প্রবাসী শ্রমিকদের যেন মর্যাদাহানি না হয়

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০১৯, ১১:৩৫ পিএম

সম্প্রতি সৌদি আরব থেকে নারীকর্মীদের নিপীড়ন এবং এমনকি আত্মহত্যার ঘটনা খুবই উদ্বেগজনক। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ব্যুরো অব ম্যান পাওয়ার এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং (বিএমইটি)-এর তথ্য মতে, ১৯৯১ থেকে ২০১৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশে ৭ লাখ ৩৫ হাজার ৫৭৫ জন নারীকর্মী গেছেন। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরবেই গেছেন ২ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩১ জন। একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নির্যাতনের কারণে তিন বছরে কমপক্ষে পাঁচ হাজার নারী সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে এসেছেন। চলতি বছরের প্রতি মাসে গড়ে ২০০ নারী শ্রমিক দেশে ফিরেছেন। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ এবং জেদ্দায় সেফ হোমগুলোতে প্রতি মাসে গড়ে আশ্রয় নিচ্ছেন ২০০ নারী শ্রমিক।

এসব তথ্যই বলে দিচ্ছে নির্যাতনের মাত্রা কত ভয়াবহ। এ নিয়ে সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সৌদি ফেরত নারীকর্মীরা বলছেন, হাতেগোনা কিছু বাড়ির কর্মী ছাড়া অধিকাংশ নারীকর্মীই নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। নির্যাতন সইতে না পেরে পালিয়ে আসছেন, আবার অনেকেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছেন। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে নারী গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগ পুরনো ও সর্বজনবিদিত এবং এ পরিপ্রেক্ষিতে কোনো কোনো দেশ, যেমন ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কা সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিক পাঠানো কমিয়ে দিয়েছে।

২০১৬ সাল থেকে গত জুন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৩১১ নারী শ্রমিকের লাশ বাংলাদেশে আনা হয়েছে।  এদের অধিকাংশই সৌদি আরব থেকে এসেছে। সব থেকে ভয়াবহ হলো, এদের মধ্যে ৫৩ জনই আত্মহত্যা করেছেন। এর থেকে দ্বিগুণেরও বেশি, ১২০ জন স্ট্রোকে এবং ৫৬ জনের দুর্ঘটনায় মৃত্যু ঘটেছে।  বিদেশগামী নারীদের বেশির ভাগের বয়স ২০ থেকে ৪০-এর মধ্যে। সুতরাং ১২০ জন নারীর স্ট্রোকে মৃত্যু উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো সংবাদ।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মনে করে, বিদেশি নারী শ্রমিকদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বাংলাদেশিদের।  খালেদা আখতারের কথাই ভাবুন। ২৮ বছরের মেয়েটি দেশে ফিরেছেন, সারা গায়ে ব্যান্ডেজ জড়ানো। যে বাসায় তিনি কাজ করতেন, সেই গৃহকর্তা তাকে দু-দুবার পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিলেন। পরে বাংলাদেশ সরকারের ব্যবস্থাপনায় ‘নিরাপদ গৃহে’ আশ্রয় পেলে তিনি জানে বেঁচে যান। আসিয়া বেগম নামের আরেক নারী শ্রমিক জানিয়েছেন, চার মাস তিনি উপসাগরের একটি দেশে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন। এই চার মাসে এক পয়সাও বেতন পাননি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আসমা নামের একটি মেয়ের কথা বলেছে, অসহ্য হয়ে তিনি দেশে ফিরে যেতে চাইলে তার রিক্রুটিং এজেন্ট তাকে বেত দিয়ে ৫০ বার আঘাত করে।

আজকের বৈশ্বিক বাস্তবতায় এক দেশের মানুষ অন্য দেশে গিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা খুবই স্বাভাবিক। এটা কেবল রাষ্ট্রের স্বীকৃতি ও সহযোগিতায় হয়ে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বৈধভাবে থাকার উপায় হচ্ছে পাসপোর্ট ও ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে থাকা। সেক্ষেত্রে উভয় রাষ্ট্রের সম্মতিও প্রয়োজন।  এর অর্থ নিয়োগকর্তা এবং তার রাষ্ট্র সমস্তটা নিয়ে নিয়োগকর্তার সঙ্গে আছে। তাকে সব ধরনের আইনি সহায়তা প্রদান করে। সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকের নিজস্ব দেশের দূতাবাস সব ধরনের আইনি সহায়তা নিয়ে সঙ্গে থাকে। তার মানে দুই পক্ষই একা নয়, সঙ্গে তার স্ব স্ব রাষ্ট্র হাজির আছে। তাই কোনো অন্যায়ের নিপীড়নের ঘটনার বিচার হয়। কিংবা দূতাবাসের সহযোগিতায় একটা সুরাহা হয়, যাতে দ্বিতীয়বার না ঘটে।  এভাবেই প্রবাসীদের পাশে থাকে তার জাতিরাষ্ট্র।

কিন্তু কেন বাংলাদেশি প্রবাসীদের সঙ্গে এমন অন্যায় হচ্ছে, বিশেষ করে নারীকর্মীদের সঙ্গে কেন যৌন নিপীড়নসহ নানা অমানবিক নির্যাতন হচ্ছে? তাহলে কি আমাদের কর্মীরা এই প্রবাসী জীবনে তার জাতিরাষ্ট্রকে সঙ্গে পাচ্ছে না? পররাষ্ট্রনীতিতে জোরদারভাবে প্রবাসীদের মানবিক অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে না? নাকি নতজানু পররাষ্ট্রনীতির শিকার হচ্ছে নারী-পুরুষ নির্বিচারে প্রবাসী কর্মীরা?

এভাবেই হাজার হাজার প্রশ্ন জাগে প্রবাসীদের মনে। দূর পরবাসে জাতীয় দূতাবাসের আচরণ অনেকটা বিজাতীয় মনে হয়। যেসব প্রতিষ্ঠান প্রবাসীদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত, তাদের চরম অবহেলা প্রদর্শিত হয়। তাদের ওপর প্রবাসীরা আস্থা রাখতে পারেন না। যদি ধরে নিই যে, শুধু রেমিট্যান্সের প্রতি রাষ্ট্রের মনোযোগ, তাহলেও এই খাতে নিবেদিত নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে আর ইনিয়ে বিনিয়ে কথার ফুলঝুরি না সাজিয়ে দূতাবাসগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার। প্রবাসীদেরও সচেতন হয়ে নিজেদের পারস্পরিক সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবে। দূতাবাসের জবাবদিহির জন্য চাপ সৃষ্টি করতে হবে। কোনো রাষ্ট্র যদি নিরাপত্তা ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করতে সম্মত না হয়, সে দেশে কর্মীদের পাঠানো বন্ধ রাখুন।

আর যারা প্রবাসীদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে লিখছেন, কথা বলছেন কিংবা রাস্তায় দাঁড়াচ্ছেন, আপনাদের প্রতি অনুরোধ করছি যে, জাজমেন্টাল পপুলিস্ট কথাবার্তা বলে হালকা জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা থেকে বিরত থাকুন। হাজার হাজার নারীকর্মী বিদেশে কাজ করছে এটা আমাদের দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা। প্রবাসী শ্রমিকদের প্রতি রাষ্ট্রীয় অবহেলার প্রতিবাদ জরুরি। কিন্তু বিষয়টাকে সামগ্রিক বাস্তবতা থেকে না ভেবে কিংবা কোনো ধরনের গবেষণা না করে যৌন নিপীড়নকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, (যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবশ্যই দাঁড়াতে হবে) মনে হচ্ছে নারী শ্রমিকরা জেনেশুনে সেখানে যাচ্ছেন। এই ইস্যুতে আন্দোলন কিংবা লেখালেখি যা চোখে পড়ল তাতে সমস্যা সমাধানের কোনো বক্তব্য উঠে আসেনি বরং কাটা গায়ে নুনের ছিটার মতো। এর ফলে যে লক্ষ লক্ষ নারী শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্য তথা বিদেশে কর্মরত রয়েছেন, তাদের সামাজিক জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলা হচ্ছে।

দূতাবাসগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারার কারণে এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। এই দায় রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। সেক্ষেত্রে গৃহকর্মী পাঠানোর সিদ্ধান্ত যদি ভুল হয়, যদি পররাষ্ট্রনীতি দুর্বল হয়ে থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে সরব হতে হবে। সর্বোপরি অমর্যাদাপূর্ণ আচরণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। তবে যারা আছে তাদের মর্যাদাহানি করে কোনোভাবেই এই প্রতিবাদ কাম্য নয়। সুতরাং রাজনৈতিক পপুলারিজমের ধারণা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে ‘যৌনদাসী’ ‘দেহ ব্যবসা’ এসব শব্দ ব্যবহার করে তুলনামূলকভাবে ভালো থাকা, পরিবারের হাল ধরে রাখা নারীকর্মীদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলবেন না।

লেখক : সভাপ্রধান, ‘স্বপ্নপথ’ সাহিত্য সংগঠন

আবুধাবি, সংযুক্ত আরব আমিরাত

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত