জালিয়াতি ও প্রতারণার মামলায় নরসিংদীর বহুল আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান ওরফে সুইডেন আতাউরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গত বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে রাজধানীর মালিবাগ এলাকা থেকে গ্রেপ্তারের পর রাত ১১টায় তাকে নরসিংদী সদর মডেল থানায় হস্তান্তর করে সিআইডি। পরে গতকাল শুক্রবার বিকেলে শতকোটি টাকার মোল্লা স্পিনিং মিল অবৈধভাবে দখলের ঘটনায় সোনালী ব্যাংকের করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। সিআইডি তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেছে। আদালত আগামীকাল রবিবার ওই রিমান্ড আবেদনের ওপর শুনানির দিন ধার্য করেছে।
গ্রেপ্তার আতাউর নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী সদস্য। তিনি সুইডেন শাখা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি বলেও পুলিশের কাছে দাবি করেছেন।
নরসিংদী জেলা পুলিশ ও সিআইডি কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, আতাউর রহমান নরসিংদীতে ভূমিদস্যু হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় ব্যবহার করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ সাধারণ মানুষের জমি দখল ও প্রতারণার বেশ কিছু অভিযোগ রয়েছে। তিনি ২০১৬ সালের প্রথম দিকে নরসিংদী শহরের চৌয়ালা এলাকার শতকোটি টাকা দামের মোল্লা স্পিনিং মিল তার ‘সন্ত্রাসী বাহিনী’ দিয়ে জোর করে দখলে নেন। পরে সুইডেন বাংলা টেক্সটাইল নামকরণ করে ওই কারখানাটি পরিচালনা করে আসছেন। এ ঘটনায় ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ব্যাংকের ঋণের বিপরীতে দায়বদ্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানটির অবৈধ দখলদার আতাউর রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করে মিলটির ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান সোনালী ব্যাংক। ব্যাংকের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্রেডিট বিভাগের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার মোহাম্মদ বেলাল হোসেন বাদী হয়ে করা মামলায় দখলদার উচ্ছেদের দাবি জানানো হয়। প্রথমে মামলাটি পুলিশ তদন্ত করলেও সুইডেন আতাউরের প্রভাব ও নানা তদবিরে তা বাধাগ্রস্ত হয়। পরে মামলাটি সিআইডিতে স্থানাস্তর করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ তদন্ত শেষে সিআইডি তাকে গ্রেপ্তার করল।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিআইডির অতিরিক্ত সুপার রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুইডেন আতাউর নরসিংদীর বহুল আলোচিত ভূমিদস্যু। তার বিরুদ্ধে জালিয়াতি, প্রতারণা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের একাধিক মামলা রয়েছে। এর মধ্যে জালিয়াতি ও প্রতারণার ঘটনায় সোনালী ব্যাংকের একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তার বিরুদ্ধে অন্য অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হবে।’
এদিকে আতাউরকে গ্রেপ্তারের পর তাকে ছাড়াতে নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যাপক তদবির-তৎপরতা চালান বলে জানা গেছে। তবে সিআইডির কঠোর অবস্থানের কারণে তার সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
যেভাবে উত্থান সুইডেন আতাউরের : এদিকে সুইডেন আতাউরকে গ্রেপ্তারের পর তার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক জমি দখল ও নির্যাতনের আরও খবর বেরিয়ে আসছে। তাকে গ্রেপ্তারে স্বস্তি প্রকাশ করে দৃষ্টান্তমূলক বিচারেরও দাবি জানিয়েছেন এসব ভুক্তভোগী।
নরসিংদী জেলা পুলিশ, সিআইডি কর্মকর্তারা ও আতাউরের নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগী লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নরসিংদী শহরের হাজিপুর এলাকার নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান আতাউর রহমান। বাবা মমতাজ উদ্দিন ছিলেন নরসিংদী বাজারের একজন দিনমজুর। চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট আতাউর। প্রায় ২০ বছর আগে অবৈধপথে সুইডেন পাড়ি জমান তিনি। সেখানে এক বৃদ্ধার বাড়িতে নেন গৃহপরিচারকের কাজ। পরে সুইডেনে বসবাসের জন্য রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেন আতাউর। কিন্তু তা নাকচ হলে ওই বৃদ্ধাকে বিয়ে করে দেশটিতে বসবাসের অনুমোদন পান তিনি। অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে ওই বৃদ্ধার বিপুল অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ করে তার সবকিছুর মালিক বনে যান আতাউর। সেই টাকায় সুইডেনের স্টকহোমের ক্রিসেন্টাল এলাকায় একটি দোকান খোলেন। পরে সুইডেন শাখা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। এরই একপর্যায়ে সুইডেন শাখা আওয়ামী লীগের সভাপতিও বনে যান তিনি। আর এই রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সুইডেন সফরে যাওয়া বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীসহ শীর্ষ পর্যায়ের নেতা ও আমলাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন সুইডেন আতাউর। তখন প্রধানমন্ত্রীসহ বড় বড় নেতার সঙ্গে ছবি তুলে ফেইসবুকে আপলোড করে তা দেখিয়ে দেশে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালান। এরই ধারাবাহিকতায় মাঝেমধ্যেই কিছুদিনের জন্য দেশে আসতে থাকেন আতাউর। বাগিয়ে নেন জেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য পদ। এরপর ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় ব্যবহার করে নরসিংদীতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ সাধারণ মানুষের জমি দখল ও প্রতারণায় জড়িয়ে পড়েন এই আওয়ামী লীগ নেতা। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই শহরের পশ্চিম কান্দাপাড়া এলাকায় ছয়তলা সুইডেন ভিলা ও নরসিংদী বাজারের গেঞ্জিপট্টি মোড়ে অন্যের জমি দখল করে আরেকটি পাঁচতলা ভবন ‘সুইডেন প্লাজা’ গড়ে তোলেন তিনি। তবে এখানেই ক্ষান্ত দেননি সুইডেন আতাউর। প্রভাব খাটিয়ে শহরের চৌয়ালা এলাকার শতকোটি টাকা মূল্যের মোল্লা স্পিনিং মিল ‘সন্ত্রাসী বাহিনী’ দিয়ে জোর করে দখলে নেন। দখল করা এই কারখানা সুইডেন বাংলা টেক্সটাইল নামকরণ করে পরিচালনা করছেন আতাউর। এলাকাবাসীর ভাষ্য, দখল করা মিলটি সুরক্ষিত রাখতে ১০ লাখ টাকা মাসোহারার বিনিময়ে নরসিংদীর এক প্রভাবশালী ব্যক্তির সহযোগিতায় নিজস্ব একটি ‘সন্ত্রাসী বাহিনী’ গড়ে তোলেন তিনি। যার নেতৃত্বে ছিল সম্প্রতি র্যাবের সঙ্গে বন্ধুকযুদ্ধে নিহত পেশাদার কিলার শফিক। আতাউরের এই বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়েছে বেশ বিছু সাধারণ মানুষ। ফলে তার বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পেতেন না। আতাউর কিছুদিন ধরে ম্যানচেস্টার কম্পোজিট নামে নির্মাণাধীন একটি কারখানা অবৈধভাবে দখলে নিতে মালিকপক্ষকে হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সুইডেন আতাউরের ‘সন্ত্রাসী বাহিনী’র নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন শহরের চৌয়ালা এলাকার নাজমুল মোল্লা। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি চিশতিয়া সাইজিং নামে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতাম। সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকের মোল্লা স্পিনিং মিলটি সুইডেন আতাউর জোর করে দখল করে নেয়। তার প্রতিবাদ করায় সুইডেন আতাউরের বাহিনীর কিলার শরীফ নির্যাতন করে আমার পা ভেঙে দেয়। ডাক্তার প্রথমে সেই পা কেটে ফেলতে বলেছিল, কিন্তু পরে অনেক কষ্ট করে সেই পা বাঁচিয়েছি।’
নিজ মালিকানাধীন সুইডেন প্লাজা গড়তে শহরের সাটিরপাড়া এলাকার মো. আজম খানের পৈতৃক জমি দখল করেন নেন আতাউর। জমি হারিয়ে এখন দিশেহারা আজম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুইডেন প্লাজা নির্মাণের সময় আমার দেড় শতাংশ জমি জোর করে সুইডেন আতাউর দখল করে নেয়। জমি ফিরে পেতে প্রশাসন ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। কিন্তু আতাউরের অবৈধ টাকা ও ক্ষমতার কারণে কেউ আমাদের সহযোগিতা করেনি।’
দখল হওয়া মোল্লা স্পিনিং মিলের চেয়ারম্যান আবদুল মতিন মোল্লা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুইডেন আতাউর আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে আমার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানটি দখল করে নিয়েছে। একইভাবে সে পার্শ্ববর্তী ম্যানচেস্টার কম্পোজিট নামে আরও একটি কারখানা অবৈধভাবে দখল করে নেয়। আর সে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেনকে প্রধান অতিথি করে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মিল দখলের বৈধতার সার্টিফিকেট নেয়। আমরা আমাদের হারানো মিল ফিরে চাই।’
