প্রথম দিনেই হোঁচট খেল নতুন সড়ক পরিবহন আইন

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০১৯, ০২:৩২ এএম

বিভিন্ন অপরাধে বড় ধরনের শাস্তির বিধান রেখে গতকাল শুক্রবার থেকে কার্যকর হয়েছে নতুন সড়ক পরিবহন আইন। তবে নতুন এ আইন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও কারিগরি সামর্থ্য গতকাল পর্যন্ত ছিল না পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের। এছাড়া নতুন আইন সম্পর্কে চালক ও পথচারীদের সচেতন করতে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের কোনো ধরনের প্রচার-প্রচারণাও লক্ষ করা যায়নি। সড়কের দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুরাতন আইন অকার্যকর হওয়ায় এবং নতুন আইন বাস্তবায়নের সক্ষমতা না থাকায় প্রথম দিন (শুক্রবার) গণপরিবহনের চালক ও পথচারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারেননি তারা। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন এ আইন কার্যকর করা সম্ভব হবে বলে দাবি করেছেন ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

ট্রাফিকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন আইনে পজ মেশিনের (পয়েন্ট অব সার্ভিস) মাধ্যমে মামলা করতে ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগবে। এছাড়া মানুষের সচেতনতার বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রচুর পথসভা, গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার এবং লিফলেট বিতরণ করার পরই আইনের বাস্তবায়ন করা শুরু হবে।

এদিকে নতুন আইন কার্যকরের পর সতর্ক অবস্থানে রয়েছে গণপরিবহনের চালকরা। ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেসসহ সব ধরনের কাগজপত্র যাদের রয়েছে তারাই শুধু রাস্তায় নেমেছে। এতে রাজধানীর সড়কে গতকাল গণপরিবহনের সংখ্যাও ছিল কম। সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারের করা এ নতুন আইনের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন দাবি করেছেন পথচারীরা। আগের মতোই যেন সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে পরিবহন শ্রমিকদের আন্দোলনের মাধ্যমে এ নতুন আইন বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা না হয়, সে বিষয়ে সরকারের সর্বোচ্চ মহলকে কার্যকরী ভূমিকা রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজউদ্দিন আহম্মেদ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকে পুরাতন আইন আর থাকবে না। আমরা পুরাতন আইন রদ করেছি। নতুন আইনের গেজেটটা হয়েছে খুব সম্প্রতি। এটা একটি জটিল বিষয় হওয়াতে প্রস্তুতি নিতে আমাদের সময় লাগবে। আমরা কালকে (শনিবার) আমাদের ৮০০ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেব। সফটওয়্যারের মাধ্যমে কার্যকর করতে মাসখানেক সময় লাগবে। আমরা পরশু দিন কাগজে প্রসিকিউশন সিøপ তৈরি করে ফিল্ডে ছেড়ে দেব।’

তিনি আরও বলেন, ‘সচেতনতা বৃদ্ধিতে আমরা ব্যাপক হারে প্রচার-প্রচারণা চালাব। মাইকিং করব, ফেইসবুক ও ওয়েব পোর্টালে দেব এবং লিফলেট বিতরণ করব। এছাড়া পরিবহন মালিক শ্রমিকদের নিয়ে মিটিং করব। আমরা কী করতে যাচ্ছি তা পরিবহন মালিক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষকে জানিয়েই করব।’

নতুন সড়ক আইন কার্যকরের প্রথম দিন তা কী প্রভাব ফেলেছে জানতে চাইলে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনটি বাস্তবায়িত হলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকটাই কমে যাবে। আইনটা যারা বাস্তবায়িত করবেন প্রথম দিন তারাও ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি। আমি মনে করি, আইনটা যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয় তাহলে সড়ক দুর্ঘটনার হার কমবে এবং সড়কে শৃঙ্খলাও ফিরবে।’

এদিকে গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, ট্রাফিক পুলিশ রাস্তার শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করলেও চালকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষ মামলা না করার নির্দেশ দিয়েছে বলে জানান তারা। কারণ হিসেবে বলছেন, বিদ্যমান ডিজিটাল মেশিনে নতুন আইনে মামলা করা সম্ভব না। এছাড়া ওয়েবসাইটেরও উন্নয়ন করতে হবে। গতকাল পর্যন্ত হাতে লেখা মামলার ফরমও পাননি ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা।

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডে সড়কের শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তা মো. মতিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজ (শুক্রবার) কোনো মামলা দেওয়া হয়নি। অনেক চালক আইন সম্পর্কে জানেন না। আরও প্রচার-প্রচারণা চালানো হবে। এছাড়া চালকরাও অনেক সতর্ক রয়েছে।’

একই সড়কে মিরপুর-আজিমপুর রুটে চলাচলকারী বিহঙ্গ পরিবহনের চালক মো. ইজাজুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাধারণত প্রতি ট্রিপে ২০০-৩০০ টাকার মামলা খেতে হতো। আজ (গতকাল শুক্রবার) দুপুর পর্যন্ত কোনো মামলা খেতে হয়নি। আর যাদের কাগজপত্রে সমস্যা আছে তারা আজ রাস্তায় নামেনি।’ ওই সড়কেই চলাচল করা ঠিকানা পরিবহনের চালক কামাল হোসেন বলেন, ‘নতুন আইন সম্পর্কে আমরা তেমন জানি না। যেসব বাস ও চালকের কাগজ ঠিক আছে তারাই রাস্তায় নেমেছে।’

বকশিবাজার মোড়ে দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তা মো. জোব্বের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন আইন কার্যকরের জন্য ডিজিটাল মেশিনের ওয়েবসাইট আপডেট করতে হবে। মেশিনে নতুন আইন ডাউনলোড করা যাচ্ছে না। তাছাড়া নতুন আইন কার্যকর করার কোনো নির্দেশনাও আমরা পাইনি।’ একই জায়গায় দায়িত্ব পালন করা ট্রাফিক পুলিশের আরেক কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ বলেন, ‘যেসব চালকের লাইসেন্সে সমস্যা রয়েছে তারা রাস্তায় নামেনি। এছাড়া সিগন্যাল দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চালকরা তা মানছে।’

গতকাল দুপুর ২টার দিকে রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে কথা হয় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মামুন শেখের সঙ্গে। তিনি খানিকটা ক্ষোভ প্রকাশ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের দেশে কত আইন রয়েছে, কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। প্রতিদিনই প্রাণ ঝরছে সড়কে।’ নতুন আইন সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে কতটা কার্যকর হবে এমন প্রশ্নের জবাবে মামুন বলেন, ‘শুধু আইন দিয়ে শৃঙ্খলা ফিরবে বলে মনে হয় না। এজন্য দরকার উভয়পক্ষের আন্তরিকতা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সততাও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের উচিত বিষয়গুলো আন্তরিকতার সঙ্গে দেখা।’

শাহবাগ মোড়ে দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক কর্মকর্তা মো. আবু জাফর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সীমাবদ্ধতার কারণে আজ (শুক্রবার) আইন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। কাল (শনিবার) থেকে বাস্তবায়ন হতে পারে। তবে নতুন আইন কার্যকর হওয়ার পর সড়কের অবস্থা অনেকটা ভালো। যেসব চালকের সমস্যা আছে তারা রাস্তায় বের হয়নি।’

বিকল্প অটো সার্ভিসের চালক সাগর বলেন, ‘আজ (শুক্রবার) এখনো মামলা খাইনি। গাড়ির কাগজপত্র সব ঠিক আছে।’

বাংলামোটরে দায়িত্বপালনকারী ট্রাফিক কর্মকর্তা রাসেল রেজা বলেন, ‘ডিজিটাল মেশিনে নতুন আইনে মামলা করা যাচ্ছে না। পুরাতন আইনে মামলা করার প্রশ্নই আসে না। এজন্য মামলা করতে অফিশিয়ালি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এছাড়া হাতে লেখা মামলার ফরম এখনো পাইনি।’

দেশব্যাপী নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে সরকার ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর নতুন সড়ক পরিবহন আইন পাস করে। কিন্তু মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর চাপে এটি তাৎক্ষণিক কার্যকর করতে পারেনি। আইন করার এক বছরেরও বেশি সময় পর গতকাল থেকে তা কার্যকর হয়েছে।

নতুন এ আইনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো সড়কে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দায়ে চালকের শাস্তির বিধান। এ ক্ষেত্রে দায়ী চালকের সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সাজা বা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া যদি ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মানুষের মৃত্যু হয়েছে তদন্তে এমন প্রমাণিত হয়, তাহলে ফৌজদারি আইনের ৩০২ ধারায় মামলা স্থানান্তর হবে। অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডের সুযোগও থাকছে। এছাড়া ৩০২ ধারার অপরাধ অজামিনযোগ্য। পুরনো আইনটিতে এ অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল তিন বছরের কারাদণ্ড ও জামিনযোগ্য। এছাড়া বিভিন্ন অপরাধের শাস্তিও কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত