বিশ্ব পরিসরের সঙ্গে দেশেও প্রয়াস বাড়াতে হবে

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ১১:৩৪ পিএম

পোল্যান্ডের ক্যাটোভিসে সর্বশেষ বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে (কপ-২৪) বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছেন, ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়ে কম, অর্থাৎ শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের মাত্রায় কমিয়ে আনতে হবে। জাতিসংঘভিত্তিক সংস্থা ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ বা আইপিসিসির উদ্যোগে সারা বিশ্বের প্রায় ৯০০ বিজ্ঞানী এক সম্মিলিত প্রতিবেদনে এই হুঁশিয়ারি দেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এভাবে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বাংলাদেশের মতো অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশ, অন্যান্য স্বল্পোন্নত দেশ ও ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলো ‘গ্রাউন্ড জিরো’ অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও আরও প্রতিকূল প্রভাবের মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। ফলে এসব দেশ অভিযোজনের বাইরেও জলবায়ু-প্রভাবিত অভিবাসন এবং অর্থনৈতিক ও অ-অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে এবং প্রতি বছর মোট জিডিপির ২ শতাংশেরও বেশি হারে হারাবে। এসব ঝুঁকির মাত্রা কমিয়ে আনতে ২০১৫ সালে প্যারিসে কপ-২১ সম্মেলনের ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে (এলডিসি) আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয় উন্নত দেশগুলো। কিন্তু বাংলাদেশ সেই প্রতিশ্রুতি অনুসারে কোনো অর্থ পায়নি। একই সঙ্গে প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়ায় বিষয়টি আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে আগামী ডিসেম্বরে স্পেনে অনুষ্ঠিতব্য ২৫তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে (কপ-২৫) নিজেদের ঝুঁকির কথা তুলে ধরে শিল্পোন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের আর্থিক সহায়তা আদায়ের ওপর জোর দেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। প্যারিস চুক্তির সবুজ জলবায়ু প্রকল্পে বলা হয়েছিল, ২০৫০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে ৩০ থেকে ৫০ লাখ মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে পড়ার দায়িত্ব শিল্পোন্নত ধনী দেশগুলোকে নিতে হবে। এসব ঝুঁকি প্রশমন ও অভিযোজনের জন্য বাংলাদেশের যথাক্রমে ২৭ ও ৪২ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশ জলবায়ু ক্ষতি মোকাবিলায় কোনো আর্থিক সহযোগিতা পায়নি। ফলে এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশ গুরুত্বসহকারে বিষয়টি আলোচনার টেবিলে রাখবে। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে ২ থেকে ১৩ ডিসেম্বরের এ সম্মেলনে একই সঙ্গে চুক্তিতে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ফিরিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে তৎপরতাও চালাবে সরকার। অবশ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিশ্রুত অর্থ আদায় এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্টসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ও ডেমোক্র্যাট রাজনীতিকদের দিয়ে চাপ তৈরি করতে হবে। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় তা সম্ভব না হলে মানবাধিকারের দাবিতে আইনি প্রক্রিয়ায় সে চেষ্টা চালাতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এরই মধ্যে ঘূর্ণিঝড়, প্লাবন, খরা, লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে। এর সব কটিই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি বয়ে আনতে পারে। দেশে সাম্প্রতিক সময়ে তাপমাত্রা, বৃষ্টি, বন্যা কিংবা খরার বিরূপ আচরণ খুবই পরিষ্কারভাবে টের পাওয়া যায়। কোনোটিই আগের মতো সময় মানছে না। অসময়ে যেমন অতিবৃষ্টি হয়, তেমনি আবার অসময়ে খরা কিংবা বন্যাও হয়; বিশেষ করে এমন পরিস্থিতিতে পানি ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও রাসায়নিক দূষক পদার্থ বহন করে থাকে। একইভাবে ছত্রাকের বৃদ্ধি ঘটায় ও নানা কীট-পতঙ্গের বংশবৃদ্ধিতে সাহায্য করে। ফলে চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গুসহ নানা ব্যাধি বাসা বাঁধছে। একই কারণে গ্রীষ্মকাল ধীরে ধীরে বড় ও বর্ষাকাল বিলম্বিত হচ্ছে। এর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে প্রকৃতি, ফসল ও মানুষের ওপর। ঋতুভিত্তিক ফসল উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জলবায়ুর এই ক্ষতিকর প্রভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষিজমির পরিমাণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চল থেকে শহরগুলোতে অভিগমনের হার বাড়ছে।

এ অবস্থায় জলবায়ু সম্মেলনে জোরালো দাবি তুলে বৈশ্বিক পরিসরে সোচ্চার হওয়ার পাশাপাশি দেশের পরিসরেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় বহুমাত্রিক প্রয়াস গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিশ্ব পরিসরে দর-কষাকষির জন্য নতুন এলডিসি চেয়ার ভুটানের নেতৃত্বে বাংলাদেশসহ ৪৮টি দেশের ‘এলডিসি গ্রুপ’কে ভালোভাবে প্রস্তুত করার উদ্যোগ নিতে হবে। সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে কৌশলপত্র প্রণয়ন করতে হবে। একই সঙ্গে বিশেষভাবে প্রয়োজন গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, অ্যাডাপ্টেশন ফান্ড, এলডিসি ফান্ড ও অন্য বৈশ্বিক তহবিলগুলো থেকে অর্থায়ন পাওয়ার জন্য অভিযোজন ও প্রশমন কর্মসূচি প্রণয়ন ও পরিচালনায় দক্ষতা ও সক্ষমতা তৈরি করা। এখানে উল্লেখ করা দরকার, সরকার ২০০৮ সালে ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান’ (বিসিসিএসএএপি) প্রণয়ন করে। ২০০৯ সালে তা সংশোধন করা হয়েছে। এমন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রথম দেশ বাংলাদেশ।  এটা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক ঘটনা। একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের দ্বারা প্রণীত এনএপি রোডম্যাপ অনুসরণ করে ‘জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা’ (এনএপি) অবিলম্বে প্রণয়ন করা উচিত। বাংলাদেশ নিজস্ব বাজেটে জলবায়ু ট্রাস্ট তহবিল এবং বিশেষ করে যুক্তরাজ্যসহ কিছু উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় জলবায়ু রেসিলিয়েন্ট ফান্ড তৈরি করেছে। এখন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত