পরচুলা তৈরি করে সংসার চালান খুলনার কটি গ্রামের মেয়ে। তাদের প্রধান নারী। তিনিই শেখান। কেউ মাদ্রাসা, মহাবিদ্যালয়ে পড়েন, কেউ গ্রামের বউ। পাইকগাছার বোয়ালিয়া গ্রাম ঘুরে মনজিলা বেগমের কারখানা নিয়ে লিখেছেন, ছবি তুলেছেন সুমন্ত চক্রবর্ত্তী
খুলনা শহর থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দূরের উপজেলা পাইকগাছা। জলমগ্ন, প্রাকৃতিক, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের পাশে; গাছ, পাখিতে ভরা গ্রাম বোয়ালিয়া। পাইকগাছা সদর থেকে মোটে পাঁচ কিলোমিটার দূরে। যাতায়াত ব্যবস্থাও ভালো; খুলনা-পাইকগাছা সড়কের পাশে। আছে তাতে গ্রামের এক বধূর গড়া নকল চুল; উইগ বা পরচুলা তৈরির কারখানা। পুরো পাইকগাছার প্রথম এই ধরনের কারখানাটির নাম ‘কিউট হেয়ার কোম্পানি লিমিটেড’। তাদের খুলনা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের বিভাগ, সেখানে চুল বিক্রির হাট আছে; কিন্তু এটিই প্রথম চুল তৈরির কারখানা বলে জানালেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কর্মীদের প্রধান প্রশিক্ষক মনজিলা বেগম। তার কর্মীরা সবাই নারী। কাজ করে তাদের কর্মসংস্থান, আয় হচ্ছে।
প্রতিদিন সকাল ১০টায় বোয়ালিয়া বাজারের পাশের কারখানাটি খোলা হয়। কর্মীরা সবাই বসে যান চেয়ারে। জ্বলে উঠতে থাকে টেবিলগুলোর ওপরের বাতি। চোখের পলকে কর্মব্যস্ত হয়ে যান তারা। পাশের চায়ের দোকান, আশপাশ থেকেও এই দৃশ্যের দেখা মেলে। হাসিমুখে তাদের মতোই কাজ করেন মনজিলা। তাদের মাথার ওপরে টিনের ছাউনি, চারপাশে বাঁশের চাটাই। নিচের ফ্লোর পাকা। কারখানা বন্ধ হয় বেলা পাঁচটায়।
মনজিলার বিয়ে হয়েছে উপজেলার চেঁচুয়া গ্রামের শাহীন শেখের সঙ্গে। স্বামী ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। উত্তরার কিউট হেয়ার কোম্পানি লিমিটেড নামের পরচুলা তৈরির কারখানার এক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ ও সখ্য হলো। আগ্রহ দেখে কীভাবে পরচুলা তৈরি করতে হয় শেখাতে চাইলেন তিনি। শাহীন বুদ্ধি করে স্ত্রীকেও ঢাকায় নিয়ে এলেন। দুজনে মাস ছয়েকের প্রশিক্ষণ নিলেন। সব ছেড়ে এরপর স্বামী-স্ত্রী গ্রামের বাড়িতে চলে এলেন। তারা আগেই খবর নিয়েছিলেন, এমন কোনো কারখানা জেলাতেই নেই। ফলে সংসার চালানো, আশপাশের মেয়েদের কাজের সুযোগ করে দিতে বোয়ালিয়া বাজারের মোড়ে এক ঘর ভাড়া নিয়ে গেল বছরের প্রথম দিকে শুরু করলেন কারখানাটি। চালু হয়েছে ২০১৮ সালে মে মাসে, শুরুতে কর্মী ছিলেন মাত্র ছয়জন। শুরু থেকেই কিউট তাদের সাহায্য করছে। ঢাকা থেকে আনছেন– চুল, সুতা, নেট, সুচসহ প্রয়োজনীয় বাকি সব। পরচুলা তৈরি করে ঢাকাতে মূল প্রতিষ্ঠানে কুরিয়ারে, নিজেরা গিয়ে পাঠিয়ে দেন তারা। সেখানেই কিউট ফাইনাল ফিনিশিং বা চূড়ান্তভাবে কাজ শেষ করেন। তাদের অফিসের মনজিলা ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান প্রশিক্ষক; শাহীন পরিচালক। শাহীন বিক্রি ও ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ দেখেন। নানা পণ্য কিনে আনেন।
এখন তাদের আছেন মোট ৩২ জন কর্মী। সবাই নারী। ঘরের বৌ থেকে শুরু করে কলেজ এবং স্কুলের ছাত্রীও আছেন। মোট আছে ১১টি টেবিল। প্রতিটিতে চার জন কাজ করেন। প্রতিটি টেবিলে সবার সামনে একটি করে মাথার খুলির মতো গোলাকার প্লাস্টিকের বল আছে। বলগুলোর ওপর নেট বসিয়ে চুল নিয়ে একের পর এক সেলাই করে পরচুলার খোপা তৈরি করেন তারা। একজন দক্ষ কারিগর চারদিনেই পূর্ণ একটি পরচুলা তৈরি করতে পারেন। নতুনদের প্রয়োজন হয় ১০ থেকে ১২ দিন। তাদের শেখানো ও কারখানা পরিচালনা মনজিলার কাজ। প্রথম দিকে বেতন দেন আড়াই হাজার। কাজ শিখে দক্ষ হলে কর্মীপ্রতি বেতন চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা মাসে।
কারিগরদের একজন হালিমা বেগম। পাশের তোকিয়া গ্রামে থাকেন। আট মাস কাজ করে এখন মাসে চার হাজার টাকা করে বেতন পান। ফলে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ ওঠে; সংসারেও সাহায্য হয়। ভালোই আছেন- হাসিমুখে জানালেন।
আরেকজন ফার্সিয়ার রহমান। পড়ালেখা করেন পাইকগাছা মহিলা মহাবিদ্যালয়ে। লেখাপড়ার খরচ তোলা ও সংসারে মা-বাবাকে বাড়তি রোজগারে সাহায্য করতে অনেক দিনের চেষ্টার পর এখানে কাজের সুযোগ পেয়েছেন। এখন তিনি ভালো আছেন। গরিবের মেয়ে সুবর্ণা রায়ও তাদের একজন। উপজেলার গোপালপুর গ্রামের মেয়ে। কাজ করে পান সাড়ে তিন হাজার। আছেন আট মাস ধরে। কাজ করতে করতেই বললেন, ‘আমার লেখাপড়াই টাকার অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। পড়ব বলে জেদ করে এখানে কাজ নিয়েছি। নানা প্রয়োজনে মা-বাবাকেও এখন টাকা দিতে পারি।’পাঁচ মাসের শ্রমিক সুমাইয়া আক্তার মঠবাটি মাদ্রাসায় পড়েন। একই বেতনে তিনি কাজ করেন। বললেন, ‘বাকি সব ছাত্রীর মতো আমাকেও পরীক্ষা, জরুরি ক্লাস, সংসারের জরুরি প্রয়োজনে যাবার জন্য কারখানা থেকে ছুটি দেওয়া হয়। ফলে কাজ করে আরাম আছে।’
তার কথায় সায় দিলেন তোকিয়া গ্রামের আরেক মাদ্রাসা ছাত্রী ইরানি। চার মাসেই ভালো কাজ শিখেছেন বলে তিনিও সাড়ে তিন হাজার টাকার ভালো বেতন পান। নিজের ও পরিবারের খরচ মেটে। এই মাসেই তাদের সঙ্গী হয়েছেন চেঁচুয়া গ্রামের আরিফা। মাস গেলে আড়াই হাজার মাইনে পাবেন। নিজের হাত-খরচ, সন্তানের লেখাপড়ার খরচ উঠবে বলে কাজে এসেছেন।
মনজিলা বেগম আশপাশের গ্রামের এই মেয়েদের কাজ করার সুযোগ করে দিতে পেরে খুব খুশি। বললেন, ‘খুলনা শহর থেকে আমাদের গ্রাম দূরে। ফলে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারেনি। নিয়মিতভাবে নানা পণ্যের দাম বাড়ায় অভাব আসছে। কাজের সুযোগ নেই বলে মেয়েরা অভাব সয়ে বাড়িতে বসে থাকেন। তাদের লেখাপড়া ও সংসার চালানোর ব্যবস্থা করে দিতে পেরে ভালো লাগছে।’ কাজটি বেশ কঠিন; কারণ আলাদা আলাদাভাবে স্ট্যান্ডে রাখা প্লাস্টিকের খুলির নেটের ওপর নিখুঁতভাবে একটি একটি করে চুল সেলাই করতে হয়। দেশে-বিদেশে চাহিদা আছে বলে বিকল্প ও নতুন পেশা হিসেবে গড়ে উঠছে আমাদের দেশে।’ তবে সহজভাবে ব্যাংক ঋণ পেলে তিনিসহ অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো আরও ভালো ব্যবসা করতে পারবে বলে জানালেন। বললেন, ‘যাদের মাথায় চুল নেই; তারা তো সবসময় পরচুলা পরেন। বিদেশে চেহারা বদলানো, ফ্যাশনেরও অংশ হয়ে গেছে পরচুলা।’ ভালো মানের, ভালো দামের উইগ বা পরচুলা মানুষের মাথার চুল থেকেই তৈরি হয়। সেগুলো সেলুন থেকে সংগ্রহ করেন তারা। মা-খালাদের চুল আঁচড়ানোর পর ফেলে দেওয়া চুলগুলো এখন প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগে জমানো হয়। সেখানেও আসল চুল থেকে ভালো মানের পরিবেশ বান্ধব পরচুলা তৈরি করা হয়। আবার কৃত্রিম তন্তু বা সুতো থেকেও আজকাল পরচুলা বানানো হয়।’ তাদের তৈরি পরচুলা যায় নাটক, সিনেমাতে। অভিনেতা, অভিনেত্রীরা নানা দৃশ্যে ব্যবহার করেন। নানা ধরনের সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও প্রয়োজনে উইগ পরা হয়। আবার বিশ্বকাপ ক্রিকেট, ফুটবল, অলিম্পিক ইত্যাদি নানা বিরাট আসরে যখন নানা ধরনের আয়োজন থাকে, তখনো সেসব ইভেন্টের অভিনেতা, অভিনেত্রী বা শিল্পীরা নানা ধরনের পরচুলা পরে দর্শকের মনোরঞ্জন করেন। দর্শকের মাথায় তো এমন অনেক পরচুলা দেখি আমরা। এর চলের শুরু প্রাচীন মিসরে। তারা রোদের প্রচণ্ড তাপ থেকে বাঁচতে উইগের জন্ম দিয়েছিলেন। আমাদের দেশ ছাড়া পরচুলা তৈরির কারখানা আছে ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ইন্দোনেশিয়াসহ এশিয়ার অনেক দেশে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ নানা দেশে সেগুলো রপ্তানি হয়, জানালেন এতদিনের অভিজ্ঞ মনজিলা বেগম। নানা সূত্রে জানা গেছে, আমাদের দেশে পরচুলা বা উইগ তৈরিতে সিনথেটিকের চুল ব্যবহারের হার বেশি। এসব কাঁচামাল আসে ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে। বিদেশে পশুর লোম থেকেও পরচুলা বানানো হয়। এই দেশে পরচুলার কারখানার জন্ম ২০০০ সালে। আঁচড়ে ফেলে দেওয়া নারীদের চুলগুলো থেকেই উইগের ব্যবসার শুরু। প্রথম থেকেই ক্রেতা বিদেশিরা। জেলাগুলোতে বাড়ি বাড়ি ঘুরে চুল কেনার বাণিজ্য আছে। এখন রপ্তানি করা পণ্যটির জন্য আসল চুল কিনতে নানা জেলায় হাট আছে। এরপর সেগুলো ঢাকার পরচুলা তৈরির বিভিন্ন কোম্পানির কাছে চলে যায়। তারা সেগুলো পরিশোধন করেন। পরে নানা ধরনের উইগ এভাবে কারখানাতে তৈরি হয়। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনস অথরিটি : সংক্ষেপে বেপজা) সূত্রে জানা গেছে, এই দেশে উইগ বা পরচুলার উৎপাদন এবং রপ্তানির শুরু ২০১০ সালে। প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন উইগ বানিয়ে বিক্রি করে, তেমনি তারা পিস বা সংখ্যা হিসেবেও বিক্রি করে। উইগের ব্যবসা শুরু করার প্রথম দিকেই ২০১৩-’১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ১ কোটি ১২ লাখ ৩৬ হাজার ডলার আয় করেছে। এখন আয় নিশ্চয়ই অনেক বেড়েছে।
