জন্মভূমিতেই ঘুমিয়ে গেলেন

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০১৯, ১২:৫২ এএম

মইন উদ্দীন খান বাদলকে সবাই চেনেন। জাসদের নেতা; তার চেয়েও বড় মুক্তিযোদ্ধা; সমাজতন্ত্রের সংগ্রামী সঙ্গী। তিনি চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। লিখেছেন কাউছার আলম

ষাটের সেই উত্তাল সময়ের ছাত্র তিনি। ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের মারকুটে কর্মী, পরে নেতা। ধীরে ধীরে সামনে চলে এলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন বুনতে তৈরি হলো নিউক্লিয়াস। সেই আঁতুড়ঘরের অন্যতম হলেন তিনি। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মইন উদ্দীন খান বাদল। পাস করেছেন ১৯৭০ সালে। নিউক্লিয়াসের প্রধান ও তাত্ত্বিক সিরাজুল আলম খানের ঘনিষ্ঠ। একাত্তরের মার্চে শুরু হলো বাঙালির অসহযোগ। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানিদের সব ধরনের বয়কট করতে বললেন সবাইকে। ‘তাদের আমরা ভাতে মারব, পানিতে মারব’–কথাটির পর বললেন, ‘তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো।’ ফলে তৈরি হলো ছাত্র-জনতা-নারী-পুরুষ। সিরাজুল আলম খান কটি পোস্টার আর লিফলেট দিয়ে বাদলকে বললেন, যাও তোমার চট্টগ্রামে। সেগুলো নিয়ে কাজে নেমে পড়লেন তিনি। বলশালী, বিশালদেহী এই ছাত্রনেতা পা রাখলেন বোয়ালখালীতে।

এই চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতেই জন্মেছেন তিনি। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে। ভাষা আন্দোলনের ভালোবাসা জ্ঞান হওয়ার পর থেকে সারা জীবন ধরে লালন করেছেন সেই দিন জন্ম নেওয়া ছেলেটি। বাবা তার আহমদ উল্লাহ আর মা যতুমা খাতুন। বাবা ছিলেন পুলিশ অফিসার আর মা গৃহিণী। তাদের আট ছেলে, মেয়ের মধ্যে তিন নম্বর বাদল; প্রথম ছেলে সন্তান। পড়েছেন এখানে স্কুল-কলেজে, চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান। বোয়ালখালী পা রেখেই ঘরে গিয়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করে আবার বেরিয়ে পড়লেন স্বাধীনতার জন্য টগবগ করে ফুটতে থাকা ছেলেটি। ঢাকা থেকে এসেছেন, বীর যোদ্ধাদের অন্যতম, নিউক্লিয়াসের একজন; ফলে চারদিক থেকে হামলে পড়ল সবাই। পাক বাহিনী জানল, চোখে চোখে রাখতে শুরু করল আর গ্রাম, শহরের মানুষরা তাকে ঢাকা, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের ভবিষ্যতের প্রশ্নে সব সময় পাখির ছানার মতো আগলে রাখল। তিনিও কাজে নেমে পড়লেন। মানুষকে কী করতে হবে বললেন লিফলেটে, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ ভালো করে আরও জানালেন। পোস্টারগুলো একে একে ছড়িয়ে দিলেন সবার কাছে। বাঙালি তাদের অধিকারের লড়াইয়ে নামল পুরোপুরি। এর মধ্যে খবর এলো, সোয়াত নামের একটি বিরাট জাহাজ নিয়ে পাকিস্তানিরা এসেছে বন্দরে। তারা তাতে অস্ত্র ভর্তি করে এনেছে, আমাদের পাখির মতো গুলি করে মারবে। ফলে লালদীঘির ময়দান থেকে মিছিল নিয়ে লাখ লাখ মানুষ চট্টগ্রাম বন্দর ঘেরাও করতে গেলেন। তাদের অন্যতম নেতা মইন উদ্দীন খান বাদল; মমতাজ উদ্‌দীন আহমদ। আরও অনেক বিখ্যাত মানুষ আছেন। পাকিস্তানিরা আমাদের বিপক্ষে অস্ত্র নামাতে পারল না সবার চেষ্টায়। বাদলরা এরপর জয়ী হয়ে চলে গেলেন ভারতে। ফিরে এসে সৈয়দ আহমদ নামের এক বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করলেন। মুক্তিযোদ্ধা জালাল নামে বিখ্যাত আরেকজন ছিলেন তার তখন সঙ্গী। তিনি পরে কমিশনার হয়েছিলেন। আলাউদ্দিনের নামটিও বলেন অনেকে স্বাধীনতার লড়াইয়ে অবদানের জন্য। বাদল তাদের নিয়ে আস্তানা গেড়েছিলেন চট্টগ্রাম শহরে। তারা নৌ-মুক্তিসেনাদের বন্দরে অপারেশন পরিচালনা, তাদের পথের নির্দেশ ও কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণে পৌঁছে দেওয়াসহ সব কাজই করেছেন। চট্টগ্রাম শহরে থেকে পুরো শহরকে হানাদারমুক্ত করতে একের পর এক চেষ্টা করেছেন তারা। এখনো সেই দিনগুলোর কথা জ্বলজ্বল করে বোয়ালখালীর কদুরখীল উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান, মুক্তিযোদ্ধা হারুণ মিয়ার মনে– ‘আমাদের আস্তানা ছিল বোয়ালখালীতে; তবে সবসময় যোগাযোগ ছিল। নানা অপারেশনে তার নির্দেশ নিয়েছি।’ বিখ্যাত অপারেশন ‘জ্যাকপট’–অনেকগুলো নদীবন্দর থেকে একসঙ্গে পাকিস্তানি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার মতো ইতিহাসের বিরল ঘটনাটির জন্ম দিয়েছিলেন আমাদের নৌ-কমান্ডোরা; তাতে মইন উদ্দীন খান বাদল ছিলেন নেতার মতো। তিনি নৌ-মুক্তিযোদ্ধাদের একত্র করেছেন চট্টগ্রামে। তাদের এই অপারেশনে জয়ী করেছেন। তাদের সবার চেষ্টায়, বাংলার মানুষের ভালোবাসায় একটি স্বাধীন দেশের জন্ম হলো অবশেষে।”

নতুন রাষ্ট্রকে সবার জন্য বাসযোগ্য আর খাওয়ার অধিকার সবার থাকবে; শিল্প-সংস্কৃতিতে দেশটি এগিয়ে রবে– এই আশায় আরও অনেকের মতো এই দেশটি সব মানুষের জন্য প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন তারা। ফলে মইন উদ্দীন খান বাদলকে প্রিয় ছাত্রলীগ ছাড়তে হলো। তৈরি করলেন তারা নতুন একটি স্বপ্ন– জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। তবে সেখানেও স্বপ্নপূরণ করতে পারলেন না। চলে গেলেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলে (বাসদ)। তবে লড়াইয়ে পিছু হটলেন না। ১৯৭৪ সালে সমাজতন্ত্র কায়েমের স্বপ্নে তারা ঘেরাও করলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি। সেই ১৭ মার্চ পুলিশ গুলি চালাল নতুন স্বপ্নবাদী মানুষগুলোর ওপর। তিনি গুলি খেলেন। আহত হলেন খুব। সারা জীবন পরে এজন্য কষ্ট পেয়েছেন তিনি। তবে পেছনে যাননি কোনোদিন। কর্নেল তাহের (অব.), বীরউত্তম গণবাহিনী গড়লেন মানুষকে নিয়ে। তারা সমাজতন্ত্রের জন্য অস্ত্র হাতে যুদ্ধ শুরু করলেন। চট্টগ্রামের কমান্ডার তাদের মুক্তিযোদ্ধা মইন উদ্দীন খান বাদল। তবে শেষ পর্যন্ত স্বপ্নটি পূরণ হলো না। নতুন স্বপ্নের দিশা দিয়ে গেল সবাইকে। জাসদ হলো নিষিদ্ধ, বঙ্গবন্ধু হলেন শহীদ। মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউর রহমান নামের সেনাপ্রধান ও বিখ্যাত আরেক মুক্তিযোদ্ধা হলেন দেশের শাসক। তার সঙ্গে আলোচনার টেবিলে এলো নিষিদ্ধ জাসদ। সেই কমিটিতে ছিলেন বাদলও। তারা দলকে মুক্ত আলোয় নিয়ে এলেন। পরে এলেন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তার আমলেও পেছনে সরেননি তিনি। জেলখানার অন্ধ কারাগারে থেকেই কাটল অনেকগুলো বছর। তবে বাদলকে দমানো গেল না। যে স্বপ্ন তাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে, সেটি ভালোবাসার চাদরে আগলে রেখেছেন সবসময়। এরপর অনেক জল গড়াল। তিনি বঙ্গবন্ধুর মেয়ে ও বিখ্যাত রাষ্ট্রনেতা শেখ হাসিনার সঙ্গী হলেন আদর্শের প্রশ্নে। গড়ে তুললেন তারা ১৪টি দলের ঐক্য ফোরাম। আসন তার জন্মভূমি চট্টগ্রামের চাদগাঁও-বোয়ালখালী; সংসদে চট্টগ্রাম ‘আট’। সেখান থেকেই নৌকায় তিন বার সংসদ সদস্য হলেন জাতীয় সংসদে।

আজও আলোচনায় আছে তার সংসদে অনর্গল, দারুণ ও জনবান্ধব বক্তব্য। সেগুলো লেখা আছে– ‘সত্যের স্পর্ধিত উচ্চারণ’ নামের ভাষণ সংকলনে। আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য, দেশের প্রতি যারা ভালোবাসা রাখেন। ছিলেন তিনি জাতীয় সংসদের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কমিটি এবং মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় কমিটির অন্যতম সদস্য।

অনেক কাজ করেছেন ১১ বছরের সংসদ সদস্যের জীবনে। বোয়ালখালীর মোট ২১৩ কিলোমিটার পথ পাকা করে দিয়েছেন। ৫০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা তার কারণে পাকা স্কুলঘরে পড়ে। ৮০ কোটি টাকা খরচ করে কর্ণফুলীর পাশের এলাকা নদীভাঙন থেকে বাঁচানোর জন্য বাঁধ করে দিয়েছেন। বোয়ালখালী ফায়ার সার্ভিস স্টেশনটিও তার করা। মুক্তিযুদ্ধ কমপ্লেক্স তৈরি করে দিয়েছেন। বদুরখীল উচ্চ বিদ্যালয় সরকারি করেছেন। বোয়ালখালী মুক্তিযোদ্ধা বাছাই কমিটির প্রধান ছিলেন তিনি। শেষ ইচ্ছে ছিল জীবনের, কালুরঘাট নতুন সেতু তৈরি করা। সংসদে বলেছিলেনও, ‘এলাকায় এই সেতুর অভাবে মুখ দেখাতে পারি না। মানুষ আমাকে মা-বাবা তুলে গালাগালি করে। অথচ তারা আজ কবরে। আর সহ্য হয় না।’ বারবার বলেও কোনো উদ্যোগ শেখ হাসিনার সরকার না নিলে তিনি ডিসেম্বরে সেতু না হলে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রতিবাদে। পরে সরকার সেটি করে দিল। কর্ণফুলী নদীর ওপর দুটি সেতু–একটিতে রেল অন্যটিতে বাস, গাড়ি চলবে; ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে কাজ শুরু হবে। এই কাজের শুরু তিনি করেছিলেন ২০১২ সালে। চারটি আলাদা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে সেতু তৈরি যাচাইয়ের উদ্যোগও নিয়েছিলেন সরকারের মাধ্যমে। তবে সেই সত্যি স্বপ্ন দেখার সৌভাগ্য হলো না বিখ্যাত এই সমাজতান্ত্রিক নেতার। দেশে অনেকদিন চিকিৎসা করার পর ভারতের ব্যাঙ্গালুরুর নারায়ণ হার্ট রিসার্চ হসপিটালে মারা গেলেন তিনি এই বছরের ৭ অক্টোবর। জাতীয় সংসদ, ঢাকা ও চট্টগ্রামে কয়েকবার জানাজার পর মইন উদ্দীন খান বাদলকে তার মা-বাবার কবরের পাশে সরোয়াতলী গ্রামে খান বাড়ি কবরস্থানে চিরকালের জন্য শোয়ানো হয়। তিনি কর্ম রেখে চলে গেলেন।

বারবার হেরেছেন জীবনে। আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন বাদল বাংলাদেশের জন্য। ২০১৬ সালের ১২ মার্চ ন্যাশনাল কাউন্সিলে তার প্রিয় দলটি আবার ভেঙে গেল। হাসানুল হক ইনু ও শিরীন আখতারের জাসদকে নির্বাচন কমিশন স্বীকৃতি দিল জাসদ বলে। শরীফ নুরুল আম্বিয়া সভাপতি হয়ে যে জাসদ গড়লেন, সেটি নির্বাচনের স্বীকৃতি পেল না। তাদের কার্যকর সভাপতি তিনি। নিজের, দলের কাজগুলো করেছেন সারা জীবনভর এখানেও।  

তিনটি ছেলে আর একটি মেয়ে তাদের। স্ত্রী সেলিনা খানকে বিয়ে করেছেন ১৯৮৫ সালে।  স্ত্রী চাঁদপুরের মানুষ। রাজনীতি, বাংলাদেশের জন্য লড়াইয়ে দেরিতে বিয়ে তার। বড় ছেলে সোহেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিমানের ইঞ্জিনিয়ার, পরের জন শাকিল বাংলাদেশে ব্যবসায়ী; তৃতীয় ছেলে তৈমুর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জে পি মর্গান ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট। মেয়ে জাহিরার স্বামী নাফিস শিকদার একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মালিক। তারা সবাই এখন দেশে। তাদের বাবার সাদা পাঞ্জাবি প্রিয় পোশাক ছিল, প্রিয় মাছ কৈ। স্কুল-কলেজের উন্নয়নে কোনোদিন তার কাছ থেকে ফেরেনি কেউ। এই দেশ যে তার

বড় প্রিয় ছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত