এরশাদের শাসনামলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসানের চাপেই সগিরা মোর্শেদ সালাম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত ‘শুটার’ মারুফ রেজাকে বাঁচানোর চেষ্টা হয়েছিল বলে বলছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, মারুফ রেজার বদলে সনাতন ধর্মাবলম্বী মুন্সীগঞ্জের দরিদ্র কুঞ্জ মিস্ত্রির নিরপরাধ ছেলে মন্টু ম-লকে এ হত্যা মামলার একমাত্র আসামি করা হয় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চাপেই।
রাজধানীতে ১৯৮৯ সালের সেই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ৩০ বছর পর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআই চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য উদঘাটনের কথা জানিয়েছে। পিবিআই কর্মকর্তারা বলছেন, সে সময়ের তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কার কী ভূমিকা ছিল সেসব বিষয়েও জানার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি সগিরা মোর্শেদ হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি মারুফ রেজা ওরফে শুটার মারুফের অতীতের বিশেষ করে এরশাদের শাসনামলের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সব তথ্য চেয়ে রাজধানীর থানায় থানায় চিঠি দেওয়া হয়েছে।
পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা মূলত খুনের মামলার তদন্ত করছি। অতীতে কার কী দায়িত্ব ছিল সে বিষয়ে কোনো অসংগতি বা ‘গ্রস মিসটেক’ (উদ্দেশ্যমূলক ভুল) পাওয়া গেলে সেটি বিভাগীয় মামলার মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট পিবিআইয়ের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা সগিরা মোর্শেদ হত্যা মামলার তদন্তে অনেক নতুন তথ্য বের হয়ে আসছে। এরশাদের শাসনামলের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসানের প্রত্যক্ষ চাপেই তার ভাগ্নে মারুফ রেজাকে মামলার চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়। ফাঁসানো হয় নিরপরাধ মন্টু ম-ল নামে এক যুবককে, যিনি মুন্সীগঞ্জ থেকে রাজধানীতে এসেছিলেন পাসপোর্ট তৈরির কাজে। সে সময় সগিরা মোর্শেদ হত্যাকাণ্ডে শুটার মারুফের সংশ্লিষ্টতার তথ্য জানতে পারলেও তাকে মামলার চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়।
তারা আরও জানান, সে সময়ে মারুফ রেজার অপরাধমূলক কর্মকা-ের যাবতীয় তথ্য চেয়ে বিভিন্ন থানায় চিঠি দেওয়া হয়েছে। তার বিষয়ে আরও কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেলে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট পিবিআইয়ের আরেক কর্মকর্তা বলেন, সিদ্ধেশ্বরীতে সগিরা মোর্শেদকে গুলি করে হত্যার সময় মারুফ রেজার বয়স ছিল প্রায় ১৯ বছর। সে সময় মারুফ কোনো কাজ করতেন না। নবম শ্রেণির পর আর স্কুলে যাননি। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদুল হাসানের ফুপাতো বোন সুফিয়া বেগমের তিন ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে মারুফ সবার ছোট। এরশাদের শাসনামলে মূলত তার দাপটেই মারুফ অপরাধজগতের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে। রাজধানীর রমনা, শান্তিবাগ, মালিবাগ, নিউ মার্কেট, মতিঝিল ও সায়েদাবাদ পর্যন্ত গড়ে তোলে অপরাধীদের সিন্ডিকেট। জড়িয়ে পড়েন চাঁদাবাজি, দখল ও ছিনতাই কর্মকা-ে। সায়েদাবাদের ‘হরর মুন্না’ হিসেবে পরিচিত সন্ত্রাসীর মাধ্যমে অস্ত্র সংগ্রহ করে বিভিন্ন অপরাধ কর্মকা- চালিয়ে যান। তার কাছ থেকে আনা ওই অস্ত্র দিয়েই সগিরা মোর্শেদকে গুলি করে হত্যা করেন মারুফ। সেই থেকে তিনি ‘শুটার’ মারুফ হিসেবে পরিচিত।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, সগিরা মোর্শেদকে গুলি করে হত্যার কথা স্বীকার করে ৪৯ বছর বয়সী মারুফ এখন কারাগারে। প্রথম দিকে তিনি তার গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের সদর বলেছিলেন, যেখানে তার মামা মাহমুদুল হাসানের বাড়ি। তবে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের ব্যাজড়া গ্রামে তার স্থায়ী ঠিকানার নতুন তথ্য পাওয়া গেছে, যা যাচাই করা হচ্ছে।
রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরীতে ৬৭ নম্বর হাফিজ স্টেট নামের সীমানায় যেসব বাড়ি রয়েছে তার সবই মারুফ রেজাদের। তবে তিনি পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছেন, সেখানকার যতটুকু জায়গা তিনি পেয়েছিলেন তার সবই বিক্রি করে দিয়েছেন। গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত পরিবার নিয়ে ভাড়া থেকেছেন নিউ বেইলি রোডের ১৩৩ নম্বর বাড়িতে। নির্মাণাধীন ফ্ল্যাট কিনে তা বিক্রির পেশায় নিয়োজিত বলেও দাবি করেন।
পিবিআইয়ের পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই মামলার প্রকৃত আসামিদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আশা করছি। এখন আইনগতভাবেই সবকিছুর ফয়সালা হবে। কে দোষী আর কে নির্দোষÑ তা বিচারিক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হবে। তিনি বলেন, সগিরা মোর্শেদ হত্যা মামলার ২৬তম তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি। এই মামলার তদন্তের স্বার্থে যা যা করণীয় তার সবই করা হচ্ছে।
১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই বিকেলে স্কুল থেকে মেয়েকে আনতে রিকশায় করে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সামনে যাওয়ার পর সগিরা মোর্শেদের পথ আটকান মোটরসাইকেল আরোহী মারুফ ও রেজওয়ান। হাতব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার পর তাকে গুলি করে হত্যা করেন মারুফ। এ ঘটনার প্রায় ৩০ বছর পর চলতি মাসে সগিরা মোর্শেদের ভাশুর ও জাসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই জানিয়েছে, দুই ভাইয়ের স্ত্রীদের মধ্যে ঈর্ষা থেকে খুন হয়েছিলেন ছোট ভাইয়ের স্ত্রী সগিরা মোর্শেদ। গ্রেপ্তার সগিরার ভাশুর ডা. হাসান আলী চৌধুরী (৭০), তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহিন (৬৪), শাহিনের ভাই আনাছ মাহমুদ রেজওয়ান (৫৯) ও মারুফ রেজা (৪৯) হত্যাকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ততা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে কারাগারে রয়েছেন। জবানবন্দিতে ডা. হাসান বলেছেন, স্ত্রীর কথায় প্ররোচিত হয়ে ছোট ভাইয়ের বউকে শায়েস্তা করার জন্য ২৫ হাজার টাকায় বেইলি রোড এলাকার ‘সন্ত্রাসী’ মারুফ রেজাকে ভাড়া করেছিলেন তিনি। সে সময় তার রোগী ছিলেন মারুফ রেজা।
