দেশের গ্রামাঞ্চলের ৫৭ শতাংশ স্কুলেই পরিচ্ছন্ন টয়লেট নেই। ৭৬ শতাংশ স্কুলের টয়লেটই অপরিষ্কার নোংরা। এর মধ্যে ৬৮ শতাংশ স্কুলের টয়লেটেই সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা থাকে না। অন্যদিকে শহর এলাকায় ৬৩ শতাংশ স্কুলে উন্নত এবং কার্যকরী টয়লেট আছে, যা ছাত্রীদের জন্য খোলা থাকে। সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রয়েছে ৪৭ শতাংশ স্কুলে।
অন্যদিকে দেশে বর্তমানে প্রাথমিক ও
মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২ কোটি। এর মধ্যে প্রতি ১৮৭ জন শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র একটি করে টয়লেট রয়েছে। অথচ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ৫০ জনের জন্য একটি টয়লেট থাকার কথা। আবার যেসব টয়লেট রয়েছে, তার ৪৫ শতাংশই বিভিন্ন কারণে স্কুল চলাকালীন সময় বন্ধ থাকে। দুই-তৃতীয়াংশ টয়লেটের ভেতর বা কাছাকাছি পানি বা সাবানের ব্যবস্থা থাকে না। এছাড়া টয়লেটের জানালা ছোট, আলো-বাতাস অপ্রতুল। বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও বাল্ব থাকে না। ফলে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পরিবেশ নষ্ট করে।
২০১৪ সালের জুনে প্রকাশিত সরকারের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল হাইজিন বেসলাইন সার্ভে’তে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য টয়লেটের এমন চিত্রে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, অপরিষ্কার টয়লেট থাকার কারণে ডায়রিয়া, আমাশয়, কৃমি হতে পারে। মূত্রনালিতে সংক্রমণ হতে পারে। অপরিষ্কার থাকার কারণে বেশিরভাগ মেয়ে টয়লেটে যায় না। প্রস্রাব ধরে রাখে। এসব মেয়ের মূত্রনালিতে সংক্রমণসহ কিডনি বিকল হতে পারে।
হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী আরও বলেন, প্রতিটি স্কুলেই স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের অভাব রয়েছে। আবার যে টয়লেটগুলো আছে, সেখানে টয়লেট ব্যবহারের পর হাত ধোয়ার উপকরণ ও টয়লেট পরিষ্কার রাখার ব্যবস্থা নেই। এসব কারণে দুভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে ছেলেমেয়েরা। একদিকে টয়লেটের সংখ্যা কম হওয়ায় প্রয়োজনে টয়লেট ব্যবহার করতে পারছে না, আবার নোংরা টয়লেট ব্যবহার করতে গিয়ে ও টয়লেট ব্যবহারের পর হাত ধোয়ার উপকরণ না থাকায় নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে তারা। ফলে প্রতিটি স্কুলের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা যাতে স্কুলের টয়লেটগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখে, সে বিষয়টি স্কুল কর্র্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে।
অবশ্য ওই সার্ভের পর গত চার-পাঁচ বছরে দেশের স্কুলগুলোতে টয়লেট ব্যবস্থার আরও উন্নতি হয়েছে বলে জানান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সাইফুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন অধিকাংশ স্কুলেই পরিচ্ছন্ন টয়লেট রয়েছে। টয়লেট ব্যবহারের পর হাত ধোয়ার জন্য সাবান রয়েছে। তবে এ অবস্থা অব্যাহত রাখতে হলে সচেতনতা দরকার।
এই প্রকৌশলী আরও বলেন, সরকার স্থাপনা করে দেয়। রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্কুল কর্র্তৃপক্ষের। হাত ধোয়ার জন্য সাবান বা ছাই হাতের সামনে রাখতে হবে। টয়লেটগুলোতে পরিষ্কার পানি নিশ্চিত করতে হবে। এর দায়িত্ব স্কুল কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে। ২০১৪ সালের পর আর ‘হাইজিন বেসলাইন সার্ভে’ হয়নি বলে জানান এই প্রকৌশলী।
জরিপ বলছে, মাত্র ২২ শতাংশ স্কুলে মেয়েদের জন্য আলাদা টয়লেট আছে, যার কোনোটিরই মাসিক ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা নেই। স্কুলগুলোতে মাসিকবান্ধব টয়লেট না থাকায় ৪০ শতাংশ স্কুলছাত্রী গড়ে মাসে তিন দিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকে। মাত্র ৬ শতাংশ স্কুলে মাসিক সম্পর্কে পড়ানো হয়। ৩১ শতাংশ স্কুলছাত্রী মনে করে, মাসিকের কারণে স্কুলে তাদের স্বাভাবিক লেখাপড়ার ব্যাঘাত ঘটে।
এছাড়া ৮৬ শতাংশ স্কুলছাত্রী মাসিকের সময় পুরনো কাপড় ব্যবহার করে। মাত্র ১২ শতাংশ স্কুলছাত্রী মাসিকের সময় ব্যবহৃত কাপড় পরিষ্কার পানি ও সাবান দিয়ে ধোয় এবং শুকিয়ে নেয়। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকায় ৮৬ শতাংশ স্কুলছাত্রী মাসিকের সময় স্কুলে তাদের ব্যবহৃত কাপড় বা স্যানিটারি প্যাড বদলাতে পারে না।
এ ব্যাপারে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেহেরুন নেছা দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্কুলে নারী শিক্ষকদের ছাত্রীদের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। কারণ একজন ছাত্রী দিনের একটা বড় অংশ স্কুলে থাকে।
২০১৪ সালের হাইজিন বেসলাইন সার্ভের সঙ্গে যুক্ত এমন এক সংস্থার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্কুলে সঠিক মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাবান্ধব টয়লেট এবং পানি, স্যানিটেশন ও হাইজিন (ওয়াশ) সুবিধা নিশ্চিতের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেটের পরিমাণ সরকারি পরিপত্র বা বিজ্ঞপ্তিতে সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। সেক্টর উন্নয়ন পরিকল্পনা (এসডিপি) ২০১১-২০২৫-এর নির্দেশনা অনুসারে, ১:১৮৭-এর পরিবর্তে ১:৫০ জন ছাত্রীর জন্য নতুন এবং পৃথক টয়লেট তৈরি ও পরিচালনার জন্য যে বাজেট দরকার, তা নেই। এর জন্য স্কুলগুলোকে অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে। স্কুলে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বিশেষ কর্মসূচি থাকা প্রয়োজন।
×
