সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) এবং ইউরোপিয়ান মেডিসিনস এজেন্সি (ইএমএ) এক গবেষণাপত্রে জানায় ‘রেনিটিডিন’ গোত্রের ওষুধে ক্যানসারের জন্য দায়ী ‘এনডিএমএ’-এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ গবেষণার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় একাধিক ওষুধের ব্র্যান্ড রেনিটিডিন ট্যাবলেট বাজার থেকে তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। এরপর সেপ্টেম্বর মাসের ২৯ তারিখে একই কারণে বাংলাদেশেও রেনিটিডিন নিষিদ্ধ করে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। রেনিটিডিন উৎপাদন করে এমন ৩১টি কোম্পানির কাঁচামাল আমদানি, উৎপাদন ও বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ওষুধ শিল্প সমিতির নেতাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকের মধ্য দিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু রাজধানীর ওষুধের দোকানগুলোতে এখনো নানা ধরনের রেনিটিডিন বিক্রি হচ্ছে। তিরিশটিরও বেশি কোম্পানি জনপ্রিয় এই ওষুধ তৈরি ও বাজারজাত করায় কোন কোম্পানির রেনিটিডিন নিষিদ্ধ আর কোনটি নয় তা নিয়ে ক্রেতারা তো বটেই অনেক বিক্রেতাও স্পষ্টভাবে কিছু জানেন না।
মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরের ‘সুলভে বিক্রি হচ্ছে নিষিদ্ধ রেনিটিডিন’ শিরোনামের সরেজমিন প্রতিবেদনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অবাধে রেনিটিডিন বিক্রির এবং ওষুধের বিক্রেতা ও সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে জনপ্রিয় এ ওষুধ নিয়ে বিভ্রান্তির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ফার্মেসি বা ওষুধের দোকানগুলো প্রকাশ্যে ও গোপনে– দুভাবেই বিক্রি করছে রেনিটিডিন ট্যাবলেট ও সিরাপ। বিক্রেতারা বলছেন, দু-তিনটি বড় কোম্পানি তাদের ওষুধ ফেরত নিয়েছে ও পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিক্রি বন্ধ রাখতে বলেছে। তবে অনেক বড় কোম্পানি নতুন ওষুধ না দিলেও পুরনো ওষুধ ফেরত নিচ্ছে না। অন্তত ২০-২২টি ছোট কোম্পানি নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে বিক্রেতাদের কিছুই বলেনি। আগের দেওয়া ওষুধ ফেরতও নেয়নি। তাছাড়া এই ট্যাবলেট প্রচুর বিক্রি হয় বলে অনেক মজুদ থাকায় আর্থিক লোকসান ঠেকাতেও বাধ্য হয়ে নিষিদ্ধ ওষুধ বিক্রির কথা স্বীকার করেছেন অনেক বিক্রেতা।
গত মাসের শেষে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ভারতের দুই প্রতিষ্ঠান সারাকা ল্যাবরেটরিজ ও ডা. রেড্ডির তৈরি কাঁচামাল (এপিআই) দিয়ে রেনিটিডিন ওষুধ উৎপাদন, সরবরাহ ও বিক্রি সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে। যেসব রেনিটিডিন এই দুই কোম্পানির কাঁচামালে তৈরি তেমন ৩১টি কোম্পানির একটি তালিকাও প্রকাশ করে অধিদপ্তর। কিন্তু এখন বাজারে শুধু রেনিটিডিন ট্যাবলেটই নয়, রেনিটিডিনের সিরাপ এমনকি ইনজেকশনও বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন খুচরা বিক্রেতারা। বিক্রেতারা বলছেন, নিষিদ্ধের তালিকায় ১৭ থেকে ৩২ নম্বর পর্যন্ত ১৬ ধরনের রেনিটিডিন মূলত ছোট কোম্পানির। সেগুলোর বিক্রি কম হলেও তা এখনো বাজারে রয়েছে। তবে, ওষুধের পাইকারি বাজার মিটফোর্ড ও শাহবাগের ওষুধ ব্যবসায়ীরা জানান, বড় কোম্পানির মধ্যে স্কয়ার, একমি, এসিআই, এসকেএফসহ আরও কয়েকটি কোম্পানি তাদের ওষুধ বাজার থেকে তুলে নিয়েছে। তবে এর বাইরেও প্রতিটি দোকানেই অ্যাসিডিটি রোধের প্রচুর ওষুধ মজুদ রয়েছে। দোকানিদের ভাষ্য অনুযায়ী কিছু কোম্পানির দাবি তাদের ওষুধ ভারতের নিষিদ্ধ ঘোষিত কাঁচামালে তৈরি নয়, ফলে তাদের ওষুধে সমস্যা নেই। কিন্তু খুচরা বিক্রেতা বা ক্রেতারা এ নিয়ে বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত হতে পারছেন না।
অ্যাসিডিটির সমস্যা দূর করতে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ রেনিটিডিনসহ এই গোত্রের অন্যান্য ওষুধ সেবন করে থাকেন। এর মধ্যে রেনিটিডিন ছাড়াও দেশের বাজারে ওমিপ্রাজল, ইসোমিপ্রাজল, প্যান্টোপ্রাজল, ল্যান্সোপ্রাজল গোত্র বা জেনেরিকের ওষুধও বিক্রি হয়। ওষুধ ব্যবসায়ীদের মতে, সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ওমিপ্রাজল ও ইসোমিপ্রাজল জেনেরিকের ওষুধ। তবে, রেনিটিডিন জেনেরিকের অ্যাসিডিটির ওষুধের বিক্রিও কম নয়। দেশের অধিকাংশ কোম্পানিই রেনিটিডিন জেনেরিকের ওষুধ উৎপাদন ও বিক্রি করে। এই পরিস্থিতিতে বেশিরভাগ চিকিৎসকই ঝুঁকি এড়াতে রেনিটিডিন গোত্রের কোনো অ্যাসিডিটির ওষুধ প্রেসক্রাইব করছেন না। চিকিৎসকরা বলছেন, রেনিটিডিন গ্রুপের ওষুধ একেবারে বন্ধ হয়ে গেলেও সমস্যা হবে না। কারণ একই সক্ষমতার তুলনামূলক কম দামের অন্যান্য গোত্রের ওষুধ বাজারে রয়েছে। ওষুধ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, বাজারে প্রচুর বিকল্প থাকায় রেনিটিডিন বিক্রি বন্ধ হওয়ায় দুশ্চিন্তার কিছু নেই।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছে, ওষুধ প্রশাসন ক্যানসারের ঝুঁকি থাকা নির্দিষ্ট কাঁচামালে তৈরি রেনিটিডিন উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত জানালেও বাজারে তা কীভাবে কার্যকর হবে সে বিষয়ে যথেষ্ট মনোযোগ দেয়নি। প্রশাসন জানিয়েছে, এসব ওষুধে আদৌ ক্যানসারের কোনো উপাদান রয়েছে কি না– তা পরীক্ষার জন্য সিঙ্গাপুরেও পাঠানো হয়েছে এবং সেখান থেকে রিপোর্ট এলে কয়েক দিনের মধ্যে সে অনুযায়ী করণীয় জানাবেন তারা। কিন্তু এখনো বাজারে নিষিদ্ধ রেনিটিডিন থাকা এবং এ নিয়ে সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তির বিষয়ে কী করণীয় তার সুরাহা হচ্ছে না। এ অবস্থায় জরুরি পদক্ষেপ নিয়ে অবিলম্বে নিষিদ্ধ ওষুধ বিক্রি বন্ধ করা দরকার। একই সঙ্গে রেনিটিডিন গোত্রের ওষুধ সরিয়ে নেওয়ার সুযোগে ওমিপ্রাজল, ইসোমিপ্রাজল বা এমন অন্যান্য গ্যাস্ট্রিক-আলসারের ওষুধের দাম বাড়িয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে ফায়দা নিতে না পারে সে বিষয়েও নজরদারি বাড়াতে হবে।
