শীতের সকালটায় পশ্চিমবঙ্গের সব গ্রামই খুব সুন্দর লাগে। কেমন যেন মায়াবী আলোয় কুয়াশাঢাকা চাদরে আগাপাছতলা মুড়ে অলস হয়ে শুয়ে আছে। কাছ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে তিরতিরে নদী। ভারি মিষ্টি। কোনো এক অচেনা বালিকার মতো রিনরিনে গলায় সে ডাকে আয় আয় করে। এ সময় রাঢ় অঞ্চল আরও সুন্দর। অযোধ্যা, বাঘমুণ্ডি, চড়িদা, বান্দোয়ান, ঝাড়গ্রাম আদিবাসী অধ্যুষিত বিপুল বিস্তীর্ণ পশ্চিমবঙ্গের এই পশ্চিম এলাকা দিয়েই একদিন আর্যরা বঙ্গে প্রবেশ করেছিল।
পাহাড় নদী জঙ্গল এই মালভূমি এলাকায় সন্ধ্যে হতে না হতেই কানে আসবে মাদলের বোল। শহুরে সভ্যতা থেকে অনেক দূরে নিভু নিভু আলোয় জেগে ওঠে জঙ্গল মহল। ঘরে ঘরে শুরু হয় আদিবাসী জনতার প্রিয় ছৌ নাচ। সে নাচ যারা দেখেছেন তারা জানেন এ এক অপূর্ব নৃত্যশৈলী। ওই নাচের অন্যতম বৈশিষ্ট্য শুরুতেই গণেশ বন্দনা করা। গণেশ পুরাণকথায় সিদ্ধিদাতা। তার দোয়া বা আশীর্বাদ নিয়ে অনুষ্ঠান শুরু এক প্রাচীনতম রীতি।
এই রীতি মেনেই আপনারা খেয়াল করবেন আমি অধিকাংশ সময় যখনই লিখতে বসেছি, তখনই আমার আরাধ্য শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির বন্দনা দিয়ে লেখা শুরু করেছি। কারণ আমাদের হিন্দুত্ববাদী এই শাসক দলের কাছে আমজনতার ঋণের শেষ নেই। প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে তারা নতুন নতুন সাংস্কৃতিক উপাদান উপহার দিয়ে বঙ্গসংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করছে।
কখনো আমরা দলের সভাপতির মুখনিঃসৃত বাণী শুনছি যে, বিদেশি গরুকে মা নয় ডাকতে হবে আন্টি বলে। জানতে পারছি দেশি গরুর দুধ ঈষৎ হলুদ। কারণ গরুর বাঁটে সোনা থাকে। কখনো আবার মাননীয় এক মন্ত্রী মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে ‘সহজ পাঠ’ বইটি বিদ্যাসাগর লিখেছিলেন। সবাই এতদিন নিশ্চিত ছিলেন যে, সহজ পাঠ লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের নিদান ধারণাকে কেমন অক্লেশে বদলে দিল।
এ রকম কত কত উপাদানে যে আমরা সমৃদ্ধ হচ্ছি তা বলে বোঝাতে পারব না। কয়েক দিন আগে পশ্চিমবঙ্গের জাতীয় কংগ্রেসের সদর দপ্তর বিধানভবনে আমাদের কেন্দ্রীয় শাসক দল মৃদু হামলা চালিয়ে রাহুল গান্ধীর কাট আউট ভেঙে যাবতীয় ক্ষোভ উজাড় করে দিল। এও এ রাজ্যে এক অভিনব নয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতি। গণতন্ত্রের এই মহান কীর্তি এর আগে কখনো কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। এক দল প্রকাশ্যে দিনের আলোয় অন্য দলের দপ্তরে ভাঙচুর করছে, বহুদিন সংবাদমাধ্যমে আছি এ রকম অশ্লীল ঘটনা এর আগে ঘটেছে বলে মনে করতে পারছি না।
বিজেপি সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি ইতিমধ্যেই এ রাজ্যে আমদানি করতে পেরেছে, তা নিঃসন্দেহে ভয়ংকর এক আতঙ্ক জনমনে চালিয়ে দেওয়া। ভয়, ভয় আর ভয়। আপনি পশ্চিমবঙ্গের জেলায় জেলায় ঘুরুন। গ্রামের পরে গ্রামে যান সব জায়গায় দেখবেন সাধারণ মানুষের আলোচনায় ঘুরেফিরে ঠিক চলে আসছে ‘এনআরসি’ হবে কি হবে না তাই নিয়ে চরম উদ্বেগ। কল্পনা করতে পারবেন না যে গ্রামে গ্রামে গরিবস্য গরিব লোক ছুটে ছুটে আসছে বাইরে থেকে কেউ এলেই তার কাছ থেকে সান্ত্বনা পেতেÑ আমাদের কি কেউ তাড়িয়ে দেবে! অনেকে বলতে পারেন, আসামে যে ‘এনআরসি’ হয়েছে তা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে। এর সঙ্গে বিজেপি বা সংঘপরিবারের কোনো যোগ নেই। তাদের পাল্টা প্রশ্ন করতে চাই যে, তাহলে কোন অধিকারে শাসক দলের নেতা-মন্ত্রীরা ‘ঘুষপেটিয়া’, ‘ঘুষপেটিয়া’ বলে বাজার গরম করে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতি করছেন!!
বাস্তবে বীরভূম, মালদা, মুর্শিদাবাদ, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি যেখানে যাবেন সেখানেই দেখবেন হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে গরিব মানুষ আতঙ্কে ভুগছেন ‘এনআরসি’ বা ‘নাগরিক পঞ্জি’ হলে নাগরিক তালিকায় নাম থাকবে কি থাকবে না, তাই নিয়ে। কত কত লোক এর মধ্যে আতঙ্কে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। বিরোধী রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রোজ সকাল-বিকাল মিটিং করে জেলায় জেলায় মানুষের কাছে আবেদন করছেন আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য। কিন্তু একবার যদি মনে ভয় ঢুকে যায় তা দূর করা কত কঠিন, ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন।
‘এনআরসি’ হবে কি না, হলেও তা কোন বছর থেকে ভিত্তি বর্ষ ঠিক হবে এখনো তা স্পষ্ট করে কিছু বলা হচ্ছে না। অথচ হবে হবে ভেবে চরম এক অস্থিরতা তৈরি করা হয়েছে মানুষের মধ্যে। ফলে কাজকর্ম লাটে উঠেছে ইতিমধ্যেই। অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়ছে। নিম্ন আয়ের লোকজন কাজ ফেলে ছুটছেন নিজের নিজের গ্রামে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, জমির দলিল, রেশন কার্ড কিংবা জন্মের সার্টিফিকেট আনতে। পেলে একরকম। না পেলে হতাশা তাকে কুরে করে খাচ্ছে। ধরুন গরিব সবজি বা মাছ ব্যবসায়ী অথবা জনমজুর, বাড়ির ঠিকে কাজের লোক, কাজের কারণে কলকাতায় থাকেন। এখন ছুটতে হচ্ছে সব ফেলে উত্তর বা দক্ষিণ বাংলার কোনো প্রত্যন্ত গ্রামে নিজেদের বসতভিটেতে। আসা যাওয়ার ট্রেন বা বাসের টিকিট। দু’তিন দিনের রাহা খরচ এবং মাইনে না পাওয়ার প্রবল আশঙ্কা সবমিলিয়ে মাথা পিছু আর্থিক লোকসানটা একবার কত হতে পারে মনে মনে অঙ্ক কষে বোঝার চেষ্টা করুন। আগে দেখুন ব্যক্তি লোকসান। তারপর আন্দাজ করুন সামগ্রিক ছবিটা কী হতে পারে। পাশাপাশি মনে রাখবেন এই মুহূর্তে আমাদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুব, খুবই খারাপ। সংগঠিত অসংগঠিত সব শিল্পে হু হু করে বাড়ছে বেকারের সংখ্যা। কৃষির অবস্থা আরও খারাপ। দর্জি, বিড়ি, জরি, রেশম, গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যান্য ভিত্তি খুব নড়বড়ে হয়ে পড়েছে এর মধ্যেই। এমনিতে মৃতপ্রায় জনমানসে ‘এনআরসি’ আতঙ্ক যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। ইচ্ছে করে এই ভয়াবহ পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে।
শিরদাঁড়া সোজা রাখা মানুষ কবে কোথায় কোন শাসক দলই আর পছন্দ করে। হাল্কা চালে লেখার শুরুতেই যা বলেছি, আবারও বলব যে শাসক বন্দনা করছি এ জন্যই যে, তাদের মধ্যে নতুন করে পুরনো অনুষঙ্গ দেখতে পারছি। ফ্যাসিবাদ এভাবেই ফিরে ফিরে আসে। জনমনে প্রবলভাবে আতঙ্কের মধ্য দিয়ে সে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর রোধ করতে চায়। একদা ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে চরম দক্ষিণপন্থি উগ্র জাতীয়তাবাদের বাতাস যারা বইয়ে দিচ্ছে তাদের ‘কুর্নিশ’ জানাতেই হয়।
লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা
