ঐক্যফ্রন্টের কর্মসূচি স্থগিত করা নিয়ে বিরক্ত বিএনপি

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ০৩:৩২ এএম

কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে বারবার তা পালন না করায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ওপর ক্ষুব্ধ বিএনপির একাধিক নেতা। গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা বলেছেন, আত্মপ্রকাশের পর থেকে একের পর এক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। কিন্তু পুলিশের বাধাসহ নানা প্রতিক‚লতার দোহাই দিয়ে ফ্রন্ট একাধিক কর্মসূচি স্থগিত করেছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গত বছর ১৩ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ ঘটে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের।

কর্মসূচি স্থগিতের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটা স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা খুবই কঠিন। এ কারণে কর্মসূচি ঘোষণা দিয়ে তা পালন করা দুরূহ বিষয়। তবে একদিন নিশ্চয়ই জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা রাজপথে নেমে আন্দোলন করে সরকারকে বিতাড়িত করবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক প্রভাবশালী সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিষ্ঠার পর ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঢাকায় সমাবেশ, নির্বাচন কমিশন অভিমুখে মিছিলসহ নানা কর্মসূচির কথা বললেও তার একটিও পালন করা হয়নি। নির্বাচনের আগে সারা দেশে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মামলা লড়াইয়ের জন্য আইনি সেল করা হয়। কিন্তু সেই আইনি সেল কোনো নেতাকর্মীর পক্ষে কোনো মামলায় লড়াই করেনি। এছাড়া রাজধানী ঢাকার সংসদীয় আসনগুলোতে নির্বাচনের আগে ফ্রন্টের প্রার্থীদের পক্ষে ফ্রন্টের আহবায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনসহ অন্যান্য নেতার গণসংযোগ করার কথা থাকলেও তাতেও অংশ নেননি ফ্রন্টের নেতারা।

এক বিএনপি নেতা ব্যঙ্গ করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে স্থগিত ঐক্যফ্রন্ট অভিহিত করেন। তিনি বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর চলতি বছর ২২ ফেব্রæয়ারি সুপ্রিম কোর্ট বার মিলনায়তনে নির্বাচনোত্তর গণশুনানি হয়। এতে সারা দেশে বিভিন্ন সংসদীয় আসনের জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা নির্বাচনে অনিয়মের বিষয় তুলে ধরেন। পরে গণশুনানির বক্তব্য বই আকারে প্রকাশের কথা ছিল। কিন্তু পরে আর এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জানায়। এছাড়া জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত এমপিরা শপথ নেবেন না বলেও ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে গত ৭ মার্চ ফ্রন্টের নেতা সুলতান মোহাম্মদ মনসুর শপথ নেন। এরপর শপথ নেন গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য এম মোকাব্বির খান। এ দুজনের শপথের পর বিএনপির এমপিরা শপথ নেওয়ার বিষয়ে মনস্থির করলে শেষ পর্যন্ত লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান শপথ নেওয়ার সিদ্ধান্ত দেন।

স্থগিত কর্মসূচির তালিকা তুলে ধরে বিএনপি নেতারা বলেন, গত বছর ৮ ফেব্রয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় পুরান ঢাকার বকশিবাজারে স্থাপিত বিশেষ আদালত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের সাজা দেয়। এরপর ২৭ ফেব্রæয়ারি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহŸায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তখন খালেদা জিয়ার পক্ষে আইনি লড়াইয়ের জন্য ড. কামালকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দেওয়া হয় বিএনপির পক্ষ থেকে। কিন্তু তিনি খালেদা জিয়ার পক্ষে আদালতে আইনি লড়াই করতে রাজি হননি।

তারা বলেন, ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতসহ সারা দেশে ভয়াবহ নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে ৩০ এপ্রিল মঙ্গলবার শাহবাগে গণজমায়েত এবং মানববন্ধন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছিল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। কিন্তু আগের দিন সোমবার অনিবার্য কারণে তা স্থগিত করা হয়।

বিএনপি নেতারা আরও বলেন, সর্বশেষে ৬ অক্টোবর বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার পর প্রতিবাদে ১৩ অক্টোবর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক শোকসভা করে। শোকসভা শেষে প্রেস ক্লাব থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার অভিমুখে শোক র‌্যালি শুরু করলে প্রেস ক্লাবের সামনেই পুলিশ তাদের আটকে দেয়। এর প্রতিবাদে ১৮ ও ২২ অক্টোবর কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে ১৮ অক্টোবরের কর্মসূচি স্থগিত করে গত ২২ অক্টোবর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণশোক সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করে। তখন বলা হয়, পুলিশ অনুমতি না দিলেও তারা যেকোনো মূল্যে কর্মসূচি পালন করবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনুমতি না পাওয়ায় কর্মসূচি স্থগিত করে ফ্রন্ট। এছাড়া জেলায় জেলায় কর্মসূচি পালনের কথা থাকলেও তার কোনো লক্ষণ নেই।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর এখন সবচেয়ে বড় দুর্যোগময় সময় পার করছে। এ অবস্থায় বিএনপিকে সহযোগিতার জন্য কেউ যখন কিছু করতে চায় তখন তো তাদের সহযোগিতা করতে হয়। সে হিসেবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কোনো উদ্যোগ নিলে তার সঙ্গে বিএনপি থাকে। শুধু জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নয়, সরকারবিরোধী অন্য যেসব রাজনৈতিক দল আছে তারা বিএনপির ইস্যুগুলোতে সমর্থন জানালে তাদের সঙ্গেও থাকবে দল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত