গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এককভাবে তরুণদের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থান ও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করেছে কোন খাত?
উত্তর হচ্ছে গবাদি পশু পালন। কল্পনাতীত হলেও সত্য, এই খাতে প্রতি বছর প্রায় ২৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি ঘটছে এবং এই শিল্পের বিকাশের সম্ভাবনার মাত্র শুরু। কেননা, এই দেশের অধিকাংশ মানুষ মাংস খেতে পছন্দ করলেও খাবারে মাথাপিছু মাংসের পরিমাণে আমরা পৃথিবীর সব দেশের একেবারে তলানিতে! ২০১৭ সালের ‘ওইসিডি’ প্রকাশিত বৈশ্বিক তালিকায় সব ধরনের মাংসে আমাদের চেয়ে পিছিয়ে ছিল মাত্র তিনটি দেশ। ২০১৯ সালের ওইসিডির তালিকায় বাংলাদেশের তথ্য দেওয়া হয়নি, তবে বাকিদের অগ্রগতি দেখে বোঝা যায় বাংলাদেশিরাই এখন পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বড় নিরামিষভোজী জাতি এবং এটা ঘটেছে এই গবাদি-হাঁস-মুরগি-মৎস্য খাতে এত বিপুল প্রবৃদ্ধির পরও। ফলে মন্ত্রীরা যখন ঘটা করে বলেন, গবাদি পশুতে আমরা উদ্বৃত্ত, কিংবা আমরা রপ্তানির উদ্যোগ নিচ্ছি, সেটা আদৌ যথার্থ নয়। বরং বলা যায়, এই খাত বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেওয়া মাথাপিছু আমিষের ন্যূনতম অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতেই আরও অন্তত তিন গুণ বিকশিত হওয়ার সামর্থ্য রাখে আর কোনো সুস্থ কর্মক্ষম রাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করতে গেলে তা বহু গুণ বাড়তে পারবে। এখন স্মরণ করা দরকার, গত কয়েক বছরে এই যে বিকাশ ঘটেছে পশুপালনে, তা কিন্তু কোনো রাষ্ট্রীয় নীতির কারণে ঘটেনি, বরং এর সূত্রপাতটি ঘটেছিল প্রতিবেশী ভারতে ২০১৪ সালে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ থেকে গরু রপ্তানি বন্ধের কারণে।
২. কিন্তু নিজের দেশের বিকাশমান একটি শিল্পকে গলাটিপে হত্যা করার আয়োজনটাও বোধকরি বাংলাদেশেই সম্ভব। কল্পনা করা যায়, বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ মাংস আমদানি করা হচ্ছে এবং এই পরিমাণটা বাড়ছে? পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী ‘ভারত, সৌদি আরব ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে গত ৬ মাসে ২০ লাখ ৪৩ হাজার কেজি হাড্ডিবিহীন মাংস আমদানি হয়েছে।’ আমদানির এই পরিমাণটা কত অস্বাভাবিক তা আরও ভালো করে বোঝা যাবে বছরখানেক আগের অন্য একটি প্রতিবেদনে : ‘২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে প্রায় ২০ টন বা ২০ হাজার কেজি গরুর মাংস আমদানি হয়েছে। আগের অর্থবছরে দেশে প্রায় ৫৫ হাজার কেজি গরুর মাংস আমদানি হয়েছিল। তবে তার আগের, অর্থাৎ ২০১৪-১৫ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ১৮ হাজার কেজি গরুর মাংস।’ অর্থাৎ, এ বছর মাত্র গত ছয় মাসে প্রায় ২০০০ টনের বেশি গরুর মাংস আমদানি হয়েছে, দশমিকের পরের যে অংশগুলো গোনা হয়নি সেটুকুও আগেকার বছরের পূর্ণ সংখ্যার চেয়ে বড় এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরের মাংস আমদানির তুলনায় সামান্য ছোট! যে শিল্প সরকারের সাহায্য ছাড়াই লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে, সেই শিল্পের পিঠে ছুরিকাঘাত করার এর চেয়ে বড় দৃষ্টান্ত আর কী হতে পারে! এই মাংস আমদানি অবিলম্বে বন্ধ করা হোক।
৩. মাংস আমদানির গল্প এখানেই শেষ নয়। নতুন করে আবার আলাপ শুরু করেছেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকরা। কিছুদিন ধরেই তারা প্রস্তাব করে আসছেন, ব্রাজিল থেকে সস্তায় গোমাংস নিয়ে আসা হোক, এর বিনিময়ে তারা সে দেশটিতে পোশাক রপ্তানির সুযোগ পাবেন। না, ব্রাজিলের মাংস নিরাপদ নয় বলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র যে তা আমদানি নিষিদ্ধ করেছে ইত্যাদি আলোচনায় আমরা যাব না। ব্রাজিলে মাংস উৎপাদনের জন্য আমাজন অরণ্য পুড়িয়ে খাক করে ফেলা হচ্ছে, সেই বিষয়টিও আমরা আপাতত তুলব না। আমরা বরং বাংলাদেশের তরুণদের ভবিষ্যতের প্রশ্নটা তুলতে চাই। রপ্তানির সুযোগের বিনিময়ে প্রয়োজনীয় কিছু আমদানি করা যেতেই পারে। কিন্তু তৈরি পোশাক রপ্তানির বদলে মাংস আমদানির বাস্তবতা কি আদৌ বিবেচনাযোগ্য? এতে পোশাক খাতে যেটুকু বাড়তি সুবিধা মিলবে তার তুলনায় অসুবিধাগুলোর কি কোনো বাস্তব হিসাবনিকাশ করা হয়েছে? যতগুলো কর্মসংস্থান বিনষ্ট হবে, সেই তুলনায় কত কর্মসংস্থান তৈরি হবে এই লেনদেনে?
‘দেশে এখন ছাগলের সংখ্যা ১ কোটি ৯২ লাখ ৮৭ হাজার ৪১৩। আর গরু আছে ২ কোটি ৮৪ লাখ ৮৭ হাজার ৪১৫ টি।’ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে শ্রমিক, পশুখাদ্য উৎপাদন, পরিবহন, হাটবাজার হয়ে কসাইখানা পর্যন্ত যত মানুষের কর্মসংস্থান এই খাত তৈরি করে, তা লাখ তিরিশেকের চেয়ে বহু বেশি হবে। মাংস খাবার অত্যল্প পরিমাণটার কথা আবার যদি ভাবি, এই উৎপাদন এবং উদ্যোক্তার সংখ্যা ও কর্মসংস্থানের সংখ্যাও বহু গুণ বৃদ্ধির সুযোগ আছে।
গত ২৭ মে, ২০১৯ তৈরি পোশাক খাত ঘটা করে সামনের ৫ বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দাবি করেছে। কিন্তু আমাদের বিশ্বাস, এই পরিমাণ টাকাই বাংলাদেশের নবীন উদ্যোক্তাদের পেছনে পরিকল্পিত উপায়ে ব্যয় করা গেলে এবং শিক্ষা, প্রশিক্ষণের মান উন্নয়ন করা হলে বাংলাদেশ এতগুলো নতুন নতুন শিল্প খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবে যে, উন্নত বহু দেশের মতো কেবল তৈরি পোশাক খাতের ওপর আর ভরসা করে থাকতে হবে না।
৪. ব্রাজিল থেকে মাংস যদি মাত্র ১০০ টাকায় আমদানি করা যায়, ২০০ টাকায় তা বিক্রি করা হলে সেটা কি দেশের পুষ্টি সমস্যার সমাধান করবে না? ব্রাজিল তো নিমেষেই বাংলাদেশের চাহিদার প্রায় পুরোটা মাংস জোগান দিতে সক্ষম। এটা একটা জনপ্রিয় ভুল ধারণা। আসলে তা করবে না। বরং বর্তমান বাস্তবতায় এই পরিমাণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান বিনষ্ট হলে দেশের মাংস-দুধ-ডিম-মাছ কিনতে সক্ষম লোকের সংখ্যাটাই রাতারাতি কমে যাবে। বহু শিশুর বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ হবে। বহু বাবা-মাকে তাদের সন্তানরা চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সামর্থ্য হারাবে। বরং সবচেয়ে বড় ক্ষতি যেটা হবে, সেটা হলো দেশে বিনিয়োগ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় আরও বহু তরুণ অবৈধ কিংবা বৈধপথে দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করবে। মাংস-দুধ দেশে উৎপাদনের আর একটা বড় সুবিধা হলো বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক সার আমদানির হাত থেকে দেশকে তা রক্ষা করবে। বরং অনুসন্ধান করা উচিত মাংসের দাম কেন বাড়তি অথচ গরুর দাম কেন কম? গত মার্চে খামারিরা জানিয়েছেন, ‘এক কেজি গরুর মাংসের উৎপাদন ব্যয় ৩৫০ টাকা, বিক্রি ৫৫০ টাকা।’ পার্থক্যটি তো বিপুল। খামারি ও মাংস ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, হাটে গরুপ্রতি ১০০ টাকার বদলে কয়েক হাজার টাকা ‘তোলা’ আদায়, পরিবহনে চাঁদাবাজি এসবের কারণেই ভোক্তা পর্যন্ত দামের এই বিরাট বৃদ্ধি। অন্যদিকে, বাংলাদেশে উৎপাদন খরচও বহু দেশের চেয়ে বেশি। গোখাদ্যের দাম বেশি। সুদের হার বহু গুণ বেশি। পশুর বীমা মাত্র শুরু হয়েছে এবং এখনো এর প্রচলন ঠিকমতো হয়নি। এসব দিকে নজর দিলে বাংলাদেশে মাংসের দাম ব্রাজিলের সমপর্যায়ের না হলেও অনেকখানিই কমিয়ে আনা সম্ভব।
৫. প্রায়ই পত্রিকায় দেখা যাবে, ফরাসি কৃষকরা প্যারিসের রাস্তায় গরু নিয়ে হাজির হয়েছেন, কিংবা বেলজিয়ামের কৃষকরা বিক্ষোভ করছেন, ডাচ কৃষকরা রাজধানীতে ট্রাক্টর নিয়ে মিছিল করছেন। এগুলো সবই শিল্পোন্নত দেশ। তারপরও কেন সেখানে ছোট ও মাঝারি কৃষককে যথাসম্ভব গুরুত্ব দেওয়া হয়? কারণ সে দেশগুলোর অর্থনীতির একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ তার ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা; তাদের ভালোমন্দের ওপর বিপুল কর্মসংস্থান, নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতা নির্ভর করে, সেখানে তাই কৃষি সম্পর্কিত সিদ্ধান্তগুলোই রাজনীতির আলোচ্য প্রসঙ্গ হিসেবে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ একদা ছিল কৃষক রাজনীতির দেশ। ১৯৭১ পরবর্তী সময়ে এই দেশের রাজনীতিতে কৃষকদের ভূমিকা ক্রমাগত কমেছে। শুধু তাই নয়, কৃষি পেশাটিই গৌণ হতে হতে মর্যাদার নিম্নতম বিন্দুতেও পৌঁছেছে ৯০ দশক নাগাদ। বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রান্তিক অংশ এখানকার কৃষককুল, সংখ্যায় এখনো তারা যতই বড় হোক না কেন। আমরা আশা করব নতুন প্রজন্মের যে তরুণরা মুরগি কিংবা মাছ, গরু কিংবা সবজি উৎপাদন করে নিজেরা নতুন কৃষক শ্রেণি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন, অভ্যন্তরীণ ভোগ ও বিনিয়োগে প্রাণসঞ্চার করেছেন, তাদের দাবিগুলোই যে দেশের প্রত্যক্ষ স্বার্থ, সেই কথাটিও তারা জোর গলায় উত্থাপন করবেন। তাদের মতামত না নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা কতিপয় ব্যবসায়ী নিজেদের কায়েমি স্বার্থ যেন দেশের ভবিষ্যতের ওপর চাপিয়ে দিতে না পারেন, তা নিয়ে সোচ্চার থাকাটা জরুরি। তথ্যপ্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস এবং কৃষি খামারের মতো খাতগুলোই এখন তরুণদের ভরসা, বিপুল কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও রয়েছে এগুলোতে।
এরা বিকশিত হলে ভূমধ্যসাগরে মরিয়া তরুণের সাগরে ডুবে মৃত্যুর সংবাদ কমে আসবে আর তা না হলে তরুণদের দেশ ছেড়ে পালানো অব্যাহত থাকবে। দেশ থেকে পালানো নয়, বরং দেশটাকে তরুণরা গড়ে তুলুক।
লেখক
রাজনৈতিক সংগঠক ও প্রাবন্ধিক
subarnadin@gmail. com
