‘বুয়েটকে বুয়েটের আইনে চলতে দিন’ এই দাবিটা বেশ সংঘবদ্ধ আকারেই উঠতে দেখছি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েট বিষয়ে এই বক্তব্যটি মূলত এসেছে ছাত্ররাজনীতি বা ছাত্রসংগঠন বিষয়ে অনেক জটিল তর্ক-বিতর্কের সহজ মীমাংসা হিসেবেই। হুবহু এই শিরোনামে পত্রিকায় নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে এবং কাছাকাছি সময়ে গণমাধ্যমে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের এমন মন্তব্যও আমরা দেখেছি যে, বুয়েটের আইন কারও পছন্দ না হলে সে বুয়েটে না আসুক।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই বিধিবদ্ধ নিয়মকানুন থাকে। এই আইনগুলো এ কারণেই করা হয়, যেন প্রতিষ্ঠানটির কাজকর্ম ঠিকঠাকমতো চলতে পারে এবং সেটি তার উদ্দেশ্যের সর্বোচ্চটা প্রদান করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক এই আইনগুলো অধস্তন চরিত্রের। রাষ্ট্রের কোনো বিধিবদ্ধ আইনের সঙ্গে যদি সে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। এমনকি, স্বয়ং ফৌজদারি বা দেওয়ানি আইনের কোনো ধারাও যদি আরও উচ্চতর কোনো আইনের সঙ্গে দ্বন্দ্বমূলক হয় যেমন সংবিধানÑ তাহলে তাও বাতিল হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা।
এ কারণেই কেউ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিংবা বুয়েটের শিক্ষার্থী, তার এই পরিচয়ের চেয়ে সে বাংলাদেশের নাগরিক, এই পরিচয়ের আইনি তাৎপর্য বহু গুণ বড়। বুয়েটকেও বাংলাদেশের আইন ও সংবিধান মেনেই কার্যকর থাকতে হয়। ছাত্ররাজনীতির ভালো-মন্দবিষয়ক বিতর্কের মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে যদি বুয়েটের আইনে ছাত্ররাজনীতি বা ছাত্রসংগঠনের বৈধতা নেই, এই যুক্তিটি তুলে ধরা হয়, তার একটা মৌলিক খুঁত থাকে। সেই খুঁতটি ওইটুকু : আমাদের দেখাতে হবে বুয়েটের এই আইনটি বাংলাদেশের অন্য আইনগুলোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না। এই বিষয়ে আমরা বাংলাদেশের সংবিধানের দিকেই তাকাতে পারি। বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগ মৌলিক অধিকার-সংক্রান্ত, সেখান থেকেই উদ্ধৃত করা যাক ‘৩৮। জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে : তবে শর্ত থাকে যে, কোনো ব্যক্তির উক্তরূপ সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার কিংবা উহার সদস্য হইবার অধিকার থাকিবে না, যদি (ক) উহা নাগরিকদের মধ্যে ধর্মীয়, সামাজিক এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করিবার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; (খ) উহা ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ, জন্মস্থান বা ভাষার ক্ষেত্রে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করিবার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; (গ) উহা রাষ্ট্র বা নাগরিকদের বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী বা জঙ্গি কার্য পরিচালনার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; বা (ঘ) উহার গঠন ও উদ্দেশ্য এই সংবিধানের পরিপন্থী হয়। ’
‘বুয়েটের আইনের’ জন্য সংবিধানিক আইনের সামনে তাহলে কী পরিণতি অপেক্ষা করছে? সেটাও সংবিধানেই বলা আছে, অন্য একটি অনুচ্ছেদে : ‘২৬। (১) এই ভাগের বিধানাবলির সহিত অসমঞ্জস সকল প্রচলিত আইন যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, এই সংবিধান-প্রবর্তন হইতে সেই সকল আইনের ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে।’ অর্থাৎ একটা বিষয় পরিষ্কার, সংবিধানে বলে দেওয়া সীমাগুলো মেনে যেকোনো সংগঠন গড়ে তোলার এবং তার সদস্য হওয়ার অধিকার বুয়েটের ছেলেমেয়েদেরও আছে। এবং এর বিরোধী কোনো আইন যদি কোথাও থেকে থাকে সেটা এমনকি পাকিস্তানি আমলের মহাপরাক্রমশালী আইয়ুব খাঁর আমলের বুয়েট আইন হয়ে থাকলেও তা বাতিল বিবেচিত হবে।
ছাত্ররাজনীতি বা সংগঠন নিষিদ্ধ করতে বুয়েট আইন কার্যকর করার প্রস্তাব করার আগে বাংলাদেশের সংবিধানের এই অনুচ্ছেদগুলোর বিষয়েও আমাদের তাই পরিষ্কার বক্তব্য থাকা প্রয়োজন। সংবিধান যেহেতু কোনো অনড়-অচল বস্তু না, সেটার তো পরিবর্তন হতেই পারে। ‘বুয়েটকে রক্ষার প্রয়োজনে’ হয়তো কেউ ভাবছেন সংবিধানের এই ২৬ এবং ৩৮ অনুচ্ছেদ যদি আমরা সংশোধন করি কীভাবে তা করতে হবে তাও বলা আছে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে তাহলে নিশ্চয়ই আইয়ুব খাঁর বুয়েট আইনকে বর্তমান সংবিধান ঠিক রেখেও বৈধ প্রতিপন্ন করা যাবে!
কিন্তু ওই যে বললাম, মৌলিক অধিকার! সংবিধানপ্রণেতারা এগুলোকে সংবিধানের এমনই অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে ভেবেছিলেন যে, এমনকি সংবিধান সংস্কারের বা সংশোধনীর সম্ভাব্য এই উদ্যোগ-প্রচেষ্টাকেও বারণ করা আছে ২৬ অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় অংশে, বলা আছে যে : (২) রাষ্ট্র এই ভাগের কোনো বিধানের সহিত অসমঞ্জস কোনো আইনপ্রণয়ন করিবেন না এবং অনুরূপ কোনো আইন প্রণীত হইলে তাহা এই ভাগের কোনো বিধানের সহিত যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে।
‘আইনপ্রণয়ন করিবেন না’ এবং করলেও ‘যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে’ এই বাণীর তাৎপর্য কি আমরা বুঝতে পারছি?
২. সমস্যাটা তাই ছাত্ররাজনীতি, লেজুড়বাদী রাজনীতি কিংবা সাংগঠনিক রাজনীতি ইত্যাদির কোনোটাই না। এর কোনোটা যদি কারও অপছন্দ হয়, তিনি তা না করলেই পারেন। কিংবা অধিকাংশেরও যদি অপছন্দ হয়, অধিকাংশই তাকে প্রত্যাখ্যান করুক। কোনো বাধা নেই। কিন্তু বুয়েট বা সারা দেশের গুণ্ডাতন্ত্রের কারণ ছাত্ররাজনীতি না, বরং তার ভিত্তি হলো ছাত্রসমাজকে ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণ করার বাস্তব চাহিদা এবং সেই চাহিদা মেটাতে দেশের জরুরি সব ফৌজদারি আইন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নামক দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে জলাঞ্জলি দেওয়া।
যেমন বুয়েটের আইনের কোনো কোনো অংশ সংবিধানের দৃষ্টিতেই গ্রহণযোগ্য। যেমন শিক্ষাকার্যক্রম কীভাবে চলবে, সেটা বুয়েটই নির্ধারণ করবে। শিক্ষাকার্যক্রমের প্রতিটি অংশ বুয়েট কর্র্তৃপক্ষ পরিচালনা করবে এবং সেখানে সংগঠনগুলো কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, যদিও মতপ্রকাশের অধিকার তাদের থাকবে। শিক্ষাকার্যক্রমে কোনো শিক্ষার্থী যদি বাধাস্বরূপ হয়, তাকে বহিষ্কার কিংবা অন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃত শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের থাকে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বুয়েটের কোনো শিক্ষার্থী যদি এমন কোনো কাজ করে, যা শুধু শিক্ষাকার্যক্রমের জন্য ক্ষতিকর না, অন্য কোনো সহশিক্ষার্থী বা বাইরের যেকোনো নাগরিকের জন্য ক্ষতিকর বা তাদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করে, সেটা দেখার এখতিয়ার বুয়েটের নাই। সেটা দেখবে বাংলাদেশের আইন ও বিচারব্যবস্থা। বরং বুয়েট সেই ক্ষেত্রে সেই কর্র্তৃপক্ষগুলোর সঙ্গেই সহযোগিতা করতে বাধ্য।
বুয়েটসহ দেশের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই দেখুন : হলপ্রশাসন বা ইত্যাদি বলে কিছু নেই, সবই গুণ্ডাতন্ত্র। নিয়মিত অত্যাচারে বরং এই প্রশাসন সহযোগীর ভূমিকায় নেমে এসেছিল। পুলিশও এসব ক্ষেত্রে নীরব অনুমোদনের ভূমিকা পালন করেছে। এই অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশ উভয়েই নিজ দায়িত্ব বিসর্জন দিয়ে অন্যায় অবৈধ এবং আইনের তুমুল লঙ্ঘন করে এমন সব ঘটনা ঘটতে দিয়েছে।
এবার কি আমরা একটা সমাধানের আলো দেখতে পাচ্ছি? প্রথমত, সংবিধানে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, সকল নাগরিকের সংগঠন করার অধিকার মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত, বুয়েট আইন তাকে খণ্ডন করতে পারে না। দ্বিতীয়ত, বুয়েটের কোনো শিক্ষার্থী যদি এমন কোনো অপরাধ করে থাকে, যা ফৌজদারি অপরাধ, তাহলে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী বুয়েটের যেমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবস্থা অ্যাকাডেমিক শাস্তি দেওয়ার কথা, তার চেয়েও বড় কথা হলো সেই অপরাধকে ফৌজদারি কার্যক্রমের আওতায় আনা। এই ফৌজদারি কার্যক্রমে যদি সরকারিবিরোধী ভেদাভেদ না করা হয়, গুণ্ডাতন্ত্র আমূলে উচ্ছেদ হবে নিমেষে।
এই আলোকে বুয়েটের কিংবা বাংলাদেশের প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান গুণ্ডাতন্ত্র ঠিক কোন দুর্বলতার সুযোগে গজিয়েছে, সেটা স্পষ্ট করেই দেখা যায়। সেটা সংগঠন করার মৌলিক অধিকারের কারণে ঘটেনি। ঘটেছে (ক) বুয়েটে কার্যত কর্র্তৃপক্ষ বলে কিছু নাই, পুরোটাই ছাত্রলীগ ও শিক্ষকদের একটা অংশের অশুভ বন্ধনের দখলে চলে গিয়েছিল; (খ) যেগুলো রাষ্ট্রস্বীকৃত ফৌজদারি অপরাধ, যেমন মারধর, মিছিলে যেতে বাধ্য করা, যৌন নিপীড়ন বা অন্য বহু রকম অপরাধমূলক কাজ, সেগুলোকে পুলিশ এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ উভয়েই ঘটতে দিয়েছেন।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং আইনি প্রশাসনের সঙ্গে সরকারি ছাত্রসংগঠন মিলে ভয়াবহ একটা কাঠামোগত গুণ্ডাতন্ত্রের পদ্ধতি চালু করেছে, তার রাষ্ট্রনৈতিক চরিত্র ও তাৎপর্য আমরা প্রায়ই বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছি এবং খুব সহজে ছাত্ররাজনীতি বা ছাত্রসংগঠনকে এর জন্য দায়ী করে খেয়ালখুশিমতো এক-একটা জনপ্রিয় সমাধান হাজির করছি।
মৌলিক অধিকারের মতো গুরুতর প্রশ্নে আমরা যেন ‘যখন যেটা সুবিধা, তখন সেই মতো চলুক’ এই রকম সুবিধাবাদী কিংবা জনপ্রিয়তাবাদী অবস্থান গ্রহণ না করে, রাষ্ট্রের মৌলিক অধিকারের প্রশ্নগুলোকে দার্শনিক ও রাষ্ট্রনৈতিক বিবেচনার আলোকেই দেখার চেষ্টা করি এবং সেই অনুযায়ীই বুয়েট বা বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে নাগরিকদের বাক-স্বাধীনতা কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা নির্ধারণ করি। প্রয়োজনে এই নিয়ে খোলামেলা জাতীয় সংলাপ হোক, নিশ্চয়ই সবার উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তাগুলোর মধ্যে কিছু না কিছু সারবত্তা আছে, সেগুলোর বিষয়ে নীতিনির্দেশনা আসুক। কিন্তু গণমাধ্যম যেন মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার পক্ষে ভূমিকা না গ্রহণ করে, সে অনুরোধ আমাদের থাকবে।
লেখক
রাজনৈতিক সংগঠক ও প্রাবন্ধিক
