড়ক সচিব নজরুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। আর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান (চলতি দায়িত্ব) ড. মো. কামরুল আহসানের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
কার্যকর হতে যাওয়া নতুন আইনে চালকের বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত কারণে সংঘটিত দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতর আহত বা নিহত হলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। তবে এজন্য দায়ী চালকের সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা জরিমানার কথা বলা হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন পক্ষ থেকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের দাবি করা হলেও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের আপত্তির কারণে তা করা সম্ভব হয়নি। এ প্রসঙ্গে নতুন আইনে বলা হয়েছে, গাড়ি দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে কোনো ব্যক্তি আহত হলে বা তার প্রাণহানি ঘটলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। তবে ফৌজদারি আইনে যাই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তির বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত মোটরযান চালানোর কারণে সংঘটিত দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতর আহত বা নিহত হলে চালকের সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আগের আইনে দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান আছে।
এক শ্রেণির যানবাহন চালানোর লাইসেন্স নিয়ে অন্য শ্রেণির গাড়ি চালানো এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া গণপরিবহন চালালে তার ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। আগের আইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো শর্ত ছিল না। নতুন আইনে কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি পাস না হলে ড্রাইভিং লাইসেন্স নেওয়া যাবে না। ড্রাইভিং লাইসেন্স হস্তান্তরের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে নতুন আইনে বলা হয়েছে, কেউ এটি লঙ্ঘন করলে এক মাসের কারাদণ্ড বা ৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ভুয়া বা জাল লাইসেন্স তৈরি করলে ও তা ব্যবহার করলে কমপক্ষে ৬ মাস থেকে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত জেল বা সর্বনিম্ন ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
নতুন আইনে গাড়ির কন্ডাক্টরদের জন্যও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এজন্য কমপক্ষে পঞ্চম শ্রেণি পাস হতে হবে। লাইসেন্স ছাড়া গণপরিবহনে কন্ডাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করলে অনধিক এক মাসের জেল ও ৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে এতে। নতুন আইনে বলা আছে, মোটরযানের রেজিস্ট্রেশন ছাড়া সড়ক, মহাসড়ক ও পাবলিক প্লেসে তা চালানো যাবে না। এ বিধান ভঙ্গের দায়ে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাবাস বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডেই হতে পারে। আর মোটরযানে ভুয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করলে সর্বনিম্ন ৬ মাস থেকে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড বা কমপক্ষে ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে।
ফিটনেস সনদ ছাড়া বা মেয়াদোত্তীর্ণ ফিটনেস সনদ ব্যবহার করলে বা যানবাহনের ইকোনমিক লাইফ শেষ হওয়ার পরও তা চালালে ৬ মাসের কারাদণ্ড ও ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে সংশোধিত আইনে। আর ট্যাক্স টোকেন ছাড়া বা মেয়াদোত্তীর্ণ ট্যাক্স টোকেন ব্যবহার করলে ১০ হাজার টাকা জরিমানার মুখে পড়তে হবে। ব্যক্তিগত গাড়িকে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ ৩ মাসের কারাদণ্ড বা ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড হতে পারে।
নতুন আইনের ৩৪ ধারায় বলা হয়েছে, গণপরিবহনে ভাড়ার চার্ট প্রদর্শন করতে হবে এবং নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা যাবে না। এ বিধান লঙ্ঘিত হলে সর্বোচ্চ এক মাসের কারাবাস বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। অতিরিক্ত হিসাবে চালকের ক্ষেত্রে দোষসূচক ১ পয়েন্ট যুক্ত হবে।
সিএনজিচালিত অটোরিকশার মতো কন্ট্রাক্ট ক্যারিজের মিটার অবৈধভাবে পরিবর্তন বা নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করা যাবে না। এর ব্যত্যয় হলে ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হবে। কোনো যানবাহন মালিক চালকের কাছে সরকার নির্ধারিত দৈনিক জমার অতিরিক্ত জমা দাবি করলে তিনিও এ সাজার আওতায় আসবেন।
নতুন আইনের ৩৭ ধারায় বলা আছে, মহাসড়কের জায়গায় বা মহাসড়কের ঢাল হতে দুই পাশে ১০ মিটারের মধ্যে হাট-বাজার, দোকানসহ কোনো অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। এ বিধান লঙ্ঘন করলে দুই বছরের কারাদণ্ড এবং স্থায়ী স্থাপনার ক্ষেত্রে ৫ লাখ ও অস্থায়ী স্থাপনার ক্ষেত্রে ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান করা হয়েছে। সড়ক ও মহাসড়কে ট্রাফিক সাইন ও সংকেত না মানলে এক মাসের কারাদণ্ডাদেশ ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করার বিধান রয়েছে এতে।
