জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) একাংশের সভাপতি ও চট্টগ্রাম-৮ আসনের সাংসদ মঈন উদ্দীন খান বাদল আর নেই। গতকাল বৃহস্পতিবার ভারতের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এই মুক্তিযোদ্ধা, বর্ষীয়ান রাজনীতিক ও পার্লামেন্টারিয়ান। তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। মঈন উদ্দীন খান বাদলের ছোট ভাই মনির উদ্দীন আহমদ খান দেশ রূপান্তরকে
বলেন, উনি (সাংসদ বাদল) হৃদরোগে আক্রান্ত ছিলেন। দুই সপ্তাহ আগে নিয়মিত চেকআপের জন্য তাকে ভারতে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
আজ শুক্রবার সকাল ১০টায় বাদলের মরদেহ ঢাকা বিমানবন্দরে এসে পৌঁছাবে। সেখান থেকে জাতীয় সংসদ ভবনে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে পার্টি অফিসে নিয়ে যাওয়া হবে। আগামীকাল শনিবার সকালে মরদেহ চট্টগ্রামে আনা হবে। গ্রামের বাড়িতে মা-বাবার পাশে পারিবারিক কবরস্থানেই তাকে সমাহিত করা হবে বলে পরিবার থেকে জানানো হয়েছে।
এই রাজনীতিকের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোক প্রকাশ করেছেন। পৃথক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী বাদলের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং মরহুমের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
জাসদের (একাংশ) সভাপতি ও সাংসদ মঈন উদ্দীন খান বাদলের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলী গ্রামে। তিনি স্ত্রী, তিন ছেলে, এক মেয়ে, অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন। চট্টগ্রাম-৮ আসন (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) থেকে তিনবার সাংসদ নির্বাচিত হন তিনি।
মঈন উদ্দীন খান বাদল মুক্তিযুদ্ধের একজন বিশিষ্ট সংগঠক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। সেখান থেকে এসে চট্টগ্রাম শহরে মৌলভী সৈয়দের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি নৌ কমান্ডোদের চট্টগ্রাম শহরে আগমন, তাদের থাকা-খাওয়া ও কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন।
মঈন উদ্দীন খান বাদলের মৃত্যুর খবর দেশে এসে পৌঁছালে বিভিন্ন অঙ্গনে শোক নেমে আসে; বিশেষ করে নিজ দল জাসদের নেতাকর্মীরা শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন শোক প্রকাশ করেছে। জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ও ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, তথ্যমন্ত্রী ও চট্টগ্রাম-৭ আসনের সাংসদ হাছান মাহমুদ, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম শোক জানিয়েছেন।
জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার, জাসদ একাংশের সভাপতি শরীফ নূরুল আম্বিয়া এবং সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহ আলম শোক প্রকাশ করেছেন।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ রফিকুল আলম এই রাজনীতিকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এক শোকবাণীতে উপাচার্য বলেন, মঈন উদ্দীন খান বাদল বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী ছিলেন। চট্টগ্রামের ন্যায্য দাবি আদায়ে তিনি অন্যতম অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তার গৌরবময় ভূমিকা সবাই কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবেন। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা মঈন উদ্দীন খান বাদলের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
দেশ স্বাধীনের পর বাদল জাসদে যোগ দেন। তিনি চট্টগ্রামে জাসদের অন্যতম শীর্ষ সংগঠক ছিলেন এবং পরে ঢাকায় গিয়ে জাসদের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরে জাসদ থেকে বেরিয়ে বাসদ গঠনের প্রক্রিয়ার তিনি অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন। এরপর পুনরায় হাসানুল হক ইনু ও শরীফ নূরুল আম্বিয়ার সঙ্গে জাসদে ফিরে আসেন। ইনুর সঙ্গে বিরোধ হলে তিনি আম্বিয়াকে নিয়ে ভিন্ন জাসদ গঠন করেন। এই জাসদের তিনি কার্যকরী সভাপতি ছিলেন।
সাংসদ বাদল প্রতিভাবান ও দূরদর্শী রাজনীতিক ছিলেন। তিনি অসাধারণ সংগঠক, তুখোড় বক্তা এবং দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান ছিলেন। চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলাকে নিয়ে তিনি অনেক স্বপ্ন দেখতেন। বোয়ালখালীকে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে তিনি ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন।
চট্টগ্রামের কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণের দাবিতে বাদল আমৃত্যু লড়ে গেছেন। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে তিনি অনেকটা অভিমান করে বলেছিলেন, আগামী ডিসেম্বরে কাজ শুরু না হলে তিনি জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করবেন। এ বছরের ডিসেম্বরে কালুরঘাটে নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগেই সবাইকে কাঁদিয়ে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন মঈন উদ্দীন খান বাদল।
