পরিবহনে গতি বাড়লে সেবা ব্যয় কমবে ৩৫%

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ১২:০৮ এএম

আগামীতে প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশের সাফল্য ধরে রাখা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বিশ^ব্যাংক বলেছে, অনেক কারণে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি এখন চ্যালেঞ্জে পড়েছে। ট্রাফিক জ্যাম এবং অন্যান্য কারণে পণ্য পরিবহনে বিলম্বের ঘটনা বাংলাদেশের সর্বত্রই। সড়কপথে সমুদ্রবন্দর কিংবা স্থলবন্দরে পণ্য পৌঁছাতে ব্যয় হচ্ছে স্বাভাবিকের দ্বিগুণ সময়। ট্রাকের গতি ঘণ্টায় মাত্র ১৯ কিলোমিটার, যা স্বাভাবিকের অর্ধেক। শুধু এ কারণে সেবা ব্যয় অন্তত ৩৫ শতাংশ কমানো সম্ভব। এসব কারণ ছাড়াও বিভিন্ন ইস্যুতে রপ্তানি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। এই অবস্থায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। সেবা এবং সরবরাহ নিয়ে বিশ^ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এই বাস্তবতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। ‘বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়া : সাফল্য অব্যাহত রাখতে সংযোগ এবং রসদ’ নামের এই প্রতিবেদন গতকাল বুধবার ঢাকায় প্রকাশ করা হয়। রাজধানীর হোটেল রেডিসনে অনুষ্ঠিত এতে বাংলাদেশে বিশ^ব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি টেম্বন বলেছেন, উন্নত সেবা সরবরাহের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আনা গেলে প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানের অতিরিক্ত ১০ শতাংশ পোশাক রপ্তানি সম্ভব। প্রধান রপ্তানি পণ্য পোশাকের মোট রপ্তানির কম-বেশি ২০ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিলম্বে বন্দরে পণ্য পৌঁছানোর কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে রপ্তানিপণ্য কন্টেইনারকে গড়ে ৪দিন অলস পড়ে থাকতে হয়। আমদানির ক্ষেত্রে এই সময় লাগছে ১১ দিন। এই অলস সময় কমিয়ে আনা গেলে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমিয়ে আনা যায়।

এতে বলা হয়, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের ধারাবাহিক সাফল্য প্রশংসনীয়। তবে আগামীতে এই সাফল্য ধরে রাখা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। অনেক কারণে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির এই মডেল এখন চ্যালেঞ্জে পড়েছে। এত দিন রপ্তানি বাণিজ্যে প্রতিযোগী সক্ষমতার পেছনে ছিল তুলনামূলক কম মজুরি সুবিধা। এই সুবিধা এখন আর নেই। অন্যদিকে বিভিন্ন সেবা, রসদ ও অকাঠামো অপর্যাপ্ত এবং নিম্নমানের। অথচ এই সব সেবার পেছনে ব্যয় গুনতে হচ্ছে অনেক বেশি। এতে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান। বিশ^ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা সেবা এবং অবকাঠামো দুর্বলতা এবং এ সংক্রান্ত উচ্চ ব্যয়ের কথা তিনিও স্বীকার করেছেন। মশিউর রহমান বলেন, নৌ ও রেলপথে পণ্য পরিবহন ব্যয় অন্য পথের তুলনায় এখনো কম। তবে উদ্যোক্তারা সময় সাশ্রয়ের জন্য ট্রাকে পণ্য পরিবহনে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এতে ব্যয় বাড়ছে। পণ্য পরিবহনে এক সময় ট্রেন নির্ভরতা ছিল। নানা কারণে এখন আর সেটা নেই। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি প্রসঙ্গে দেশের শুল্ক আইনের সমালোচনা করেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, কোনো কারণে ক্রেতা পণ্য গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালে সেই পণ্য দেশে ফিরিয়ে আনেন উদ্যোক্তারা। আমদানি পণ্যে যে রকম শুল্কারোপ আছে, পণ্য ফেরত আনার এরকম ঘটনার ক্ষেত্রেও একই হারে শুল্ক দিতে হয়। প্রশাসনিক কিছু কারণ এবং ঢাকা-কেন্দ্রিক শিল্প স্থাপনের কারণেও উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। এ কারণে ঢাকার বাইরে শিল্প স্থাপনে প্রণোদনা দেওয়ার কথা চিন্তা করেছিল সরকার। তবে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে দেখা গেল, কারখানা ঢাকা বাইরে হলেও প্রতিষ্ঠানের হেড অফিস এবং বড় কর্মকর্তারা ঢাকার মধ্যেই আছেন। এ কারণে শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ আর আগায়নি। আঞ্চলিক যোগাযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম এবং মংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে নিজেদের বিভিন্ন রাজ্যে পণ্য পরিবহনের প্রস্তাব দিয়েছে ভারত। বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে।

বিশ^ব্যাংকের এই প্রতিবেদনটির মূল লেখক সংস্থার সিনিয়র অর্থনীতিবিদ মাতিয়াস হিরেরা দাপ্টিপ্প। তিনি বলেন, সেবা খাতে সংস্কার, পরিবহন এবং অন্যান্য সেবায় বিনিয়োগ হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সুবিধা এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়বে। তবে সেবায় বিনিয়োগ মানে আরও বেশি অর্থ ঢালা নয় বরং সেবায় দুর্বলতা শনাক্ত করে সুনির্দিষ্ট এবং মানসম্পন্ন বিনিয়োগ।

রপ্তানি বাণিজ্যে সক্ষমতা বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় বাড়ানো ও পণ্য বহুমুখীকরণে প্রধান হাতিয়ার হতে পারে মানসম্পন্ন সেবা। বিভিন্ন সেবায় দক্ষতা বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে পারে। পোশাক খাতের দ্বিতীয় রপ্তানিকারক দেশের মর্যাদা ধরে রাখা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। সেবার মান উন্নয়নে সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের সুপারিশ করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত