রেকর্ড পরিমাণ দাম বাড়ার পর এখন পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি দামে পেঁয়াজ কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশের ক্রেতাদের। পেঁয়াজের দামে নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাসের মধ্যেই এখন বাজারে বাড়তে শুরু করেছে চালের দাম। আদা, রসুন ও বিভিন্ন সবজির দামও ঊর্ধ্বমুখে ছুটছে। চালের বাজারে অস্থিরতার বিষয়ে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নিজেই ‘বাজার কারসাজির’ বিষয়ে সতর্ক করলেও চাল ব্যবসায়ীদের কথিত ‘সিন্ডিকেট’ ভাঙতে তেমন কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি সরকার। গত তিন মাসে রেকর্ড পরিমাণ আমদানির পরও মোটা চালের কেজি পৌঁছে গেছে ৫০ টাকায়। বাণিজ্যমন্ত্রী ও খাদ্যমন্ত্রী মিল মালিকদের কারসাজিকে দুষছেন। ‘সিন্ডিকেট করে’ দাম বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারাও। চালের বাজারে এ অস্থিরতা শুরু হয়েছে কয়েক মাস আগেই। কোরবানির ঈদের পর চালের দাম চড়তে থাকে। মোটা চালের দাম ৫০ টাকা ছাড়িয়ে যায়, সরু চাল ছাড়ায় ৬৫ টাকা। সরকারি সংস্থা টিসিবির হিসেবেই মোটা চালের দাম গত এক মাসে বেড়েছে ১৮ শতাংশ, এক বছরে ৫০ শতাংশ। গত বছরের এই সময়ে মোটা চাল ৩৩ থেকে ৩৬ টাকা এবং সরু চাল ৪২ থেকে সর্বোচ্চ ৫৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এ অবস্থায়, দেশে ধানের সন্তোষজনক উৎপাদন এবং যথেষ্ট মজুদ থাকা সত্ত্বেও বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা দেখা যাচ্ছে, তার দায় সরকারের ওপরই বর্তায়।
সোমবার দেশ রূপান্তরে ‘চালেও সিন্ডিকেটের শঙ্কা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে জানা যায়, দেশে চিকন চালের দাম কেজি প্রতি ৫ থেকে ৭ টাকা বৃদ্ধি এবং চালের বাজারে অস্থিরতার পরিপ্রেক্ষিতে, খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার সারা দেশের চালকল মালিকদের ডেকেছিলেন চালের দাম না বাড়ার প্রতিশ্রুতি আদায়ের জন্য। তবে ব্যবসায়ীরা উল্টো তাকেই জানিয়ে দেন, দাম আরও বাড়তে পারে। নতুন পরিবহন আইন বাস্তবায়ন হলে ফিটনেসবিহীন আনেক ট্রাকের চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে। এতে পরিবহন খরচ ও সময় বেড়ে গেলে চালের বাজারে প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে, খাদ্যমন্ত্রী জানান, কিছুদিন আগেই চালকল মালিকরা চাল রপ্তানি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মন্ত্রিসভায় আলোচনার পর চাল রপ্তানি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি, দেশে এখন খাদ্যশস্যের সর্বকালের সর্ববৃহৎ সরকারি মজুদ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন খাদ্যমন্ত্রী। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আমন ধানের মৌসুম পুরোপুরি শুরু হতে এখনো ১৫ দিনের মতো বাকি। বাজারে বোরোর চিকন চালের জোগানও প্রায় শেষ। কার্তিকের শেষ ও অগ্রহায়ণের শুরুতে বাজারে চিকন চালের কিছুটা সংকট অস্বাভাবিক নয়। তবে, সরকারি মজুদ এবং ডিলারদের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজারের এ ঘাটতি মোকাবেলা করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না। উপরন্তু, নতুন সড়ক পরিবহন আইনকে ঘিরে পরিবহন সংকটের যে শঙ্কার কথা চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, তা খুবই উদ্বেগজনক। অন্যদিকে, জুলাইয়ের শুরু থেকে গত আড়াই মাসে ছয় লাখ টন চাল আমদানি হলেও বাজারে এর প্রভাব পড়েনি। এ বিষয়ে চালকল মালিকদের বক্তব্য, সরকারের চাল কেনার ঘোষণায় চালের বাজারে প্রভাব পড়েছে।
ধান-চালের দাম নিয়ে সাধারণভাবে আলোচিত দীর্ঘদিনের ধারণা হলো চালের দাম বাড়লে গরিব মানুষসহ সাধারণ ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন, আর চালের দাম কমলে সাধারণ কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফসলের মৌসুমে কৃষকরা যেমন ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনি ধানকাটার মৌসুমেও চালের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু কৃষি অর্থনীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনায় এটি দুর্বোধ্য কোনো ধাঁধা নয়।
কৃষককে উৎপাদন খরচ, রোগবালাই ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানির অভিঘাত মোকাবিলা করতে হয়। এসব ধাপ পেরিয়েই কৃষক ধান নিয়ে বাজারে আসেন। কিন্তু এক্ষেত্রে নতুন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রথাগত চালকলগুলোর গুরুত্ব কমে গিয়ে অটো রাইসমিলের একচেটিয়া রমরমা। আগে স্থানীয়ভাবে ধান ভাঙিয়ে কৃষকরা স্থানীয় ফড়িয়াদের কাছে তা বিক্রি করতেন। এখন বৃহৎ পুঁজি ও বড় ব্যবসায়ীদের মাধ্যমেই স্থানীয় বাজারও নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে। ফলে এখানে ‘সিন্ডিকেট’ করার সুযোগ বেড়েছে। এখানে মূল সংকট কৃষক বা উৎপাদক নয়, মুনাফার প্রায় পুরোটই চলে যায় চালকল মালিক-আড়তদার-ব্যবসায়ীসহ মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষির যান্ত্রিকীকরণ এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পিত সমন্বয় আনতে হবে। ধান-চালের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ীদের কথিত সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ যেমন জরুরি, তেমনি উৎপাদনের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে মজুদ-আমদানি-রপ্তানি ও বাজার ব্যবস্থাপনায় মন দেওয়া জরুরি। চাল-ডাল-পেঁয়াজ-রসুন-সবজির মতো প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারকে অবশ্যই আন্তরিকতা এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। কেননা, দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর অভিঘাত যেমন অনেক তেমনি খাদ্যদ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাবও মারাত্মক।
