প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা গত রবিবার থেকে শুরু হওয়ার পর গতকাল সোমবার পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট ১৫ শিশু বহিষ্কার হয়েছে। পরীক্ষায় অসাধুপন্থা অবলম্বন করার অভিযোগে এসব শিশুকে বহিষ্কার করা হয়। এ বিষয়ে নির্দেশনাও রয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের। তবে শিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী, শিক্ষক এমনকি অভিভাবকরা বলছেন, কোমলমতি শিশুদের এ ধরনের বহিষ্কার তাদের ওপর এক ধরনের মানসিক নির্যাতন। যারা পরীক্ষা কিংবা নকল করার বিষয়টিই এখনো ঠিকমতো বুঝে
উঠতে পারেনি। এ ব্যাপারে কর্তব্যরত শিক্ষকরা আরও সচেতন হলে এ ধরনের বহিষ্কার এড়ানো যেত। শিশুদের বহিষ্কারের বিষয়টি নির্দেশনায় রাখা কতটা যৌক্তিক তা ভাববার বিষয় রয়েছে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরাও।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো দুটি প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গত রবিবার পরীক্ষার প্রথম দিন ইংরেজি বিষয়ে রংপুর বিভাগের দশ এবং ঢাকা বিভাগের এক ইবতেদায়ী পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। অন্যদিকে গতকাল অনুষ্ঠিত বাংলা বিষয়ের পরীক্ষায় একই বিভাগের চার পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়।
প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র থেকে দেখা গেছে, প্রবেশপত্রটির উল্টো পাশে ‘পরীক্ষার্থীদের জন্য নিয়মাবলি’ উল্লেখ করে ১১টি নিয়ম তুলে ধরা হয়েছে। এর ২ নম্বর পয়েন্টে বলা হয়েছে, পরীক্ষার হলে প্রবেশপত্র ছাড়া অন্য কোনো অননুমোদিত কাগজপত্র বা ক্যালকুলেটর বা মোবাইল ফোন সঙ্গে আনা যাবে না। অথচ এগুলো সঙ্গে আনলে বহিষ্কার করা হবে কি না তা বলা নেই।
অন্যদিকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে গত বছর ডিসেম্বরে জারি করা এক নির্দেশনার ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘শৃঙ্খলা লঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা’ বিষয়বস্তুতে কয়েকটি পয়েন্ট উল্লেখ করে বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, পরীক্ষার হলে একে অন্যের সঙ্গে কথা বললে, অননুমোদিত কাগজপত্র বা বস্তু সঙ্গে রাখলে, অন্যকে দেখানোর কাজে সহযোগিতা করলে, উত্তরপত্র ছাড়া অন্যকিছুতে লিখে আনলে তাকে ওই বিষয়সহ অন্যান্য বিষয়ের পরীক্ষা থেকে বহিষ্কার করা যাবে অথবা তার পরীক্ষা বাতিল করা যাবে।
কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে এমন কঠোর ব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিগত কয়েক বছর ধরে আমরা বারবার সরকারের কাছে পঞ্চম শ্রেণির এ পাবলিক পরীক্ষাটি বাতিল করার জন্য আবেদন জানিয়ে আসছি। এ পরীক্ষার কারণে শিক্ষার্থীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চলে। ‘জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০’-এ এই পরীক্ষার কথা বলা হয়নি। তারপরও এই পরীক্ষা চলমান।’ তিনি আরও বলেন, ‘যারা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেয় তাদের বয়স বড়জোর ১১-১২ বছর। এ বয়সে শিশুদের পরীক্ষা কী সেটাই ঠিকমতো বোঝার কথা নয়। আবার নকল করা বা অসদুপায়ের অর্থও তো বোঝার কথা নয়। যদি শিশুরা সেটা করেও থাকে তাহলে তাকে ক্লাস থেকে শিক্ষকরা তাদের নৈতিক শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। অসদুপায়ের অভিযোগ দিয়ে কোমলমতি শিশুদের বহিষ্কার করার মতো ঘটনা অন্তত শিক্ষকদের জন্য লজ্জার। ক্লাসে তাদের সেভাবে কাউন্সেলিং করা হয় না। তারপরও পরীক্ষার হলে তাকে যদি বোঝানো হতো “এটা ঠিক নয়, এটা একটা অন্যায় কাজ। এগুলো করতে নেই”Ñ হলে দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরা সচেতন হলেও এ ধরনের ঘটনা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল।’ বহিষ্কারের নিয়ম রাখার প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি চাই এ পরীক্ষাটিই বাতিল করা হোক। যদি আপাতত সেটা সম্ভব না হলেও শিশুদের বহিষ্কারের নির্দেশনা এখনই বাতিল করার দাবি জানাচ্ছি।’
এদিকে শিশুদের শাস্তি দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাদের মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ঢুকিয়ে দেওয়া হয় উল্লেখ করে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘শিশুরা কোমলমতি। তারা অপরাধ করে না, তারা ভুল করে। ভুল কোনো অপরাধ নয়। তাদের এই ছোট ভুলে বড় শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে তাদের মনে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের ভবিষ্যতে আরও বড় বড় শাস্তি পেতে হবে। তারা শুরুতেই একটা নেতিবাচক বিষয়ের মুখোমুখি হচ্ছে। এতে করে তারা নিজ যোগ্যতা দিয়ে কিছু অর্জন করার মানসিকতা হারিয়ে ফেলবে।’ সমাপনী পরীক্ষাটি বাতিল করে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাইরের অনেক দেশে শিশুদের জন্য কোনো পরীক্ষার ব্যবস্থাই নেই। কোথাও কোথাও পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও খাতাশূন্য রেখে গেলেও ওই শিশুর শূন্য খাতার ওপরও নম্বর দেওয়া হয়।’
এদিকে শিশুদের বহিষ্কারের বিষয়ে উদ্বিগ্ন প্রকাশ করে বাংলাদেশ অভিভাবক ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ পরীক্ষা নেওয়াই উচিত নয়, সেখানে এই কোমলমতি শিশুদের ওপর সৃজনশীল প্রশ্নের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন যদি সৃজনশীলই হয় তাহলে ওই শিশুর নকল করার সুযোগ নেই। তার ওপর এই বয়সে নকল সে বোঝে না। আসলে মূল বিষয় হলো, একটি চক্র এই পরীক্ষা চালু রেখেছে কোচিং বাণিজ্যকে টিকিয়ে রাখতে। এটি একটি ষড়যন্ত্র। দেশের মেধাবী কোমলমতি শিশুদের মেধাহীন করার জন্য এটি একটি বড় চক্রান্ত। আমরা অভিভাবকরা এ পরীক্ষা বাতিলের জন্য প্রথম থেকেই আন্দোলন করে আসছি।’
এদিকে নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষকও শিশুদের বহিষ্কারের বিষয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বলেন, ‘শিশুর মন খুবই কোমল। তাদের মনে আঘাত দেওয়া উচিত নয়। অথচ সরকারি আদেশ আমাদের মানতে হয়। কিছু করার থাকে না।’
এদিকে শিশুদের বহিষ্কারের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব মো. আকরাম আল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাধারণত শিশুরা নকল করা বোঝে না। সমাপনী পরীক্ষায় বহিষ্কারের ঘটনাও আছে বলে আমার নজরে খুব একটা আসেনি। তারপরও নিয়ম হিসেবে কিছু বিধিনিষেধ রাখা হয়। কেউ যদি নকল করে তাকে ক্ষমা করার মতো হলে ক্ষমা করে দেওয়া উচিত। তারপরও কিছু কিছু অপরাধ আছে যা সংঘটিত করলে তার শাস্তি পাওয়া উচিত। কারণ ওই শিশু শিখবে অপরাধ করলে শাস্তি পেতে হয়।’
