এবার ট্রেনে আগুন লেগে লাইনচ্যুত, আহত ৫০

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ০১:২৬ এএম

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ইঞ্জিনে আগুন ধরে রংপুর এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত হয়ে পুড়ে গেছে ইঞ্জিন ও তিনটি বগি। এতে অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ২টার দিকে উল্লাপাড়া রেলস্টেশনের আগে লেভেল ক্রসিংয়ে ঢাকা থেকে রংপুরগামী ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় দুই ট্রেনের সংঘর্ষে ১৬ জনের প্রাণহানির ঘটনার দুদিনের মাথায় এ দুর্ঘটনা ঘটল। এ ঘটনার প্রায় সাত ঘণ্টা পর রাত সোয়া ৯টার দিকে ঢাকার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের রেলযোগাযোগ স্বাভাবিক হয়। এ দুর্ঘটনার কারণে অনুসন্ধানে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। উল্লাপাড়া রেলস্টেশনের সহকারী স্টেশনমাস্টার মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, সন্ধ্যা ৭টার দিকে দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনটিকে উদ্ধার করতে পাকশী থেকে রিলিফ ট্রেন এসে উদ্ধারকাজ শুরু করে। রাত সোয়া ৯টার দিকে বিকল্প উপায়ে ব্রডগেজ লাইনে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। রাতের মধ্যেই মিটারগেজ লাইনেও ট্রেন চলাচল শুরু হতে পারে।

তিনি আরও জানান, রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি দুপুর ২টা ২ মিনিটের দিকে উল্লাপাড়া রেলস্টেশন ক্রসিংয়ের সময় স্টেশনের ৫০ গজ আগে হঠাৎ ইঞ্জিনে আগুন ধরে ইঞ্জিন ও ছয়টি বগি     

 লাইনচ্যুত হয়। এ সময় ইঞ্জিনের আগুন মুহূর্তে পাশের এসি কোচের তিনটি বগিতে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ইঞ্জিন ও তিন বগি মুহূর্তে পুড়ে যায়। এ দুর্ঘটনার পর প্রায় ৭ ঘণ্টা ঢাকার সঙ্গে উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের রেল চলাচল বন্ধ থাকে। এ ছাড়া এ রুটের বিভিন্ন স্টেশনে যাত্রী নিয়ে ৮টি ট্রেন আটকা পড়ে। সেগুলো হলো চিত্রা এক্সপ্রেস, লালমনি এক্সপ্রেস, পদ্মা এক্সপ্রেস, একতা এক্সপ্রেস, পঞ্চগড় এক্সপ্রেস, বেনাপোল এক্সপ্রেস, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস ও বনলতা এক্সপ্রেস।

সিরাজগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মঞ্জিল হক জানান, এ দুর্ঘটনার খবর পেয়ে উল্লাপাড়া, সিরাজগঞ্জ, শাহজাদপুর ও বেলকুচি ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। প্রায় আধঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তারা আহত ৭-৮ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠিয়েছেন।

এদিকে খবর পেয়ে উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান, সিরাজগঞ্জ জেলার স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক রায়হানা ইসলামসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

ট্রেনযাত্রী আনোয়ার হোসেন (৪৫), নাসিমাসহ (৩৫) একাধিক যাত্রী বলেন, কিছু বুঝে ওঠার আগেই ট্রেনটির ইঞ্জিনসহ বগিগুলো লাইনচ্যুত হয়। এরপর যাত্রীদের কান্নাকাটি ও হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। স্থানীয় লোকজন, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধারকাজ শুরু করেন।

উল্লাপাড়ার সোনতলা গ্রামের সবুজ মিয়া জানান, দুপুরে তিনি উল্লাপাড়া বাজারে যাওয়ার সময় দেখেছেন কিছু শ্রমিক দুর্ঘটনাকবলিত এলাকায় লাইনের নিচে পাথর দেওয়ার কাজ করছেন। তার ধারণা, রেলপথের ওই স্থানে মেরামতের কাজ শেষ না হতেই ট্রেনটি স্বাভাবিক গতির চেয়ে বেশি গতিতে চলায় এ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ফয়সাল আহমেদ জানান, উল্লাপাড়ায় ট্রেন দুর্ঘটনায় আহত কেউ এখানে চিকিৎসা নিতে আসেনি। তারা সবাই উল্লাপাড়া ২০ শয্যা হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে যে যার মতো উন্নত চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে চলে গেছে। ফলে তাদের অবস্থা জানা যায়নি। 

সিগন্যাল সিস্টেমে ত্রুটিতে দুর্ঘটনা : রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোফাজ্জেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, রংপুর এক্সপ্রেস ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া রেলস্টেশনে ইঞ্জিনসহ পাঁচটি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। ইঞ্জিনের ২-৩টি বগিতে আগুন লেগেছে।

ট্রেনটির ২ নম্বর লাইন দিয়ে স্টেশনে ঢোকার কথা ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিন্তু দায়িত্বরত স্টেশন পয়েন্টম্যান ১ নম্বর লাইনে সিগন্যাল দিয়ে দেন। এতে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয় এবং তেলের ট্যাংকি ফেটে বগিতে আগুন লেগে যায়।

তিনি বলেন, ‘ট্রেনকে এক লাইন থেকে অন্য লাইনে নেওয়ার জন্য যিনি দায়িত্বে থাকেন তাকে পয়েন্টম্যান বলে। তিনি হয়তো ঠিকমতো তার দায়িত্ব পালন করেননি। ফলে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়েছে বলে প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে। তবে আমাদের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গেছেন, তারা রিপোর্ট দিলে বিস্তারিত জানা যাবে।’ তবে দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি। ঈশ্বরদী থেকে ঘটনাস্থলে রিলিজ ক্রেন গেছে। খুব শিগগির সারা দেশের সঙ্গে রেলযোগাযোগ স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তদন্তে ৩ কমিটি : এই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত তিনটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রেল সচিব। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি, পশ্চিম রেলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্টের নেতৃত্বে চার সদস্যের রেলওয়ের একটি কমিটি এবং সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসন আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ফিরোজ মাহমুদকে প্রধান করে গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটির অন্য সদস্যদের নাম ও সময়সীমা জানানো হয়নি।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ডিভিশনাল ম্যানেজার (পাকশী) মিজানুর রহমান জানান, পাকশী প্রধান কার্যালয়ের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা আব্দুল আল মামুনকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে অন্য সদস্যদের নাম ও সময়সীমা জানাতে পারেননি তিনি।

এ ছাড়া পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট শহিদুল ইসলামকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছে রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত