কারাগারে বসেই আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা সব ধরনের কলকাঠি নাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, কারাবন্দি অধিকাংশ শীর্ষ সন্ত্রাসীই নিয়ন্ত্রণ করছে অপরাধজগৎ। দীর্ঘদিন ধরেই কারাগারের বাইরে থাকা সহযোগীদের দিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি ও মাদক কারবার চালাচ্ছে তারা।
অভিযোগ আছে, কারারক্ষী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারাও ওইসব কারবারিকে দিনের পর দিন সহায়তা করে আসছেন। চাহিদা অনুযায়ী ব্যবসায়ীরা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সহযোগীদের কাছে চাঁদা দিচ্ছেন। তাদের ভয়ে কেউ কথা বা প্রতিবাদ করতে পারেন না। প্রাণনাশের আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা পুলিশকে অবহিত বা সাধারণ ডায়েরি করছেন না। আরও অভিযোগ আছে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কারাবন্দি সন্ত্রাসীদের অবাধ যোগাযোগ আছে। কারাগার থেকে আদালতে নেওয়ার পর সহযোগীদের সঙ্গে বৈঠকও হয় তাদের। সে সময় সাঙ্গপাঙ্গদের দিকনির্দেশনা দেয় তারা। অবশ্য কারাবন্দি শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সহযোগিতার বিষয়টি অস্বীকার করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কারাগারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
এ প্রসঙ্গে কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মামুন গত বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কারাগারে আটক শীর্ষ সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে সব অপরাধীকেই কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়। কোনো সন্ত্রাসীকে আদালতে নেওয়ার পর আমাদের আর দায়িত্বে থাকে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘কারাগারের গেট থেকে বের হওয়ার পরই পুুলিশের জিম্মায় চলে যায় ওইসব আসামি বা সন্ত্রাসী। এতটুকু বলতে পারি, কারাগারের ভেতর থেকে কেউ অপরাধ করতে পারে না। কারাগারের ভেতরের বিভিন্ন স্থানে জ্যামার বসানো আছে। যার ফলে কেউ মোবাইলে কথা বলতে পারে না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর মিরপুরের এক ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে জানান, গত দেড় বছরে শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘কিলার’ আব্বাসকে কারাগার থেকে বের করে আনতে তার সহযোগীরা অন্তত পাঁচবার চাঁদা দাবি করেছে। তিনি বলেন, ‘প্রথমে চেয়েছিল ১ লাখ টাকা। ১০ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সন্ত্রাসীরা টাকা নেয়নি। উল্টো পরিবারসহ সবাইকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। প্রথমে মনে করেছিলাম বিষয়টি পুলিশকে জানাব। কিন্তু পরিবারের কথা চিন্তা করে তা থেকে সরে আসি। তবে কয়েক মাস হলো সন্ত্রাসীরা ডিস্টার্ব করছে না। ওইসব সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করতে পারে না।’
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কারাগার থেকে অনেকে চাঁদাবাজি ও মাদক কারবার চালাচ্ছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। ইতিমধ্যে কারা কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি
অবহিত করা হয়েছে। আদালতে আনা-নেওয়ার সময় পুলিশের কোনো সদস্য সন্ত্রাসী বা হাজতিদের কোনো সহায়তা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ কারাবন্দি সন্ত্রাসীদের সহযোগীদের ধরতে থানা পুলিশের পাশাপাশি র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা কাজ করছেন বলে জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টরা জানায়, দেশের বিভিন্ন কারাগারে আটক বেশিরভাগ সন্ত্রাসী আরাম-আয়েশে দিন কাটাচ্ছে। অন্য কয়েদিরা তাদের ভয়ে কথা বলতে পারে না। তারা কারাগারের ভেতর যা চায় তা-ই পায়। আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা রয়েছে কেরানীগঞ্জ, কাশিমপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ বেশ কয়েকটি কারাগারে। তারা কারাগারে বসেই নানা অপকর্ম করছে। একশ্রেণির কারারক্ষীকে ম্যানেজ করে তারা মোবাইল ফোনে সাঙ্গপাঙ্গদের সঙ্গে সলাপরামর্শ করেন। এলাকায় আধিপত্য ধরে রাখার পাশাপাশি মাদক কারবার ও চাঁদাবাজির দিকনির্দেশনা দেয়। আদালতে হাজিরা বা জামিন আবেদন করার সময় পরিবার ও সহযোগীদের সঙ্গে প্রকাশ্য মিটিং করে। একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্যকে ম্যানেজ করে তারা এসব অপকর্ম করছে।
মাসখানেক আগে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে বের হওয়া সন্ত্রাসী রবিন (ছদ্মনাম) এ প্রতিবেদককে জানান, আন্ডারওয়ার্ল্ডের কয়েকজন সন্ত্রাসী ওই কারাগারে রয়েছে। তারা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। আত্মীয় পরিচয় দিয়ে সন্ত্রাসীদের সহযোগীরা প্রতি সপ্তাহে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দিকনির্দেশনা নেয়। সে অনুযায়ী এলাকায় কাজ করে তারা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিরপুরের ঝুনু নামে এক সন্ত্রাসী দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকলেও তার অপরাধ কর্মকা- একটুও থেমে নেই। তার অন্যতম সহযোগী চন্দন ও রনি ওরফে ভাইস্তা রনি, মালেক ও আনোয়ার এলাকায় চাঁদাবাজি ও মাদক কারবার চালিয়ে আসছেন। তাদের সঙ্গে শাসক দলের স্থানীয় নেতাদের সুসম্পর্ক রয়েছে। মিরপুর ১ ও ২ নম্বরের শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদতের অন্যতম সহযোগী রকি, সুমি, বুচি, রাজীব হোসেন, পাইলট, রুবেল সর্দার, সোহেল, মামুন হোসেন, দুলাল হোসেন, সুজন ও রাব্বি মিরপুরের বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি ও মাদক কারবার চালিয়ে আসছেন। শাহাদতের আরেক সহযোগী মোহন কারাগারে থেকেই অপরাধ কর্মকা- চালাচ্ছেন। নারায়ণগঞ্জ কারাগারে বন্দি পুরস্কারঘোষিত সন্ত্রাসী ‘কিলার আব্বাস’ কাফরুল ও ইব্রাহিমপুর এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন। আত্মীয়স্বজন সেজে সহযোগীরা প্রতি সপ্তাহে তার সঙ্গে দেখা করে দিকনির্দেশনা নিয়ে আসে। কারাগারে আটক অবস্থায় তিনি সন্তানের বাবা হয়েছেন বলেও অভিযোগ আছে। ২০০৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি খিলগাঁও থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সন্ত্রাসী দেশ রূপান্তরকে জানান, কারাবন্দি হাজারীবাগের ‘লেদার লিটন’ ও টিটনের নির্দেশনায় হাজারীবাগে এবং ‘ফ্রিডম রাশু’ ও ‘ফ্রিডম সোহেল’-এর নির্দেশনায় মালিবাগ, মৌচাক, চৌধুরীপাড়াসহ কয়েকটি এলাকায় মাদক কারবার ও চাঁদাবাজি চলছে। ওই সন্ত্রাসী আরও জানান, মোহাম্মদপুরের ‘পিচ্চি হেলাল’ কারাগার থেকেই অপরাধজগৎ চালাচ্ছেন। তার ছোট ভাই দিপু এলাকার কলকাঠি নাড়ছেন। তাকে সহায়তা করছেন জেনেভা ক্যাম্পের মুর্তাজা ওরফে নাটু মুর্তাজা, ইসতিয়াক, মোল্লা আরশাদ, টেরু সেলিম, চুয়া সেলিম, সাহাবুদ্দিন, আলমগীর, আরমান, সাকিল, মোল্লা আনোয়ার, ইল্টা সালাম, জুম্মন, কুদ্দুস, কালা রাজু, বেজি নাদিম, ফরমা আসলাম, চায়না সুমন, পটল, কানা জিলানী, আসলাম, ফয়সাল, জসিম, ফরমা মনু ও হীরা।
গত ১ নভেম্বর মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোড ও তাজমহল রোডে অভিযান চালিয়ে ১৬ হাজার ইয়াবাসহ ইমরান ও নাদিম নামে দুই সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ আছে, তাদের নির্দেশে সহযোগীরা এখনো মাদক কারবার চালাচ্ছে। পায় মাদক কারবারের কমিশন। তাদের নামে দোকানপাটে চাঁদা আদায় করা হয়। এছাড়া পানির লাইনের নামসহ নানা খাতেও চাঁদা তোলা হয়। রামপুরার শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘কাইল্যা পলাশ’ এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করছেন। বছর দুয়েক আগে কারাগারে থাকাবস্থাতেই সন্তানের বাবা হয়েছেন তিনি। অভিযোগ আছে, কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ‘কাইল্যা পলাশ’ পুলিশ ও কারারক্ষীদের সহায়তায় বাসায় অবাধে যাতায়াত করেন।
রামপুরার এক ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে জানান, মাসখানেক আগে শাহজাদা নামে এক সন্ত্রাসী তার কাছে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন। শাহজাদা বলেন, ‘ভাইকে মুক্ত করতে হবে। অনেক টাকা লাগবে।’ পরিবারের কথা চিন্তা করে ওই ব্যবসায়ী তাকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে দেন। বিষয়টি তিনি পুলিশকে জানাননি।
২০০৩ সালে কুমিল্লার কোতোয়ালি থেকে গ্রেপ্তার হন শীর্ষ সন্ত্রাসী মশিউর রহমান কচি এবং ২০০৫ সালের ৩ জুন রাজধানীর ধানমণ্ডির একটি ফ্ল্যাট থেকে গ্রেপ্তার হন আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী আরমান মিয়া। শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলামও এখন কারাগারে। এছাড়া তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন, শহিদুল ইসলাম ঈদুল, ‘বোমা মোক্তার’, ইসহাক সরকার, নাঈমুল হোসেন ওরফে তাজ দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে বসেই অপকর্ম করছেন। অভিযোগ আছে, চট্টগ্রামের নাহিদুল ইসলাম জাবেদ, অভিক দাশগুপ্ত, বিপ্লব দে, আনিস, নুরুন্নবী ও অনিন্দ্য বৈদ্য সানি কারাগারে থেকেই বাইরের চাঁদাবাজি ও মাদক কারবার চালিয়ে আসছেন সহযোগীদের মাধ্যমে। তারা শিবির ক্যাডার সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী হিসেবে পরিচিত।
