অতি সম্প্রতি গণমাধ্যমে খুব ভালো একটা খবর চোখে পড়ল। খবরটি হচ্ছেÑ কর্মস্থল, এয়ারপোর্ট, বাসস্ট্যান্ড, রেলওয়ে স্টেশন, শপিংমলের মতো জনসমাগমস্থলে এবং সরকারনিয়ন্ত্রিত, পরিচালিত ও ব্যবস্থাপনায় বিধিবদ্ধ, স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে ‘ব্রেস্ট ফিডিং’ ও ‘বেবি কেয়ার কর্নার’ স্থাপনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট। সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে জীবনধারণের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। তারমধ্যে মায়ের দুধপান শিশুর মৌলিক অধিকার। দুধপানের অভাবে শিশু খর্বকায় হচ্ছে, এমন তথ্য আদালতে তুলে ধরা হয়। এ ছাড়া জনসমাগম স্থলে ‘স্মোকিং জোন’ থাকলেও ‘ব্রেস্ট ফিডিং’ ও ‘বেবি কেয়ার কর্নার’ নেই, যা বৈষম্যমূলক। এই যুক্তিতে রিটটি করা হলে আদালত এসব রুল দেয়। এটা ভালো খবর। বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে। এ নিয়ে কিছু লেখালেখি হয়েছে। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে অবশেষে আদালত বেশ কিছু বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছে। আমরা চাই বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করা হোক। কেননা এগুলো শিশুর জন্য, দেশের জন্য ইতিবাচক। শিশুর অধিকার সুরক্ষায় আমাদের এখনো অনেক কিছুই করা বাকি রয়েছে। সেসব দায়িত্ব পালনে আমাদের আরও অনেক বেশি উদ্যোগী হতে হবে।
পাবলিক পরিবহনে, স্টেশন বা বিশ্রামরত স্থানে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য আলাদা ¯েপস বা জায়গা নেই। ফলে শিশুর চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বেশিরভাগ মা লোকলজ্জায় শিশুকে বুকের দুধ পান করাতে চান না বা পান করান না। এতে শিশুটি মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শিশু পুষ্টির অভাবে ভুগছে। ফলে রোগাক্রান্ত ও কম মেধাস¤পন্ন শিশু পাচ্ছে দেশ। যা পরবর্তী সময়ে দেশের জন্য বোঝা হয়ে যাচ্ছে। শিশুদের কমপক্ষে দু’বছর বয়স পর্যন্ত বুকের দুধ পান করানোর কথা। দূরযাত্রায়, গণপরিবহনে বা কর্মক্ষেত্রে শিশু এ অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
শিশুদের নিয়ে এখানে মাঠ পর্যায়ে কাজ করার সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। কোথাও শিশুর অধিকার ও নিরাপত্তা ক্ষুণœ হলে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় না। এতে শিশুটির অধিকার ও নিরাপত্তা বিঘিœত হয় অনেক ক্ষেত্রে। সব ধরনের শিশুর সুরক্ষায় জাতীয় শিশু সুরক্ষা ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়ন, বেসরকারি সংগঠন ও গণমাধ্যমের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে শিশু সুরক্ষার বিষয়ে আলোচনা-পরামর্শ, মতামত আদানপ্রদানের মধ্য দিয়ে শিশুদের জন্য নিরাপদ ও অধিকারপূর্ণ একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। এক্ষেত্রে শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকা-ে শিশুদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করাও প্রয়োজন। এসব বাস্তবায়ন করা গেলে শিশুবিষয়ক অনেক কাজ সমাধান করা সহজ হবে। শিশুবিষয়ক আলাদা পূর্ণাঙ্গ অধিদপ্তর বা বিভাগ হলে সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি- বেসরকারি দপ্তরসমূহের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা সুবিধানজনক হবে। বিদ্যমান আইনের বিভিন্ন অসংগতি দূর করাও সহজ হবে। গবেষণা, জরিপ, বিভিন্নজনের মতামত ইত্যাদি গ্রহণ করে সরকারের কাছে শিশুদের কল্যাণে বিভিন্ন সুপারিশ করতে পারবে তারা।
মা ও শিশু অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। মায়ের অধিকার সুরক্ষা হলে, শিশুর অধিকার অনেকাংশে রক্ষা পায়। একজন গর্ভবতী মা গর্ভাবস্থায় তার অধিকারগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে পেলে, জন্মের আগে থেকেই অনাগত শিশুও তার অধিকার ও সুরক্ষা পেতে শুরু করে। তাই শিশুর অধিকার ও নিরাপত্তা সুরক্ষায় সবার আগে পরিবারটিকেই কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তিপর্যায়ে শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষা নিয়ে একযোগে কাজ করতে হবে। নিরাপত্তা, বাসস্থান, খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ রাষ্ট্র স্বীকৃত সকল অধিকার এবং নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে। আর সেগুলো হতে হবে বৈষম্যহীন। অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, লিঙ্গ, গোত্র, শারীরিক কোনো শ্রেণিভেদে শিশুদের বিভাজন করা যাবে না। এসব পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়ন হলেই একজন শিশু সঠিকভাবে বেড়ে উঠবে। যে শিশুরা হবে আমাদের দেশের আগামীর কর্ণধার।
শিশু সুরক্ষা একটি বহুমুখী ধারণা। শিশুর অধিকার ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হলে শিশুশ্রম, বাল্যবিয়ে ও মাদককে চিরতরে ‘না’ বলতে হবে। ইভটিজিং, যৌন হয়রানি, আর অশিক্ষাকে কঠোর হাতে দমন করতে হবে। তাই এক্ষেত্রে সমাজ, পরিবার ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দায়িত্বশীল লোকদের আরও অধিক সচেতন হতে হবে। জনসচেতনতা সৃষ্টিতে সরকারি-বেসরকারি দপ্তরসমূহ, গণমাধ্যম ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করা যেতে পারে। বাড়ি কিংবা কর্মক্ষেত্রে, শিশুদের অধিকার সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। অভিভাবকের সচেতনতার বিষয়টি শিশুদের অর্থবহ সুরক্ষার পূর্বশর্ত। যৌন নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও অধিকার লঙ্ঘন থেকে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি অপরিহার্য সামাজিক কর্তব্য। দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করায় আমাদের শিশুদের একটি বিশাল সংখ্যা বেড়ে উঠছে দারিদ্র্যের ভেতর। এ শিশুরা তাদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানের জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। তাছাড়া স্কুলে কিডনি, শ্বাসকষ্ট, প্রজননস্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও মায়েদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়। অনেক এনজিও এ কাজ করে থাকে ক্ষুদ্র আকারে। এর পরিসর বাড়াতে হবে। গণমাধ্যম এমন কোনো বিজ্ঞাপন প্রচার করবে না, যা শিশুদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এমন কোনো ছবি প্রকাশ করা উচিত নয়, যা শিশুদের মধ্যে সহিংসতা বৃদ্ধি করে। পাঠ্যপুস্তকে শিশু উপযোগী আইন, দায়িত্ব ও কর্তব্য, জঙ্গি, সুনাগরিক ইত্যাদি বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং তা বিস্তারিতভাবে।
দেশের জনসংখ্যার সিংহভাগ শিশু। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি শিশুবিবাহ হয় বাংলাদেশে। অবশ্য এখন কমতে শুরু করেছে। জরিপে দেখা যায়, মোট শিশুবিবাহের প্রায় ৪০ শতাংশই হচ্ছে দরিদ্র পরিবারগুলোর শিশুদের। ৭৪ লাখ শিশু বিভিন্ন খাতে শ্রম দিচ্ছে। ৫৬ লাখ শিশু কোনো প্রকার শিক্ষাকেন্দ্রের আওতায় নেই। রাষ্ট্রের একার পক্ষে সম্ভব নয় সব শিশুর সব রকমের দায়দায়িত্ব নেওয়া, এজন্য সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। শিশু সুরক্ষায় সরকারের ভালো আইন আছে। আইনের প্রয়োগে আরও কঠোর হতে হবে। দেশের সব শিশুকে উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করার জন্য সরকার, ব্যক্তিমালিকানাধীন খাত, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যমÑ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
লেখক : উপপরিচালক, বিআরডিবি, কুষ্টিয়া
