জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান আন্দোলনে মঙ্গলবার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা খুবই অনভিপ্রেত। উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে তার বাসভবনের সামনে অবস্থান নেওয়া শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর ওই হামলায় ৮ জন শিক্ষক, ৪ জন সাংবাদিক ও কয়েকজন নারী শিক্ষার্থীসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আন্দোলনরতদের ওপর এই হামলা চালান বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। হামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীও অংশ নেন। শিক্ষার্থী পরিচয় বহনকারী রাজনৈতিক কর্মী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মারধর করে ধুলায় লুটিয়ে দিচ্ছেন, ছাত্রীদের পেটে লাথি মারছেন, ছাত্রদের পিটিয়ে গুরুতর আহত করছেনÑ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে এমন দৃশ্য অকল্পনীয়, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আরও দুঃখজনক হলো শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর এ হামলা চালানোর সময় আরেক দল শিক্ষককে হামলাকারীদের বাধা না দিয়ে উল্টো করতালি দিয়ে উৎসাহিত করতে দেখা গেছে। কোনোরকম সহিংসতার পক্ষে শিক্ষকদের অবস্থান যেমন অগ্রহণযোগ্য তেমনি একটি অহিংস আন্দোলনে এমন সহিংসতাও কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এই হামলার মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি আরও সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়া হলো।
মঙ্গলবার ওই হামলার প্রতিবাদে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকসহ ৪ জন শিক্ষক সমিতি থেকে পদত্যাগ করেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হামলার দিনই অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের হল ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয় প্রশাসন। কিন্তু আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করে উপাচার্যকে অপসারণের এক দফা দাবি আদায়ে অনড় রয়েছেন। ৮টি হলের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই হল ছেড়ে যাননি। মঙ্গলবার রাতে ছাত্রীরা হলের তালা ভেঙে বাইরে বেরিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দেন। বুধবারও দিনভর ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সংহতি সমাবেশে অংশ নিয়েছেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। মঙ্গলবারের হামলার পর সংঘাতময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পাসে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে জাহাঙ্গীরনগরের সংকট আরও জটিল হয়ে উঠল।
জাহাঙ্গীরনগরে হামলার ঘটনা গণমাধ্যমসহ নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশব্যাপী নিন্দার ঝড় ওঠে এবং বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। সংগত কারণেই এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা। অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মতোই সচেতন নাগরিকরা শিক্ষক-শিক্ষর্থীদের ওপর এমন ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপাচার্য ও ছাত্রলীগের বক্তব্যও তীব্রভাবে সমালোচিত হচ্ছে। এ হামলার মাধ্যমে তাকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উদ্ধার করার ঘটনাকে ‘গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ছাত্রলীগের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন উপাচার্য। বিশেষত ছাত্রলীগের নেতাকর্মী এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘শিবির কর্মী’ আখ্যা দিয়ে যে প্রচার চালাচ্ছেন তার সমালোচনায় মুখর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। লক্ষণীয় যে, সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নির্যাতনে নিহত আবরার ফাহাদকেও একইভাবে শিবিরকর্মী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়। কেবল জাহাঙ্গীরনগরই নয় সম্প্রতি অন্য কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও আন্দোলনরতদের কোণঠাসা করা কিংবা মূল ঘটনা থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়ার কৌশল হিসেবে এই ‘শিবিরকর্মী’ আখ্যা দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। ভিন্নমত দমনে রাজনৈতিক অঙ্গনে মিথ্যাচারের এই অপচর্চা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতিকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের দাবি-দাওয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। ‘উন্নয়নের নামে বৃক্ষ নিধন’ বন্ধসহ বিভিন্ন দাবি আদায়ে গত আগস্ট মাসে এ আন্দোলন শুরু হয়। পাঁচটি হল নির্মাণের জন্য কয়েকশ গাছ কেটে ফেলার পর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এটিকে অপরিকল্পিত উন্নয়ন আখ্যা দিয়ে জোরদার আন্দোলন শুরু করেন। পরে ছাত্রলীগকে ‘ঈদ সালামি’ দেওয়ার অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তা নিয়ে উপাচার্য ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের পাল্টাপাল্টি অবস্থানে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। এর পরপরই চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিসহ নানা অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে অপসারণ করা হয়। এ অবস্থার মধ্যেই আন্দোলনের মুখে উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনায় বসেন আন্দোলনকারীরা। আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় গত ১৯ সেপ্টেম্বর উপাচার্যের পদত্যাগের একদফা দাবিতে পরিণত হয় এই আন্দোলন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ-প্রকৃতিকে বিনষ্ট না করে প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন নীতিমালা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিতেই শুরু হয়েছিল এই আন্দোলন। বাংলাদেশসহ দুনিয়াজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনসহ পরিবেশের হুমকির বিবেচনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এই দাবিকে যৌক্তিক বলেই স্বীকার করতে হয়। কিন্তু এমন একটি দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন কেন এমন সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে গড়িয়ে গেল সেটা বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে। একইসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগরের আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের নির্দেশ অমান্য করে ক্যাম্পাস ও হলগুলোতে অবস্থান করায় তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। এ অবস্থায় প্রশাসনকে অবশ্যই হামলাকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে এবং ক্যাম্পাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
