ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত করেনি কৃষি মন্ত্রণালয়। তাৎক্ষণিক হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা নির্ধারণ করলেও তাদের কী ধরনের ক্ষতি হয়েছে সেটা হিসাব করা হয়নি। এই অবস্থায় মাঠপর্যায়ে সমীক্ষা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এই সমীক্ষায় কোন কৃষককে কীভাবে পুনর্বাসন ও প্রণোদনা দেওয়া হবে সেটা চূড়ান্ত হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে দ্রুত অর্থ ছাড় করবে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত সপ্তাহে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৬ জেলার ১০৩ উপজেলায় ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে কৃষি খাতে ২৬৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের মধ্যে রোপা আমন, শীতকালীন সবজি, সরিষা, খেসারি, মসুর ও পানের বরজের বেশি ক্ষতি হয়েছে। ওই অঞ্চলের ৫০ হাজার ৫০৩ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে প্রাথমিক হিসাবে উঠে এসেছে। এখন এসব কৃষকের ক্ষতিপূরণ বিষয়ে কাজ চলছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। তবে কোন প্রক্রিয়ায় এসব কৃষককে পুনর্বাসন করা হবে তা চূড়ান্ত হয়নি।
ক্ষয়ক্ষতি চূড়ান্তের বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উপকরণ অধিশাখা) মুনিরা সুলতানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এর আগে যে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দেওয়া হয়েছিল সেটা ছিল প্রাথমিক। এখন কোন জেলায় কী ধরনের ফসলের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তাদের কীভাবে ক্ষতিপূরণ দিলে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। সেটা নিয়ে কাজ হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের এই সমীক্ষা হয়ে গেলে বুঝা যাবে কী প্রক্রিয়ায় তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া লাগবে। কত টাকার দরকার হবেÑ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাধারণত ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে বীজ, সার ও লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া হয়। তারা যেন আবারও ফসল উৎপাদনে ফিরে যেতে পারে, সেসব সহায়তা দেওয়া হয়। এবারও তাই দেওয়া হতে পারে। মাঠপর্যায়ের অ্যাসিসমেন্ট (সমীক্ষা) প্রতিবেদন পেলে এই সপ্তাহেই চূড়ান্ত হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আঘাত হানা জেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতক্ষীরা জেলায়। এছাড়া অন্যান্য জেলার মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাগেরহাট, লক্ষ্মীপুর, পিরোজপুর, বরগুনা, ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, ঝালকাঠী, ফেনী, খুলনা, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ ও নড়াইল। এই ফসলের মধ্যে রয়েছে রোপা আমন, শীতকালীন সবজি, আলু, সরিষা, চীনাবাদাম, খেসারি, ধনিয়া, মসুর, মাষকলাই, মুগ, পেঁয়াজ, রসুন, কুল, পেঁপে, কলা ও পানের বরজ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার কৃষকদের ব্যাপারে খুবই আন্তরিক। দুর্যোগের ওপর কারও হাত নেই। তবে ক্ষতিগ্রস্তরা যেন আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তার জন্য সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই কাজটি করে মূলত কৃষি মন্ত্রণালয়। তারা অর্থ সহায়তা সংক্রান্ত কোনো চিঠি পাঠালে দ্রুত ছাড় করার ব্যবস্থা করা হবে। তবে এখন পর্যন্ত ওই ধরনের কোনো চিঠি আসেনি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত এসব জেলায় ২ লাখ ৭৯ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রোপা আমনের ক্ষতি হয়েছে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৫৭৪ হেক্টর জমির। শীতকালীন ফসল ১৬ হাজার ৮৮৪, সরিষা ১ হাজার ৪৭৬, খেসারি ৩১ হাজার ৮৮, মসুর ১৯৫ ও পানের বরজ ২ হাজার ৬৬৩ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এছাড়া ৩ হাজার ১২৬ হেক্টর জমির অন্যান্য ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে খুলনা, মাদারীপুর, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, পটুয়াখালী ও শরীয়তপুরে ১১ জন নিহত হয়েছেন। তারা সবাই গাছচাপায় মারা গেছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৪৮ জন।
কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক সম্প্রতি জাতীয় সংসদে জানান, বুলবুলের আঘাতে যে রকম আশঙ্কা করা হয়েছিল, তত ক্ষতি হয়নি। এখন পর্যন্ত যতটুকু পেয়েছি, তা একেবারেই তাৎক্ষণিক হিসাব। ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দিতে আরও সাত-আট দিন সময় লাগবে।
গত ১২ নভেম্বর উপকূলে আঘাত হাতে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। তাতে কৃষকের ফসলের ক্ষতি ছাড়াও বিপুল সংখ্যক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত জেলার দরিদ্র পরিবারগুলো দূর্ভোগে পড়েছে।
