চাল নিয়ে চালবাজি বন্ধে পদক্ষেপ জরুরি

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:৪১ পিএম

আপৎকালীন মজুদ, চালের বাজারদর স্থিতিশীল রাখা এবং প্রয়োজনে কম দামে খোলাবাজারে বিক্রির জন্য সরকারের সংগ্রহ করা চাল গুদামজাত ও সরবরাহে নানা অনিয়ম ও কারসাজির অভিযোগ রয়েছে। এরমধ্যে নির্ধারিত মান বজায় রেখে সরকারের সংগ্রহ করা ভালো চালের বদলে নিম্নমানের চাল গুদামজাত করা এবং সরকারি গুদামের ভালো চাল বাজারে চোরাচালান করার গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। বিগত কয়েক সপ্তাহে সরকারি গুদামের চাল নিয়ে নানা কারসাজির একাধিক অভিযোগ সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।  অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ধান-চাল সংগ্রহ, গুদামজাতকরণ তথা সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দূর করতে পারছে না দায়িত্বশীল

কর্র্তৃপক্ষ। 

মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘সরকারি গুদামের চাল বাজারে!’ শিরোনামের প্রতিবেদনে উঠে আসে চট্টগ্রামের দুটি সরকারি গুদামের চাল নিয়ে অসাধু চক্রের কারসাজির খবর। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সরকার নির্ধারিত কেজিপ্রতি ৩৬ টাকা দামে সংগৃহীত চাল চট্টগ্রাম নগরের দেওয়ানহাট ও হালিশহর সিএসডিসহ (সেন্ট্রাল স্টোরেজ ডিপো) স্থানীয় বিভিন্ন এলএসডিতে (লোকাল স্টোরেজ ডিপো) সংরক্ষণের জন্য পাঠানো হয়। কিন্তু চাল আনা-নেওয়ার পথেই চলে তুঘলকি কাণ্ড। অভিযোগ রয়েছে, ডিও ব্যবসায়ী, পরিবহন ঠিকাদার ও খাদ্য বিভাগের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে গুদামের এসব চাল চলে যায় খোলাবাজারে। সরকারের সংগৃহীত ভালো মানের চালের পরিবর্তে উত্তরবঙ্গ, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ডিও ব্যবসায়ীদের সংগৃহীত নিম্নমানের পচা-নষ্ট চালগুলোই দেওয়ানহাট ও হালিশহর গুদামে ঢোকানো হয়। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে গত ২২ অক্টোবর খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার চট্টগ্রাম সফরকালে দেওয়ানহাট সিএসডির ১০টি গুদাম সিলগালা করে দেন। পরে খাদ্য মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় গুদামগুলো খুলে দেওয়া হয়। 

চট্টগ্রামের হালিশহর ও দেওয়ানহাট সিএসডিকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের তৎপরতার কথা এর আগেও গণমাধ্যমে এসেছে। ২০১৭ সালে হালিশহর গুদাম থেকে পাচার করার সময় চারটি ট্রাকসহ ১৫৫ মেট্রিক টন সরকারি চাল জব্দ করেছিল র‌্যাব। ওই ঘটনায় খাদ্য কর্মকর্তাসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।  এরপরই সেখানে খাদ্য বিভাগের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চাল পাচারের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।  কেবল যে সরকারি খাদ্যগুদামকে ঘিরেই চাল নিয়ে এমন কারসাজি হচ্ছে তা নয়। গত ২৬ অক্টোবর দেশ রূপান্তরের ‘৩৬ টাকার চাল তুলে ১৮ টাকায় বিতরণ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার এক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ভিজিডির ৪২৩ বস্তা সরকারি ভালো চাল বদল করে বাজার থেকে নিম্নমানের চাল কমদামে কিনে ভিজিডির উপকারভোগী নারীদের দেওয়ার অভিযোগ তদন্তে প্রমাণ হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়।

বাংলাদেশ এখন ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যানুসারে ২০১৮ সালে ৫৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের নতুন রেকর্ড করেছে। চালের অন্যতম শীর্ষ উৎপাদক হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ এখন সীমিত আকারে চাল রপ্তানিকারক দেশও বটে। কিন্তু দেশে নানা সময়ে চাল আমদানিও করা হয়। কিন্তু উৎপাদনে এই সাফল্যের পরও প্রতি বছরই কৃষকরা কেন চালের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তা বোধগম্য নয়। একইভাবে দেশের কৃষকরা যখন লোকসানে ধান বেচে উৎপাদন খরচও তুলতে পারেন না, ঠিক সে সময় দেশে চাল আমদানি করার ঘটনাও ঘটছে। পাশাপাশি সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ ও গুদামজাতকরণে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আছে। অবস্থাদৃষ্টে এটা প্রতীয়মান যে, কৃষকের কঠোর পরিশ্রম এবং সরকারের নানা প্রয়াসে উৎপাদনে সাফল্য এলেও বাজার ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারায় দেশে ধান-চাল নিয়ে নানা কারসাজি রোধ করা যাচ্ছে না।  এতে দেশের কৃষির প্রাণ কৃষকসমাজ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি সাধারণ ভোক্তারাও ভোগান্তিতে পড়ছেন।  কিন্তু একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তা অশুভ যোগসাজশে মুনাফার পাহাড় গড়ছেন। দেশের কৃষির সাফল্য বজায় রাখতে হলে এই অশুভ চক্রকে দমন এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত