স্বামীকে আসামি করে হিল্লা বিয়ে থেকে রক্ষা

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০১৯, ০২:৪৩ এএম

সমাজপতিদের চাপের মুখে একঘরে হয়ে থাকা জয়পুরহাটের আক্কেলপুরের কাদোয়া বিষ্ণুপুর গ্রামের সেই গৃহবধূ অবশেষে হিল্লা বিয়ে থেকে রক্ষা পেয়েছেন। কিন্তু এজন্য নিজের স্বামীকেই আসামি করে মিথ্যে মামলা করতে হয়েছে তাকে। মিথ্যে ওই মামলার আসামি হয়ে আদালত থেকে জামিন নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন ওই নারীর স্বামী। আর সমাজপতিদের চাপে পড়ে চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রেখেই হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরে ওই গৃহবধূ এখন আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।   

এর আগে গত ২৮ সেপ্টেম্বর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়ার একপর্যায়ে রাগের মাথায় ‘তালাক’ শব্দটি উচ্চারণ করেন কাদোয়া বিষ্ণুপুর গ্রামের বাসিন্দা ওই নারীর স্বামী। লোকমুখে বিষয়টি জানতে পারেন গ্রামের মাতব্বর জালাল উদ্দীন, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউপি সদস্য বাদেশ মুহুরী মোকছেদ আলীসহ অন্য সমাজপতিরা। এরপর কয়েক দফা সালিশ বসিয়ে ওই গৃহবধূকে (৪৫) হিল্লা বিয়ের জন্য চাপ দেন ওই সমাজপতিরা। কিন্তু তাতে রাজি না হওয়ায় তারা গৃহবধূসহ তার পরিবারকে একঘরে করে রাখে। হিল্লা বিয়ে করতে ক্রমাগত চাপের মুখে থাকা ওই গৃহবধূ গত ২১ অক্টোবর থানায় অভিযোগ করতে যান। কিন্তু ওসি না থাকায় অভিযোগ দিতে না পারায় বাড়ি ফেরার পথে সমাজপতিদের ইন্ধনে তাদের সন্তান ও সহযোগীরা গৃহবধূকে বেধড়ক মারধর করেন। পরে প্রতিবেশীরা তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে। আক্কেলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় গত ২৩ অক্টোবর সমাজপতিদের হুমকি ও চাপে ওই গৃহবধূ তার স্বামী, মাতব্বর জালাল উদ্দীন, আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউপি সদস্য বাদেশ মুহুরী, মোকছেদ আলী এবং জালাল উদ্দীনের দুই ছেলে শাকিল ও সোহাগসহ ছয়জনের নামে থানায় মামলা করেন।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, সমাজপতিরা গৃহবধূকে চাপ দিয়ে তার স্বামীকে আসামি করে মামলা করানোর পরদিন ২৪ অক্টোবর স্বামীকে দিয়েই আদালতে স্ত্রীর বিপক্ষে হিল্লা বিয়ের কথা মিথ্যা বলে সাক্ষ্য দেওয়ায়। এর প্রেক্ষিতে আসামিরা জামিন পায়। জামিনের পর স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ওই সমাজপতিরা কৌশলে অসুস্থ গৃহবধূকে হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হবে– এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাড়িতে নিয়ে যায়। এ ছাড়া স্বামী-স্ত্রীর তালাক দেওয়ার বিষয়টিও তারা মীমাংসা করে দেওয়ার প্রলোভন দেখায়। কিন্তু বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর মীমাংসার ব্যাপারে কালক্ষেপণ করতে থাকে এবং গৃহবধূকে চিকিৎসা না দিয়ে অনেকটা একঘরে করে রাখে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ভুক্তভোগী গৃহবধূ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাতব্বররা ও তাদের ছেলেরা আমার স্বামীকে রাস্তায় ধরে অনেক শাসাশাসি করে বলে– তোর জন্য গ্রামে এসব হচ্ছে। আমাদের যদি কোনো ক্ষতি হয় তাহলে তোকেই মেরে ফেলব। এমন খবর শুনে আমি বাধ্য হয়ে স্বামীকে ১নং আসামি করে মামলা করি। পরে তারা আমাকে কৌশলে বাড়িতে নিয়ে আসে এবং স্বামীকে বাড়িতে তুলে দেয়। এখন মীমাংসাতেও তারা কালক্ষেপণ করছে। বর্তমানে আমি খুবই অসুস্থ, ঠিকমতো কথাও বলতে পারছি না।’

তিলকপুর ইউপি চেয়ারম্যান সেলিম মাহবুব সজল বলেন, ‘গ্রামবাসীরা সহযোগিতা করে স্বামীকে তার বাড়িতে তুলে দিয়েছে, কিন্তু এরপর আর কিছু হয়নি।’

অন্যদিকে আক্কেলপুর থানার ওসি আবু ওবায়েদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘থানায় মামলা করার পর আসামিদের ধরতে ব্যাপক তৎপরতা শুরু হলে তারা আদালতে হাজির হয়ে জামিন নিয়েছে। তারপর আমরা গ্রামে গিয়ে গ্রামবাসীদের বলে এসেছি, যেন গৃহবধূ ও পরিবারের কোনো সমস্যা না হয়। সমস্যা হলে সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। আর মামলার চার্জশিট দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি চলছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত