বিভিন্ন শাখা ও সহযোগী সংগঠনে বিতর্কিত এবং অনুপ্রবেশকারীরা যেন কমিটিতে আসতে না পারেন সে জন্য আওয়ামী লীগের সাচ্চা কর্মীদের মধ্যে অনেক দিন ধরেই দাবি-ক্ষোভ চলছিল। কিন্তু বিষয়টি হালে পানি পায়নি। বিতর্কিত ব্যক্তিরাই বিভিন্ন কমিটিতে পদপদবি বাগিয়ে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছেন। সম্প্রতি কিছু কিছু বিতর্কিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে দলীয় ও প্রশাসনিক অ্যাকশন শুরু হয়েছে। বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারী ব্যক্তিরা যাতে আগামী দিনে কোনো ধরনের পদপদবি না পান, সেটা নিশ্চিত করতে তাদের একটি তালিকাও নাকি প্রণয়ন করা হয়েছে।
দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীদের যে তালিকা তৈরি করেছেন, তাতে দেড় হাজার জনের মতো নাম রয়েছে।’ অনুপ্রবেশকারীদের পরিচয় তুলে ধরে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক শক্তি থেকে যারা আসে, চিহ্নিত চাঁদাবাজ, চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী, চিহ্নিত ভূমিদস্যু, যাদের ইমেজ খারাপ, যাদের রাজনীতি জনগণের কাছে খারাপ এরাই অনুপ্রবেশকারী।’
দল থেকে বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারী ব্যক্তিদের বিতাড়নের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু এই দেড় হাজার ‘অনুপ্রবেশকারী’ ব্যক্তিই কি খারাপ? দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও কি অনেকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ভূমি দখল, হত্যা-খুন ইত্যাদি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নন? তাদের ক্ষেত্রে দল কী উদ্যোগ গ্রহণ করবে? যারা দলের নাম ব্যবহার করে ক্ষমতা ও দাপট দেখিয়ে নানা অপকর্মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন, দল কি তাদের জবাবদিহির আওতায় আনবে? আর তা যদি না হয়, তাহলে কেবল ‘দেড় হাজার বহিরাগত’ ব্যক্তির তালিকা করে, তাদের পদবঞ্চিত করে সব সমস্যার সমাধান হবে?
সবচেয়ে বড় কথা, গত কয়েক দশকে রাজনীতিকে ‘লাভজনক ব্যবসায়’ পরিণত করা হয়েছে। বিভিন্ন রকম অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে রাজনীতির মানুষগুলো (বিশেষত ক্ষমতাসীনরা) প্রায়ই আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যান। প্রশাসন-দল সবাই এ ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকে। ফলে বিভিন্ন অসাধু উপায়ে ছোটখাটো নেতাকর্মীরাও শত শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। গত দেড় মাসে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে একে একে যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, যুবলীগ নেতা জি কে শামীম, ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট এবং তার সহযোগী এনামুল হক ওরফে আরমান, কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা শফিকুল ইসলাম ফিরোজ, অনলাইন ক্যাসিনোর হোতা সেলিম প্রধান এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান, তারেকুজ্জামান রাজীব ও ময়নুল হক মঞ্জুকে গ্রেপ্তার করা হয়। যুবলীগের প্রভাবশালী চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দিয়ে তার পরিবারের সব ব্যাংক হিসাব স্থগিত এবং বিদেশযাত্রার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ব্যাংক হিসাব স্থগিত করে বিদেশযাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনেরও। বহিষ্কার করা হয়েছে যুবলীগের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আনিসুর রহমান ও ঢাকা দক্ষিণের যুগ্ম সম্পাদক কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদকে। পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি মোল্লা আবু কাউছার ও সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেব নাথ এমপিকে।
যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের ব্যাংক হিসাব তলব এবং বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, তাদের সম্পর্কে নানা অপকর্মের তথ্য জানা যাচ্ছে। যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের প্রায় প্রত্যেকেই অবৈধভাবে শত শত কোটি টাকা, এমনকি হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। এমন নেতার সংখ্যা আওয়ামী লীগে কত? দেড় হাজার? না লাখ লাখ? তাদের সবাইকে কি আইনের আওতায় আনা হবে? ভবিষ্যতে কেউ যেন অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা উপার্জনের সুযোগ না পান, সেই পথ কি বন্ধ করা হবে? তাহলে সেই পথ কী? তেমন উদ্যোগই-বা কোথায়?
দুই.
আওয়ামী লীগের কিছু কিছু নেতার এই অদম্য ‘টাকার ক্ষুধা’ দেখে মনে কেবল একটি প্রশ্ন মনে জাগছে, তা হলো, একজন মানুষের কত টাকা প্রয়োজন? এক কোটি, দশ কোটি, একশ কোটি, হাজার কোটি? নাকি অফুরন্ত?
আজ থেকে বহু বছর আগে বিশ্বখ্যাত রুশ সাহিত্যিক লিও টলস্টয় ‘হাউ মাচ ল্যান্ড ডাজ এ ম্যান রিকয়্যার’ শীর্ষক এক প্রসিদ্ধ গল্প লিখেছিলেন। গল্পটি এ রকম, এক দিন এক দরিদ্র মানুষ এসে রাশিয়ার সম্রাটের কাছে বললেন, তার কোনো জমিজমা বা খেটে খাওয়ার মতো কোনো সম্পদ নেই। তিনি চলতে পারছেন না। তখন সম্রাট তাকে বিশাল এক প্রান্তরে নিয়ে গিয়ে বললেন, সামনে যা জমি আছে, সব আমার। তুমি এই সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দৌড় দিয়ে যতটুকু জমির চারধারে ঘুরে আসতে পারবে, ঠিক ততটুকু জমি তোমার হবে।
দরিদ্র মানুষটি অমনি দৌড় শুরু করল। যত দূর যাবে, সে তত জমির মালিক হবে। তার অনেক অনেক জমি চাই। সে দৌড়াচ্ছে আর ভাবছে, আর একটু, আর একটু। আর একটু হলে বেশি চাষাবাদের জমি পাওয়া যাবে, অন্যকে বর্গা দিয়ে নিজে বসে খেতে পারবে। তারপর আবার একটু দৌড় দিয়ে ভাবে, ‘আরও একটু বেশি জমি থাকলে বাড়িটা পাকা করা যাবে, সম্রাট তো বলেছে, যতটুকু জমি সূর্যাস্ত পর্যন্ত দৌড়ে সীমানা দিয়ে ঘুরে আসতে পারব, ততটুকুই আমার। ওঃ বড্ড ক্লান্ত হয়েছি। একটু জিরিয়ে নিই। সামান্য জিরিয়ে নেওয়ার পরই সে ভাবে আজ আমার বিরতি নেওয়ার দিন নয়, আজ আমার বিজয়ের দিন, যতটা খাটব, ততটা পাব, সুতরাং দে দৌড়, আজ কোনো বিরতি নেই।’ সে দৌড়িয়েই চলছে। দৌড় দিয়ে সে জমিগুলোর অনেক ভেতরে প্রবেশ করেছে, যেখান থেকে সম্রাটের রাজ্য দেখাই যায় না। এদিকে সূর্য প্রায় ডুবু ডুবু। এখন তার ফেরার পালা। সে ডানদিকে ঘুরে একটি আয়তক্ষেত্র আঁকার চেষ্টা করল। সূর্য পশ্চিমে আরও হেলে পড়েছে। এবার তার ফিরতে হবে। সে দৌড় দিল। সূর্য ক্রমাগত পশ্চিমে নেমেই আসছে। সে আরও দ্রুত দৌড়াতে শুরু করল। সূর্য পশ্চিম দিগন্ত প্রায় ছুঁই ছুঁই করছে, তার আর সময় নেই, তাকে সম্রাটের প্রাসাদের সীমানায় যেতে হবে। সে আরও জোরে দৌড়াচ্ছে। কিন্তু লোকটি সীমানা প্রাচীরের কাছে এসেই আর টিকে থাকতে পারল না। দড়াম করে পড়ে গেল! বুকের ভেতর থেকে শেষ বাতাসটুকু বেরিয়ে গেল। লোকটি মারা গেল। কিন্তু কী পেল সে? এখানেই পাঠকরা লেখক টলস্টয়কে বলে ঋষি লেখক। আর ঋষি লেখক টলস্টয় তার এ লেখার মধ্য দিয়ে মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, একজন মানুষের প্রকৃতপক্ষে কতটুকু জমি প্রয়োজন?
উল্লিখিত গল্পটি আমরা শিক্ষিত মানুষরা প্রায় সবাই জানি। কিন্তু না, আমরা কারও কাছ থেকে কিছু শিখিনি। শিখেছি কেবল মেরে দেওয়ার, আত্মসাৎ করার শিক্ষা। যার সুযোগ যত বেশি, সে এখানে তত বড় চোর। আমাদের সবখানে ঘুষ লাগে। দুর্নীতি ছাড়া আমাদের প্রশাসন অচল। সমাজ-সংসার সব অচল। আমরা মুখে বড় বড় বুলি উচ্চারণ করি। কিন্তু বাস্তব জীবনে একেকজন অসততার প্রতিমূর্তি। যে যেভাবে পারছি, মেরে, কেটে, আত্মসাৎ করে কেবল ধনসম্পত্তি বাড়ানোর ধান্দা করছি। যে প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তি অত্যন্ত ডাটের সঙ্গে জীবন চালায়, আমরা তার অর্থের উৎস কখনো জিজ্ঞেস করি না। যে কর্মকর্তার স্ত্রী দামি শাড়ি-গহনা পরে, সন্তানদের বিলাসী জীবনে তামিল দেয়, সে নিজেও কখনো এই বিলাসের উৎস জিজ্ঞেস করে না। আমরা দামি বাড়ি-গাড়ি-ফ্ল্যাট-জমির মালিক হই। কিন্তু আয়ের উৎস প্রকাশ করি না। তার দরকারও হয় না! আমাদের ফুটানি চলে অবৈধ আয়ে। কিন্তু এসবের কোনো জবাবদিহি নেই। আমাদের দেশে দামি রেস্তোরাঁয় কারা যান? কারা দামি গাড়ি ব্যবহার করেন? কারা দামি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন, কাদের সন্তানরা দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করেন? কারা কারণে-অকারণে বিদেশ সফর করেন? কারা নামে-বেনামে ফ্ল্যাট-বাড়ির মালিক হন? কারা বিদেশে টাকা পাচার করেন? বিদেশে জমির মালিক হন? তাদের আয়ের উৎস কী? টাকা কোত্থেকে আসে? কে কত টাকা ট্যাক্স দেন? এসব ব্যাপারে আমরা ভীষণ উদার। আমাদের সরকার বাহাদুর আরও উদার। যারা নানা ফিকিরে অবৈধ টাকায় ‘করে-কম্মে’ খাচ্ছেন, সরকার তাদের টুটি টিপে ধরা তো দূরের কথা, পারলে ন্যাপকিন টিসু এগিয়ে দেয়!
আমাদের দেশে দুর্নীতির বিষবৃক্ষের বৃদ্ধিতে যে বস্তুটি সার হিসেবে কাজ করেছে, তার নাম লোভ। দুই অক্ষরের এই শব্দটি বাংলাদেশের মানুষকে গ্রাস করতে উদ্যত। আমাদের সম্মিলিত লোভাগ্নির কাছে নীতিনৈতিকতা-আদর্শ সব আজ জ্বলে-পুড়ে ছাই। পাওয়া আর পাইয়ে দেওয়ার নেশা, অবৈধ উপায়ে টুপাইস কামানো, আবার অবৈধ টাকার জোরে সেই দুর্নীতির ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়া, এই চক্রে আমাদের জাতীয় জীবন বাঁধা পড়ে গেছে। লোভ-মোহ-প্রলোভনে পড়ে আমরা হিতাহিত জ্ঞান বিসর্জন দিয়ে কেবল টাকার বস্তার দিকে ছুটছি।
কোথাও কোনো রক্ষাকবচ নেই। যাদের ন্যায় প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব, তারা নিজেরাই অন্যায়ের সমুদ্রে নিমজ্জিত। লোভের পরিণাম বিষয়ে শাস্ত্রে এবং প্রবচনে সেই আদিকাল থেকে বিভিন্ন সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়ে আসছে। তবু লোভ দুর্মর! আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ক্রমবর্ধমান লোভের মুখে লাগাম টানতে কেবল দেড় হাজার জনের তালিকা নয়, আরও অনেক কিছুই করা দরকার। ক্ষমতাসীনরা, আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব তেমন কিছু করতে আদৌ চান কি?
লেখক
লেখক ও কলামনিস্ট
