ধূসর দিল্লির পেছনে সবুজ বিপ্লব

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০১৯, ১১:২৯ পিএম

ধোঁয়াশায় দমবন্ধ অবস্থা ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির। নগরের বাতাস এতটাই বিষাক্ত হয়ে উঠেছে যে, কর্তৃপক্ষ জনস্বাস্থ্য বিষয়ক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছেন। নয়াদিল্লির স্কুলগুলোতে বিতরণ করা হচ্ছে ৫০ লাখ মাস্ক। আপাতত কয়েকদিন বন্ধই রাখা হচ্ছে স্কুলগুলো।

বাতাসের মান ভয়াবহ (সিভিয়ার) পর্যায়ে নেমে আসায় সুপ্রিম কোর্টের দায়িত্ব দেওয়া একটি প্যানেল নয়াদিল্লি আর পার্শ্ববর্তী দুটি রাজ্যের ওপর বেশকিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। নয়াদিল্লির বাতাসে ভাসমান বস্তুকণার পরিমাণ এখন বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সর্বোচ্চ মাত্রার প্রায় ২০ গুণ বেশি!

বায়ুদূষণ মোকাবিলায় সব নির্মাণকাজ এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। নিষিদ্ধ করা হয়েছে আতশবাজি পোড়ানো। আর সোমবার থেকে দিল্লিতে আবার জোড়-বিজোড় নম্বরের ভিত্তিতে গাড়ি চলবে। গাড়ির ধোঁয়াজনিত দূষণ কমাতেই এ সাময়িক পদক্ষেপ। নয়াদিল্লি বছরকয়েক আগে প্রথম এ ব্যবস্থা চালু করেছিল। ভয়াবহ বায়ুদূষণের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ঘরে বসে কাজ করতে বলা হয়েছে। দিল্লির অধিবাসীরা ক্ষুব্ধ। তাদের বক্তব্য, বছরের পর বছর ধরে একই অবস্থা চলছে। দু’ বছর আগেই শীতের শুরুতে এরকম অবস্থা হওয়ায় দিল্লির কাছের গুরগাঁওয়ের হাসপাতালগুলোতে রোগীদের মাস্ক দেওয়া হয়েছিল। পৌরসভার কর্মী ও ঝুঁকিতে থাকা শ্রেণির মানুষকে গত কয়েক বছরে বিনামূল্যে হাজার হাজার উচ্চমানের এন৯৫ মাস্ক দেওয়া হয়েছে। হতাশ এক দিল্লিবাসীর কথা: ‘ অবস্থা এত খারাপ হবে তা বুঝতে পারিনি। আমরা কি চাই আমাদের শিশুরা এই পরিবেশে বেড়ে উঠুক? আসলে কারও এদিকে নজর নেই। কেউ পরিস্থিতি উন্নতি করতে আগ্রহী নয়।’

ভারতের রাজধানীতে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়েছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। বিবিসির এক সাংবাদিক (ভারতীয়) তার একটি প্রতিবেদনের শুরুতে মন্তব্য করেছিলেন, দূষণের জন্য স্বর্ণপদকের ব্যবস্থা থাকলে দিল্লিকে হারানো কঠিন হবে! খোদ মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ভাষায়, এ মহানগর এখন হয়ে পড়েছে ‘গ্যাস চেম্বার’। গাড়ির সংখ্যা বহুগুণে বেড়ে যাওয়া অবশ্যই একটা কারণ। দিল্লির আশপাশের কলকারখানাগুলোও কম দায়ী নয়। মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল এজন্য দায়ী করছেন পাশের রাজ্যে কেটে নেওয়া ফসলের গোড়া পোড়ানোকে। এবং তার কথাই হয়তো মোটের ওপর সঠিক।

অভিজ্ঞতা বলছে, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে দিল্লির বাতাসের অবস্থা বছর বছর আরও বেশি খারাপ হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে পাশের পাঞ্জাব ও হরিয়ানা রাজ্যের কৃষকদের খড় পোড়ানো। তারা এসময় নুতন শস্য চাষের জন্য মাঠ পরিষ্কার করতে কেটে নেওয়া ফসলের গোড়া পুড়িয়ে দেন। এ সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের বার্ষিক ধর্মীয় উৎসব দিওয়ালিতে পোড়ানো বিস্তর আতশবাজির ধোঁয়া পরিস্থিতিকে করে তোলে আরও সঙ্গীন। অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে নির্মাণকাজের ধূলিকণা, কারখানা ও গাড়ির ধোঁয়া। তবে বলা হচ্ছে, ক্ষেতে লাগানো আগুনের ধোঁয়াই এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ‘আসামি’।

ভারতের উত্তরাঞ্চলের বিশ লাখের বেশি কৃষক প্রতি শীত মৌসুমে প্রায় আশি হাজার বর্গকিলোমিটার চাষের জমির খড় পুড়িয়ে দেন। তার ওজন ২ কোটি ৩০ লাখ টন! ভাসমান বস্তুকণা, কার্বন ডাই অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড আর সালফার ডাই অক্সাইডের এক বিপজ্জনক মিশেল এই খড়ের ধোঁয়া। স্যাটেলাইট উপাত্ত বিশ্লেষণ করে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা বের করেছেন, ২০১২ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সময়ে দিল্লির বায়ুদূষণের প্রায় অর্ধেকের জন্যই দায়ী ছিল ধানের গোড়া পোড়ানো। এই খড় পোড়ানো এত ব্যাপক যে, তা নাসার স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবিতে পর্যন্ত দেখা যায়। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১১ সালে শুধু খড় পোড়ানোর দূষণ থেকে ৪০ হাজারের বেশি অকালমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

গত বছর দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়ালের মিডিয়া উপদেষ্টা নগেন্দ্র শর্মা স্বচক্ষে বিষয়টি দেখেন। সিমলা থেকে হরিয়ানার ভেতর দিয়ে দিল্লি ফেরার পথে তিনি একদিন দেখেন পথের পাশে মাঠে যেন আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাতাসে ভাসছে ঘন ধোঁয়া। নগেন্দ্র শর্মা কৌতূহলী হয়ে গাড়ি থামিয়ে লোকজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন, ধানের গোড়া তোলার মোটা খরচ থেকে রেহাই পেতেই এ কাজ করা হয়েছে। কারণ ধান কেটে নেওয়ার পর তিন সপ্তাহের মধ্যেই গম চাষের জন্য মাটি তৈরি করতে হবে। এই হরিয়ানা রাজধানী দিল্লি থেকে মাত্র ৭০ কিমি দূরে।

দিল্লির অবস্থাটা কিন্তু বরাবর এমন ছিল না। কেজরিওয়ালের মিডিয়া উপদেষ্টা নগেন্দ্র শর্মার মতে, রাজধানীর জন্য অভিশাপ হয়ে ওঠা এ ধোঁয়ার জন্য দায়ী ভারতের ১৯৬০ ও ১৯৭০ এর দশকের ‘সবুজ বিপ্লব’। ভেঙে বললে সবুজ বিপ্লবের ফলে কৃষিকাজ ও সরকারি নীতির যে বিবর্তন আর শ্রমবাজারে যে পরিবর্তন ঘটে তা-ই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। সবুজ বিপ্লবের ফলে একসময়ের অনাহারপীড়িত ভারতে খাদ্যাভাব দূর হয়। উত্তরের পাঞ্জাব ও হরিয়ানা পরিণত হয় দেশের খাদ্যভা-ারে। কৃষকদের জন্য সরকারের বিভিন্ন সহায়তা, প্রযুক্তি, সেচের প্রসার কৃষি উৎপাদনে বিপ্লব আনে। অতুলনীয় ওই সাফল্য ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেও পরিবেশকে এজন্য মূল্য দিতে হয়েছে। শুধু খড় পোড়ানোর কারণে বায়ুদূষণ নয়, সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ভা-ার ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ‘দ্য গ্রেট স্মগ অব ইন্ডিয়া’ বইয়ের লেখক সিদ্ধার্থ সিং বলেছেন, কৃষিবিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। কিন্তু চাষাবাদের সময়, সরকারের নীতি আর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামা ইত্যাদি সব মিলিয়ে এক ‘কৃষি-প্রতিবেশগত’ সংকটেরই সৃষ্টি হয়েছে।

পাঞ্জাব-হরিয়ানার কৃষকরা ধানের গোড়া পোড়াতে বাধ্য হচ্ছেন কারণ ‘কমবাইন হার্ভেস্টার’ যন্ত্রে ফসল কাটার পর গোড়ায় যতটা থাকে তা হাতে ধান কাটলে যেমন হতো তার চেয়ে বেশি লম্বা ও ধারালো। কৃষকদের গায়ে যেমন আঘাত লাগে তেমনি তা গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করাও অসুবিধাজনক। আবার এ গোড়াগুলো না সরানো হলে ধানের চারা লাগানোর যন্ত্র কাজ করতে পারে না। তাই স্রেফ আগুন ধরিয়ে দেওয়াই কৃষকদের কাছে সহজ মুশকিল আসান।

সিদ্ধার্থ সিংয়ের হিসাবে ভারতে ২৬ হাজারের মতো (গত বছরের হিসাব) কমবাইন হার্ভেস্টার আছে যার বেশিরভাগই ব্যবহৃত হয় উত্তর ভারতে। সরকার এ সমস্যার সমাধানে ‘হ্যাপি সিডার’ পদ্ধতি প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছে। হ্যাপি সিডার হচ্ছে ট্রাক্টরে বসানো যন্ত্রাংশ যা পুরনো খড়ে আটকে না গিয়ে গমের বীজ বোনায় সহায়তা করে। কিন্তু এটি একটু ব্যয়বহুল দাম প্রায় দেড়লাখ রুপি। তেলও অনেক খায়। ভারতের হাজারো ছোট কৃষকের জন্য তা নাগালের বাইরে। ‘সুপার স্ট্র ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ নামে আরেকটি কার্যকর যন্ত্র আছে যেটি খড় সমানভাবে কুচি কুচি করে। কিন্তু দামের কারণে এটিও বেশিরভাগ চাষির নাগালের বাইরে।

সিদ্ধার্থ সিংয়ের মতে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে খড় পোড়ানো পুরোপুরি বন্ধ করতে চাইলে বছরে প্রায় ১২ হাজার ‘হ্যাপি সিডার’ লাগবে। এজন্য দরকার এক দ্বিতীয় কৃষি বিপ্লব। এবারের বিপ্লব হতে হবে প্রযুক্তিভিত্তিক। তা যে পর্যন্ত না হবে সে পর্যন্ত প্রায় দুই কোটি দিল্লিবাসীর ধোঁয়াশার কবল থেকে মুক্তি নেই।

বিবিসি অবলম্বনে

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত