মধ্যপ্রাচ্যে আরেক আরব বসন্ত?

আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০১৯, ১১:৪৪ পিএম

বিদায় নিতে চলেছে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ গ্রীষ্মকাল। গরমের শেষ বেলায় এসে প্রশ্ন উঠেছে, এ অঞ্চলে কী নতুন আরেক আরব বসন্ত ঘনিয়ে আসছে?

ইরাকে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় গুলি খেয়ে মরছে। লেবাননে বিক্ষোভকারীরা দেশকে অচল করে দিয়েছে। লেবাননে প্রতিবাদ কর্মসূচির একাদশ দিনে ১৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ মানববন্ধনের প্রচেষ্টা চালায় বিক্ষুব্ধ জনতা। বিক্ষোভকারীদের পণ ছিল, সরকারের পতন না ঘটিয়ে তারা রাজপথ ছাড়বে না। (দু-সপ্তাহের বিক্ষোভে তাদের অন্যতম প্রধান দাবি মেনে প্রধানমন্ত্রী সাদ আল-হারিরির সরকার পদত্যাগ করেছেও– অনুবাদক)। সাপ্রতিক সপ্তাহগুলোতে মিসরীয় নিরাপত্তা বাহিনী প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ আল-সিসির পুলিশি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার প্রচেষ্টাকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

ইরাক, লেবানন ও মিসরের মধ্যে পার্থক্য অনেক। তবে সব দেশের বিক্ষোভকারীদের মধ্যেই আছে সাধারণ কিছু অভিযোগ। মধ্যপ্রাচ্যের আরব অঞ্চলজুড়ে লাখ লাখ মানুষ, বিশেষত তরুণদের মনোভাবও তাই।

মোটামুটিভাবে মনে করা হয়, এ অঞ্চলের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশই ৩০ বছরের কম বয়সী। এ রকম একটি বড় তরুণ জনগোষ্ঠী কোনো দেশের জন্য হতে পারে দারুণ সম্পদ। তবে শুধু তখনই তা হতে পারে যখন অর্থনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট কার্যকরভাবে কাজ করে। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে তা কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে ঘটছে না।

ইরাক, লেবানন বা এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের তরুণ-যুবকরা প্রায়ই হতাশায় আক্রান্ত হন। সহজেই তা পরিণত হয় ক্রোধে।

ব্যাপক দুর্নীতি

বিক্ষোভকারীদের  প্রধান দুটি অভিযোগ হলো দুর্নীতি ও বেকারত্ব নিয়ে। আসলে এক সমস্যা আরেকটির দিকে ঠেলে দেয়।

বিশ্বব্যাপী দুর্নীতির কয়েকটি সূচক অনুসারে ইরাক এখন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। লেবানন কিছুটা ভালো, তবে খুব বেশি নয়।

দুর্নীতি একটি ক্যানসার। এটি এর শিকারে পরিণত হওয়া মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও আশা কুরে করে খেয়ে নেয়।

দুর্নীতি গ্রস্ত ব্যবস্থায় শিক্ষিতরাও অনেক সময় চাকরি পান না। তারা দেখতে পান, ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠী পকেট ভারী করছে। এসব দেখে বঞ্চিতদের মনে সঞ্চারিত হয় প্রচণ্ড ক্ষোভ।

যখন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো সরকার, আদালত এবং পুলিশ– এই কালো চক্রে জড়িয়ে যায়, তখন তা পুরো ব্যবস্থাটি ব্যর্থ হওয়ারই লক্ষণ। লেবানন ও ইরাক উভয় ক্ষেত্রেই বিক্ষোভকারীরা কেবল তাদের সরকারের পদত্যাগ চায় না। তারা চায়, সমগ্র প্রশাসনিক ব্যবস্থার সংস্কার বা তা আমূল বদলে নতুন ব্যবস্থা চালু করা হোক।

সরাসরি তাজা গুলি

ইরাকের মর্মান্তিক বাস্তবতাগুলোর মধ্যে একটি হলো, দেশটির সমাজের শিরায় শিরায় সহিংসতা ঘাঁটি গেড়ে বসেছে। বিক্ষোভকারীরা বেকারত্ব, দুর্নীতি আর সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নামলে তাদের বিরুদ্ধে তাজা গুলি ব্যবহার করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশি সময় নেয়নি। এখন পর্যন্ত ইরাকের রাস্তার বিক্ষোভগুলো নেতৃত্বহীন বলেই মনে হচ্ছে। তবে সরকারের আশঙ্কা, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে হতাহতের ঘটনা বাড়তে থাকলে বিক্ষোভকারীরা সুসংগঠিত হয়ে উঠতে পারে।

ইরাকের বিক্ষোভকারীরা সরকারি ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোকে টার্গেট করেছে, বিশেষ করে বাগদাদের দেয়ালঘেরা ‘গ্রিন জোন’কে। এটি ছিল ইরাকে মার্কিন দখলের কেন্দ্রস্থল। রাজধানীর এ অংশটিতেই এখন সরকারি দপ্তর এবং দূতাবাসগুলোর অবস্থান। পাশাপাশি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বসবাস এখানে।

ইরাকের বিক্ষোভ বাগদাদে শুরু হয়ে পরে অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে। নতুন সহিংসতার ঘটনায় পবিত্র শহর কারবালাসহ অনেক স্থানে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলির ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাজা বুলেট থেকে প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালানো লোকজনের ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে।

বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে হতাহতের হার ক্রমেই বেড়েছে। বাগদাদ থেকে পাওয়া খবরে বলা হয়েছে, কিছু ইরাকি সেনা তাদের কাঁধে জাতীয় পতাকা জড়িয়ে পথে হাজির হয়েছে, যাকে বিক্ষোভকারীদের প্রতি কিছুটা সংহতি বলেই মনে করা হচ্ছে।

তবে প্রতিবেদনে এ-ও বলা হয়েছে, কালো পোশাক পরিহিত লোকরা (তাদের কেউ কেউ মুখোশধারী) গুলি চালিয়েছিল। একটি তত্ত্ব হলো তারা ইরানপন্থি মিলিশিয়া বাহিনীর সদস্য।

ইরাকে গৃহযুদ্ধের পাশাপাশি গত কয়েক বছরে জন-অসন্তোষ মাথাচাড়া দিয়েছে কয়েকবার। তবে এবারই তা বড়সড় আকারে দেখা দিল। ইরাকি বিক্ষোভকারীদের মূল দাবি সুশাসন। কর্মসংস্থানের অভাব, নিমœমানের সরকারি পরিষেবা আর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের লাগামছাড়া দুর্নীতির প্রতিবাদে গত অক্টোবরের প্রথম দিন থেকে রাজধানী বাগদাদসহ কয়েকটি নগরীতে মুরু হয় এ বিক্ষোভ। এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা কয়েকশ। বিশ্ব সংস্থা জাতিসংঘ ইতিমধ্যেই আহ্বান জানিয়েছে ‘অনর্থক প্রাণহানি’ বন্ধের জন্য। ‘এই প্রাণহানির পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের’ বিচারের আওতায় আনারও তাগিদ দিয়েছে বিশ্বসংস্থা।

অসমাপ্ত কাজ?

সরকার তামাক, পেট্রল এবং হোয়াটসঅ্যাপ কলের ওপর কর প্রবর্তনের চেষ্টা করার পর ১৭ অক্টোবর লেবাননে বিক্ষোভ শুরু হয়। নতুন আরোপিত শুল্ক দ্রুতই বাতিল করা হয়েছিল। তবে ততক্ষণে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। শুরুর দিকে লেবাননের বিক্ষোভে কোনো সহিংসতার ছায়া ছিল না। তবে দেশে বিদ্যমান প্রকৃত উত্তেজনার আভাসটা স্পষ্ট। কিছু কিছু সহিংসতা ঘটছেও।

তাহলে কি এটি আরব বসন্ত? এটি আসলে ২০১১-এর অসম্পূর্ণ কাজের একটি চিহ্ন। আট বছর আগে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে একের পর এক শাসকের পতন ঘটেছে। ২০১১ সালের অভু¨ত্থান স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে মাঠে নামা জনগণ যে স্বাধীনতার জন্য উন্মুখ হয়েছিল, তা বয়ে আনেনি। তবে ওই গণ-উত্থানের পরিণতি এখনো অনুভূত হচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে সিরিয়া, ইয়েমেন ও লিবিয়ার যুদ্ধ এবং মিসরে আরও কঠোর পুলিশি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। আর ২০১১ সালের অভু¨ত্থানে ইন্ধন জোগানো অভাব-অভিযোগগুলো এখনো বহাল, কিছু ড়্গেত্রে বরং আরও গভীর হয়েছে। একটি বৃহৎ এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর চাহিদা মেটানোর ড়্গেত্রে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থাগুলোর ব্যর্থতা এটাই নিশ্চিত করে যে, চলমান বিক্ষোভের পেছনের ক্রোধ এবং হতাশা হঠাৎ করেই দূর হতে যাচ্ছে না।

লেখক : বিবিসি মধ্যপ্রাচ্যের সম্পাদক

বিবিসি অনলাইন থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত