বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’। উদ্বেগের খবর আসছে দেশ থেকে। এমন দুর্যোগের সংবাদ নিতে নিতে নাগপুরে তৈরি হয় বাংলাদেশ দল। আজ তো মহারাষ্ট্রের এই বিদর্ভ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন স্টেডিয়াম থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম বড় খবরটাই পৌঁছে যেতে পারে দেশে। ভারতের বিপক্ষে তৃতীয় ও শেষ টি-টোয়েন্টিতে দেশকে তেমন এক বড় উপহার দেওয়ার মিশনে নামছে মাহমুদউল্লাহর দল। নিজেদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ভারত সফরে স্বাগতিকদের সিরিজ হারানোর মিশনের শেষ সুযোগ দাঁড়িয়ে সামনে।
বাংলাদেশ-ভারতের এই সিরিজটা বিস্ময় জাগাচ্ছে বারবার। প্রথমবার দিল্লিতে। কী দূষণ! হেড কো রাসেল ডমিঙ্গো কাল বলছিলেন, ‘দুই সপ্তাহ আগে কেউ যদি বলত নাগপুরে ১-১ এ সমতা নিয়ে যাব তাহলে কেউ তা বিশ্বাস করত না। আমরা তাই খুব খুশি। আর আগামীকাল (আজ) সামনে অসাধারণ এক সুযোগ। ভারত বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। কেউ বাংলাদেশের সুযোগ দেখেনি। কিন্তু এখন নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারলে দারুণ সুযোগ অপেক্ষায়।’
সেই সুযোগ তৈরি করার প্রথম ধাপে দিল্লির বহুল আলোচিত দূষণের সঙ্গে বাংলাদেশ হার মানাল ভারতকে। ১-০ নিয়ে রাজকোটে। সেখানে গিয়ে ‘মহা’ নামের সাইক্লোনের আঘাত হানার শঙ্কার খবর। শেষ পর্যন্ত আঘাত হানেনি। কিন্তু ঝড়বৃষ্টি শঙ্কায় ফেলেছিল। আবার সিরিজ নির্ধারণী খেলার আগে গতকাল সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া ‘অযোধ্যা’ রায়ের কারণে থমথমে অবস্থা ছিল পুরো ভারতজুড়ে। ডানপন্থি হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল আরএসএস বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের হেডকোয়ার্টার নাগপুরে। আবার বিজেপি-শিবসেনা টানাপড়েনে মহারাষ্ট্রের সরকার গঠন নিয়ে ঝামেলা চলছে। মুখ্যমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন শুক্রবার। এ নিয়েও উত্তেজনা নাগপুরে। দুই ভিন্ন রকমের পরিবেশ থেকে এমন একটা জায়গায় এসে পড়া তৃতীয় ম্যাচের।
অবশ্য খেলার দিকে মন দিলে অন্য আলোচনা থেকে খেলোয়াড় ও সংশ্লিষ্টরা চলে আসতে বাধ্য। শহর থেকে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার দূরত্বের এই স্টেডিয়ামের উইকেট তাই সব ছাপিয়ে আলোচনায় উঠে আসে। মুশফিকুর রহিম নিজের নেট সেশন শেষ করে একজনকে নিয়ে দুপুরের আগে সেন্টার উইকেটের পাশে যান। কিছুক্ষণ নক করেন। এরপর টেস্ট খেলতে আসা মেহেদী হাসান মিরাজের বোলিংয়ে কিপিংও করলেন। বীরোচিত পারফরম্যান্সে প্রথম ম্যাচে দলকে জেতানোর পর দ্বিতীয়টিতে রান না পাওয়া মুশফিক শক্তভাবে ফিরতে চাইছেন।
কিন্তু মুশফিক ও বাংলাদেশ দলকে ফেরার সেই সুযোগ দিতে নারাজ নাগপুরের ঘরের ছেলে রোহিত শর্মা। ভারতের স্ট্যান্ডইন ক্যাপ্টেন আগের ম্যাচে বিধ্বংসী ইনিংসে দলকে সমতায় ফিরিয়েছেন। ‘তেমন আরও একটা খেলা খেলতে চাই’ দুপুরের পর অনুশীলনে নামার আগে হুমকি দিয়ে গেলেন হিটম্যান। সেই সঙ্গে জানিয়ে গেলেন, ‘আমরা ফেভারিটতত্ত্বে বিশ্বাসী না। নির্দিষ্ট দিনে ভালো প্রমাণ করা জরুরি। সিরিজের প্রথম দিনে নিজেদের তা প্রমাণ করে বাংলাদেশ জিতেছে। দ্বিতীয়টিতে আমরা ভালো ছিলাম বলে জিতেছি।’
ভারতের একেবারে সেরা দল এটা না। তারপরও আইপিএলের দেশ ভারতের একাদশে হার্ড হিটার আছে যথেষ্ট। বাংলাদেশ দলে তেমন পাওয়ার হিটার নেই। তবে সুখের কথা, নাগপুরে টি-টোয়েন্টিতে ১৫৫ / ১৬০ রান করেও জেতার আশা করা যায়। ডমিঙ্গো আগে এখানে যেবার এসেছিলেন সেবার দুদিনে বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচ শেষ হতে দেখেছেন। বাংলাদেশের দক্ষিণ আফ্রিকান কোচ এই উদাহরণ দিয়ে জানিয়েছেন, ‘এখন এখানে (উইকেট) ভালোই দেখাচ্ছে। আমার মনে হয়, রাজকোটের চেয়ে নাগপুরে ঐতিহ্যগতভাবে রান কম হয়। ওখানে গড় রান ১৮৫ হলে এখানে তা ১৫৫। রাজকোটের চেয়ে এখানে স্পিনারের ভূমিকা অনেক বেশি থাকবে।’
স্পিন বোলিং কোচ ড্যানিয়েল ভেট্টোরি বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলামকে বল করালেন দীর্ঘক্ষণ। ম্যানেজার সাব্বির খান ছিলেন অনুবাদকের ভূমিকায়। কথোপকথন হয় দীর্ঘ। স্পিনারদের শেষ আঘাত হানার পরিকল্পনা কি চ‚ড়ান্ত? ডমিঙ্গো শুধু ইঙ্গিত দিয়ে যান আত্মবিশ্বাস নিয়ে, ‘আমাদের অবশ্যই মনে হচ্ছে উইকেটে স্পিন ধরলে আমাদের স্পিনাররা খেলে দেবে।’
ভারতের যুজবেন্দ্র চাহাল, ক্রুনাল পান্ডিয়া ও ওয়াশিংটন সুন্দরের মতো তিন রকমের তিন স্পিনার। সেখানে বাংলাদেশ দলে বিশেষজ্ঞ স্পিনার মোটে একজন-তরুণ আমিনুল ইসলাম বিপ্লব। অন্যরা সহায়তা করছেন। বাঁহাতি নেই সহায়কদের মধ্যে। কথা হচ্ছিল একজন বাঁহাতি স্পিনার আনা যায় কি না এবং তিন বোলারের পেস আক্রমণে ভিন্ন ভাবনা ঢোকানো সম্ভব কি না। শেষ পর্যন্ত কী হয় দেখা যাক।
তবে বাংলাদেশ দল ভাবছে একটু ভিন্ন দিক দিয়ে। টস জয় গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ওটা ভাগ্যের ওপর। বাংলাদেশের ব্যাটিং শক্তি চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে নাগপুরের এমন উইকেটে। এমনটা তো তাদের নিজেদের উইকেট। সব মিলে কোচ রাসেল কি সম্ভাব্য ফল দেখতে পাচ্ছেন? নইলে কেন এমন প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে যাবেন, ‘আমরা আমাদের সামর্থ্য মতো খেলতে পারলে ভারতকে যে কোনো দিনে হারাতে পারি, এই বিশ্বাস আমাদের আছে।’
উৎসব হবে সব বিপর্যয় সামলে?
