পিকেএসএফ’র অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

ক্ষুদ্রঋণের কাক্সিক্ষত সুফল মানুষ পায়নি

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ০৩:০২ এএম

দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ঋণের ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কেউ কেউ এর প্রবক্তা হিসেবে নাম-যশ কামালেও বাস্তবতা হচ্ছে যে দেশের জনগণ এর অতটা সুফল পায়নি। তিনি বলেন, ‘এক সময় আমরাও এটাকে সমর্থন দিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম যে এর মাধ্যমে বুঝি মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারবে।’

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) আয়োজিত ‘উন্নয়ন মেলা ২০১৯’ উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন। সরকারপ্রধান বলেন, ‘কিন্তু যখন আমরা বিষয়টা আরও গভীরভাবে দেখলাম, তাতে দেখলাম, আসলে এর মাধ্যমে দারিদ্র্য ঠিক বিমোচন হয় না। দারিদ্র্য লালন-পালন হয়।’ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং পিকেএসএফের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারীদের উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে সাত দিনব্যাপী এ মেলার আয়োজন করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়া শুরু করেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মানুষকে কীভাবে সমবায়ের মাধ্যম একত্রিত করে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করে তাদের দারিদ্র্যসীমার থেকে বের করে আনবেন সেই পরিকল্পনাটাই জাতির পিতা নিয়েছিলেন।’ ‘২১ বছর পর দেশ পরিচালনায় এসেই আওয়ামী লীগ সরকার দারিদ্র্যকে দেশের প্রধান শক্র হিসেবে চিহ্নিত করে’ উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘দারিদ্র্যের বিরুদ্ধেই আমাদের লড়তে হবে এবং মানুষকে মুক্তি দিতে হবে। সে লক্ষ্যে আমাদের স্বল্প, দীর্ঘমেয়াদি এবং আশু পরিকল্পনা প্রণয়ন করি।’

শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নের পাশাপাশি ১০ বছরমেয়াদি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা গ্রহণ করে। অনুষ্ঠানে কৃষকদের কল্যাণ ও দারিদ্র্য নিরসন এবং কৃষির উন্নয়নে অসামান্য অবদানের জন্য সাবেক কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীকে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সম্মাননা স্মারক মতিয়া চৌধুরীর হাতে তুলে দেন। পুরস্কার হিসেবে একটি সম্মাননাপত্র, ক্রেস্ট এবং ৫০ হাজার টাকার চেক দেওয়া হয়। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর এমডিজির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়ন করে এবং সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন করা চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এগিয়ে চলছে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ। পাশাপাশি ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১০ বছরমেয়াদি প্রেক্ষিত পরিকল্পনার বাস্তবায়ন চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, ২০২১ থেকে ২০৪১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ কীভাবে গড়ে উঠবে সেই প্রেক্ষিত পরিকল্পনার খসড়া ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার নির্দেশ ছিল কৃষি ব্যাংক গ্রামে কৃষকদের কাছে চলে যাবে। হাটবারে গ্রামের হাটে বসে ঋণ প্রদান করবে এবং সেখান থেকেই আবার ঋণ সংগ্রহ করবে। এভাবেই আমরা কৃষকদের সহযোগিতা করেছি।’ কৃষকদের জন্য ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, কৃষি উপকরণ কার্ড প্রদান, বিএডিসিকে আরও উন্নত করে উন্নতমানের বীজ উৎপাদন ও বিতরণের উল্লেখ করেন তিনি।

‘ঘরে ফেরা’, ‘আমার বাড়ি আমার খামার’, ‘আশ্রয়ণ’সহ বিভিন্ন দারিদ্র্যবান্ধব কর্মসূচির উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশকে ভিক্ষুকমুক্ত করার জন্য সরকার এ ধরনের বিভিন্ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন করছে। তিনি বলেন, ‘আমরা ভূমিহীনদের জমি দিয়েছি। যারা গৃহহারা তাদের ঘর করে দিয়েছি এবং দিচ্ছি। মানুষ যাতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে সে ব্যবস্থা আমরা করেছি।’ সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচির ফলে বর্তমানে দারিদ্র্যের হার ২১ শতাংশে নেমে এসেছে উল্লেখ করে এই হারকে ১৫-১৬ শতাংশে নামিয়ে আনতে চায় তার সরকার, বলেন সরকারপ্রধান।

বাংলাদেশকে এখন আর কেউ অবহেলার চোখে দেখে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন অনেকের কাছেই ‘উন্নয়নের বিস্ময়’, উন্নয়নশীল এক দেশ। শেখ হাসিনা বলেন, পিকেএসএফকে ক্ষুদ্র ঋণের গ-ি থেকে বের করে এনে সামগ্রিক উন্নয়নে কাজে লাগাচ্ছে তার সরকার। বর্তমানে পিকেএসএফ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ছাড়াও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি প্রভৃতি বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে দেশে-বিদেশে একটি শীর্ষ স্থানীয় উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা লাভ করেছে। এছাড়াও পিকেএসএফ দেশের কৃষি খাতে আর্থিক পরিষেবার পাশাপাশি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজার সংযোগসহ কৃষির বিভিন্ন উপখাতের ভ্যালু চেইন ও দক্ষ উদ্যোক্তা উন্নয়নে কাজ করার মাধ্যমে দেশের অগ্রগতিতে বিশেষ অবদান রাখছেÑ বলেন প্রধানমন্ত্রী।

খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি মানুষের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে কাজ করার জন্য পিকেএসএফের সংশ্লিষ্টদের কাজ করার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা এবং দরিদ্র মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও পিকেএসএফ তার কর্মকা- সম্প্রসারিত করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। দেশের শিল্পায়ন এবং জনগণের কর্মসংস্থানের জন্য সারা দেশে ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কৃষিজমি যেন রক্ষা পায় এবং যত্রতত্র শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে দুই বা তিন ফসলি জমির যেন ক্ষতিসাধন করতে না পারে এবং বিনিয়োগ আসে সেজন্যই এ অঞ্চল প্রতিষ্ঠা।’ তিনি বলেন, ‘ভূমি ব্যবহারের জন্য সরকার নীতিমালা করে দিয়েছে। দুই বা তিন ফসলি জমি কেউ নষ্ট করতে পারবে না। কেউ এ ধরনের জমি নষ্ট করলে তারা সরকার প্রদত্ত সব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে।’

গ্রামীণ এলাকা থেকে পিকেএসএফের সহযোগী প্রতিষ্ঠানসহ, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা, গবেষণা ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সেবামুখী সংগঠনসহ ১৩০টি সংস্থার মোট ১৯০টিরও বেশি স্টল মেলায় স্থান পেয়েছে। মেলায় রয়েছে তৃণমূল পর্যায়ের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কৃষি, খাদ্য এবং প্রচলিত পণ্য। এছাড়া সাত দিনে পাঁচটি সেমিনারও হবে মেলায়। মেলা প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত চলবে।

পিকেএসএফ চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদের সভাপতিত্বে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির এবং পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মইনুদ্দিন আবদুল্লাহ স্বাগত বক্তব্য রাখেন।

এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য, ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, বিশিষ্ট ব্যক্তি, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও মিশনপ্রধানসহ বিদেশি কূটনীতিক এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত