গাজীপুরের কালীগঞ্জের তুমলিয়া ইউনিয়নের ভাইয়াসূতি হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানায় শেকলবন্দি হয়ে দিন কাটানো তিন শিশুছাত্র অবশেষে শেকলমুক্ত হয়েছে। কালীগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী (ইউএনও) কর্মকর্তা মো. শিবলী সাদিক গত বুধবার বিকেলে মাদ্রাসায় গিয়ে তিন শিশুর পায়ে লাগানো শেকল খুলে দেন। এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। শেকলমুক্ত হওয়া ওই তিন শিশু হলো ইফাদ মিয়া, মো. আজিজুল ইসলাম ও মো. ইয়াসিন। তাদের সবারই বয়স ১৩ বছর।
শেকলবন্দি করে রাখা ওই শিশুরা সবাই মাদ্রাসার হেফজখানার ছাত্র। মাদ্রাসা থেকে বিভিন্ন সময় পালিয়ে যাওয়ায় ওই শিশুদের অভিভাবকরাই তাদের পায়ে শেকল লাগিয়ে তাতে তালা আটকে রেখে গিয়েছিলেন বলে দাবি করেছে মাদ্রাসার পরিচালনা কর্র্তৃপক্ষ। কখনই তাদের পা থেকে শেকল খোলা হতো না বলে ওই তিন শিক্ষার্থীসহ এলাকাবাসী দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে। এই শিশুরা পায়ে বাঁধা ভারী শেকল নিয়েই চলাফেরা, খাওয়া-দাওয়া, টয়লেটে যাওয়া, গোসল, লেখাপড়া ও ঘুমসহ দৈনন্দিন সব কাজ করত।
শেকলমুক্ত হওয়া তিন শিশুর মধ্যে ইফাদ নরসিংদীর পলাশের ডাঙ্গা ইউনিয়নের ইসলামপাড়া গ্রামের প্রবাসী কাওছার মিয়ার ছেলে এবং আজিজুল একই এলাকার কৃষক নাছিরউদ্দিনের ছেলে। ইফাদ ও আজিজুল সম্পর্কে মামা-ভাগ্নে। অন্যদিকে ইয়াসিন গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার তুমলিয়া ইউনিয়নের টেক মানিকপুর গ্রামের মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহর ছেলে।
স্থানীয়রা জানায়, ২০০৬ সালে ভাইয়াসূতি হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরু থেকেই মাদ্রাসার সুপারের দায়িত্ব পালন করছেন মো. আরিফুল্লাহ। বর্তমানে ওই মাদ্রাসায় ৭৫ জন ছাত্র রয়েছে। এদের মধ্যে ১৮ জন এতিম ছাত্র।
ইউএনও মো. শিবলী সাদিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় সাংবাদিকদের মাধ্যমে ঘটনাটি জানতে পারি। বিষয়টি খুবই ন্যক্কারজনক। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাথমিকভাবে আমরা ঘটনার সত্যতা পেয়েছি। সেখানে ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবক ও মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলেছি।’
এ ঘটনায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ জুবের আলমকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানান ইউএনও। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূর-ই-জান্নাত এবং উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. শাহাদাৎ হোসেন। সাত কর্মদিবসের মধ্যে এ কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি রেজাউল করিম রানু দাবি করেছেন, তিন ছাত্রের পায়ে শেকল বেঁধে রাখার বিষয়টি তার জানা ছিল না। তবে মাদ্রাসার সেক্রেটারি বদরুজ্জামান ভূঁইয়া রতন দিয়েছেন ভিন্ন তথ্য। তিনি বলেন, ‘এর আগে মাদ্রাসার এক শিক্ষার্থীকে মারধর করেছিল এই সুপার। তখন এ নিয়ে মাদ্রাসায় সালিশও বসেছিল। ওই সময় তাকে বলে দেওয়া হয়েছিল, কোনো শিক্ষার্থীকে যেন মারধর না করা হয়। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পায়ের শেকল খুলে দিতেও বলা হয়েছিল তখন। কিন্তু সুপার বলেছিল, ছাত্ররা চলে যায় এজন্য তাদের বাবা-মা শেকল দিয়েছে। তারপরও বলা হয়েছিল, যারা চলে যায় চলে যাক, কিন্তু কারও পায়ে শিকল বা তালা দেওয়া যাবে না। কিন্তু তারপরও মাদ্রাসা সুপার কথা শোনেনি।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে অভিযুক্ত মাদ্রাসা সুপার মো. আরিফুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এতে আমার কোনো দায় নেই। ওই ছাত্রদের অভিভাবকরাই তাদের শেকল দিয়ে পায়ে তালা দিয়েছেন।’
