রাজধানীর ধানমণ্ডির একটি বহুতল ভবনের এক ফ্ল্যাট থেকে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় দুই নারীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতরা হলেন আফরোজা বেগম (৬৫) ও তার গৃহকর্মী দিতি (১৬)।
আফরোজা বেগম শিল্পপতি মনির উদ্দিন তারিমের শাশুড়ি। তিনি ধানমণ্ডির ২৮ নম্বর সড়কের (নতুন ১৫) ২১ নম্বর বাড়ির চারতলার একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন গৃহকর্মীকে নিয়ে। আর ভবনটির পাঁচতলার একটি ফ্ল্যাটে থাকেন মনির উদ্দিন ও তার স্ত্রী।
ধানমণ্ডি থানার ওসি আবদুল লতিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওই ফ্ল্যাটের বেডরুমের মেঝেতে দুই নারীকে ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। কে বা কারা কেন এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, সে বিষয়ে এখনই বলা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, লাশ উদ্ধারের পাশাপাশি ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিট। সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ দুটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। এই জোড়া খুনের রহস্য উদ্ঘাটনে থানা পুলিশের পাশাপাশি ছায়া তদন্ত শুরু করেছে র্যাব ও পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।
ধানমণ্ডি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এনামুল হক বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, বিকেল ৪টার পর কোনো একসময় ওই দুই নারীকে হত্যা করে পালিয়ে গেছে এক বা একাধিক দুর্বৃত্ত। বাসার মালামাল লুট কিংবা অন্য কোনো কারণে এই ঘটনা ঘটতে পারে।’ লোভেলিয়া নামের ওই বাড়ির একাধিক বাসিন্দা জানান, আফরোজা বেগমের স্বামীর নাম আশরাফউদ্দিন হিরন। তাদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে। বাড়ির চার ও পাঁচতলায় তাদের দুটি ফ্ল্যাট। চারতলার ফ্ল্যাটে থাকতেন আফরোজা ও গৃহকর্মী দিতি। পাঁচতলার ফ্ল্যাটে থাকতেন আফরোজার মেয়ে দিলরুবা সুলতানা ও জামাতা মনির উদ্দিন তারিম।
বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী নুরুজ্জামান জানান, বিকেল ৩টায় আফরোজা বেগমের জামাতা মনিরের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) বাচ্চু এক নারীকে নিয়ে আসেন। ওই নারী বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করার কথা বলে বাচ্চুর সঙ্গে উপরে যান। এরপর ৬টার দিকে বাচ্চু একবার লুঙ্গি পরে নিচে নামেন। এর কিছুক্ষণ পর ওই নারী চলে যান। তারপর বাচ্চুও প্যান্ট-শার্ট পরে চলে যান। এর কিছু সময় পর ওপর থেকে এক ছেলে ইন্টারকমে জানায়, খালাম্মা মারা গেছে। খবর পেয়ে স্বজনরা বাসায় আসেন। এরপর পুলিশও আসে।
ওই নিরাপত্তাকর্মী আরও বলেন, নতুন গৃহকর্মী একাই বাসা থেকে বের হন। ওইসময় তাকে যেতে দেব কি না, জানতে চেয়ে ইন্টারকমে ফোন করি। আফরোজা বেগমের বাসার ইন্টারকম নষ্ট ছিল। তাই তার মেয়ের বাসার ইন্টারকমে ফোন দিলে কেউ রিসিভ করেননি। এ সময় গৃহকর্মী জানান, কম বেতনে চাকরি করব না বলে চলে যাচ্ছি, আমাকে যেতে দেন। এরপর তাকে যেতে দিই। যাওয়ার সময় তার কাছে কোনো কিছু ছিল না।
আফরোজা বেগমের জামাতা শিল্পপতি মনির উদ্দিন তারিম পুলিশকে জানিয়েছেন, তাদের চারতলার ফ্ল্যাটের আলমারি খোলা ছিল। সেখান থেকে মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালঙ্কার খোয়া গেছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, আফরোজা বেগমের স্বামী মারা গেছেন। তিনি ব্যবসায়ী ছিলেন। ওই ফ্ল্যাটে আফরোজা বেগম গৃহকর্মী দিতি ও কেয়ারটেকার বাচ্চুকে নিয়ে থাকতেন। বাচ্চু পুলিশকে জানিয়েছেন, তার মাধ্যমে একজন নতুন গৃহকর্মী শুক্রবার বাসায় এসে যোগ দিয়েছিলেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তিনি ফ্ল্যাটে ঢুকে দেখেন বেডরুমের মেঝেতে দুজনের গলাকাটা লাশ পড়ে আছে।
পুলিশের রমনা জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার আবদুল্লাহ হিল কাফী বলেন, হত্যাকাণ্ডের তদন্তের স্বার্থে ওই অ্যাপার্টমেন্টের বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। অ্যাপার্টমেন্টের সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ জব্দ করা হয়েছে। অ্যাপার্টমেন্টের চতুর্থ তলা থেকে লিফট দিয়ে নামার পথে স্থানে স্থানে রক্তের দাগ দেখা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ঘাতক পালিয়ে যাওয়ার সময় তার শরীরে লেগে থাকা রক্ত থেকে ওই দাগের সৃষ্টি হয়েছে। তবে কে বা কারা তাদের গলা কেটে হত্যা করেছে সেটি জানা যায়নি। নিহত বৃদ্ধার স্বামী আশরাফ হোসেন হিরন ঠিকাদার ছিলেন। তাদের তিন মেয়ের মধ্যে ছোট মেয়ে স্বামীসহ ওই অ্যাপার্টমেন্টের পঞ্চম তলায় থাকেন। অন্য দুজনের মধ্যে একজন কানাডা ও অপরজন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী।
