মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সম্মাননা না দেওয়ার কথা জানিয়ে স্থানীয় সাংসদকে চিঠি লেখা দিনাজপুরের সদর উপজেলার যোগীবাড়ি গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের মৃত্যু হয়েছে। গত সোমবার চিঠি লেখার দুদিন পর গত বুধবার তার মৃত্যু হয়। চিঠিতে তিনি তার সন্তানের চাকরি ও বাস্তুচ্যুতির কথাও জানিয়েছেন।
স্থানীয় সাংসদ ও জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমকে লেখা চিঠিতে ওই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘ইতিপূর্বে আমি ও আমার ছেলে দিনাজপুরে তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম। লোকজনের প্রচণ্ড ভিড় থাকায় তুমি বলেছিলে, বিষয়টি দেখব। সে সময় তোমার কাছে এডিসি (রেভিনিউ) উপস্থিত থাকায় তুমি তাকে বিষয়টি দেখার কথা বলেছিলে। বিষয়টি উনি যেভাবে দেখলেন তা হলো, তুমি ঢাকায় চলে যাওয়ার পর এসিল্যান্ড (ভ‚মি কমিশনার, সদর) নোটিস দিয়ে বাসা ছাড়তে বলেন। এডিসি রেভিনিউ আমার পুত্র মো. নুর ইসলামকে সরকারি খাসজমি, পরিত্যক্ত বাড়িতে বসবাস করত
বলে জানেন। পূর্বের এডিসি রেভিনিউ ছেলেটির বসতবাড়ি না থাকায় তাকে বসবাস করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। হঠাৎ চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে এসিল্যান্ড সদর স্যারের মিসেস আমার ছেলেকে বাথরুম পরিষ্কার করাসহ মাংস রান্না করতে বলেন। মাংস রান্না অপছন্দ হওয়ায় আমার ছেলেকে এসিল্যান্ডের মিসেস অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। পরে এসিল্যান্ড সদর স্যার বাড়িতে আসলে তাকে বিভিন্ন কানকথা বলায় তিনি আমার ছেলের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উনিও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে বাড়ি থেকে বের করে দেন। সেই সঙ্গে এসিল্যান্ডের ড্রাইভার হিসেবে গাড়ি না চালানোর জন্য গাড়ির চাবি ফেরত চান। একটু পরেই আবার তহশিলদারের মাধ্যমে সরকারি প্রয়োজনে বাড়িটি ছাড়ার জরুরি নোটিস দেন। আমার ছেলেটির অন্যত্র বাসা ভাড়া নিতে একটু বিলম্ব হলে এসিল্যান্ড ঘরের তালা ভেঙে মালামাল তছনছ করে অন্যদিকে সরিয়ে রাখেন। পরবর্তী সময়ে আমার ছেলেকে প্রচুর চাপ দিয়ে বাড়িটি ছাড়া করে অন্যত্র যেতে বাধ্য করেন এবং গাড়ির চাবি ফেরত নেন। সেই সময় ডিসি না থাকায় আমার ভাতিজা মো. জাকারিয়া (৬নং ইউপি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক) তোমার (সংসদ সদস্য) কাছে নিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধার সুপারিশেই আমার ছেলে এসিল্যান্ডের ড্রাইভার হিসেবে সেখানে যোগদান করেছিল। এডিসি রেভিনিউ স্যার ডিসি মহোদয়কে কী বোঝালেন তিনি আরও ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন। এসিল্যান্ড অফিসে তিন মাসের শিশুপুত্র ও স্ত্রীকে নিয়ে আমার ছেলে তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকলেও তিনি গেটটা খোলেননি। আমার ছেলে কান্নাকাটি করে হাত-পা ধরে চাকরি ফেরত চাইতÑ সেই সুযোগটিও তারা দেননি। এ বিষয়ে ডিসি স্যারের সঙ্গে দেখা করতে গেলে এসিকন বলেন, তোমার সঙ্গে স্যারের দেখা হবে না। তিনি সেখান থেকে তাড়িয়ে দেন। পরে জানা গেল তোমার সঙ্গে আমি ও আমার ছেলের দেখা করাটা বড় অন্যায় হয়ে গেছে। তোমার সঙ্গে দেখা করাতে তারা চরম বিমুখ হয়ে গেল। তুমি আমাদের সর্বোচ্চ অভিভাবক এবং তোমার সুপারিশেই যেহেতু আমার ছেলের চাকরি হয়েছিল তাই চাকরি চলে যাওয়ায় উপায়ান্ত না পেয়ে আমরা তোমার দ্বারস্থ হয়েছিলাম। কিন্তু বর্তমান প্রশাসন সেটি চরমভাবে নেতিবাচক হিসেবে নেয়। আমার ছেলে গত ০৪/০৯/২০১৭ইং তারিখে নো ওয়ার্ক নো পের আওতার ভিত্তিতে চাকরিতে যোগদান করে। যার বৈধ প্রত্যয়ন পূর্বে এসিল্যান্ড মো. মেজবাউল হোসেন এবং বর্তমান এসিল্যান্ড মো. আরিফুল ইসলামের প্রত্যয়নে চাকরি দেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় দেড় বছরে ওই এসিল্যান্ডের স্ত্রীর কাছে ১৫ জন কাজের লোক ছিল, কিন্তু কেউ টিকতে পারেনি। বর্তমানে ছেলেটির চাকরিচ্যুত ও বাস্তুচ্যুত হওয়ায় স্ত্রী-পরিজন নিয়ে দুর্বিষহ দিনাতিপাত করছে। যদি আমার মৃত্যু হয় আমাকে যেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা না হয়। কারণ এসিল্যান্ড, ইউএনও, এডিসি, ডিসি যারা আমার ছেলেকে চাকরিচ্যুত ও বাস্তুচ্যুত করে পেটে লাথি মেরেছে তাদের সালাম, স্যালুট আমার শেষ যাত্রার কফিনে চাই না।’
এ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান নুর ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বাবা মৃত্যুর আগে যা লিখে গেছেন সবই সত্য। বাবার মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের জন্য জেলা প্রশাসক অফিস থেকে এসিকন ও কয়েকজন পুলিশ সদস্য এসেছিলেন। কিন্তু আমার বাবার অসিয়তে আমরা তা করতে দিইনি।’
মুক্তিযোদ্ধার চিঠির অভিযোগের বিষয়ে সদর উপজেলা ভ‚মি কমিশনার (এসিল্যান্ড) আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘নুর ইসলাম দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে কাজ করত। সে নিয়মিত ডিউটি পালন করত না। আর সে মাদক সেবন করত বলে আমি তার গাড়িতে নিরাপদ বোধ করতাম না। এজন্যই তার চাকরি চলে গেছে।’
এ বিষয়ে দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মো. মাহমুদুল আলম বলেন, ‘নুর ইসলাম যে মুক্তিযোদ্ধার ছেলে আমি সেটা এই প্রথম জানলাম। তবে তিনি মাস্টারোলে চাকরি করতেন। পূজার ডিউটিতে তিনি আসেননি। তাকে ফোন করেও আনা যায়নি। তার বিপরীতে অন্য একজনকে চালক হিসেবে নেওয়া হয়েছে। এসিল্যান্ড আমাকে যেটা জানিয়েছেন, নুর ইসলাম মাদক সেবন করতেন। একজন সরকারি কর্মকর্তা মাদকসেবীর গাড়িতে কতটা নিরাপদ সেটা আপনারাই বলুন?’
