নতুন সড়ক পরিবহন আইন

ঢাকায় বাস সংকট আতঙ্কে মালিক চালকরা

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০১৯, ১২:৪৭ এএম

নতুন সড়ক পরিবহন আইনের আওতায় জেল-জরিমানার ভয়ে প্রতিদিনই রাজধানীতে কমছে বাস। গত সোমবার ভ্রাম্যমাণ আদালত বসার পর সে বাস সংকট আরও বাড়ে। আর গতকাল রাজধানীতে দেখা দেয় চরম বাস সংকট। অল্প কিছু বাস চললেও সেগুলোতে ঠাসাঠাসি করে যাত্রী তুলতে দেখা গেছে। এতে তীব্র ভোগান্তিতে পড়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
গত ১ নভেম্বর আইন কার্যকরের ১৭ দিন পর গত সোমবার থেকে মাঠে নামে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ভ্রাম্যমাণ আদালত। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ গতকাল পর্যন্ত আইন বাস্তবায়ন শুরু করেনি। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সড়ক-মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহনগুলোর বিশেষ করে বাসের চালকদের অধিকাংশরই বৈধ লাইসেন্স নেই। নকল লাইসেন্স বা ভুয়া কাগজপত্র নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন
অনেকেই। হালকা যানবাহনের চেয়ে ভারী যানবাহনের চালকদের লাইসেন্স সমস্যা বেশি। এরা হালকা যানবাহনের লাইসেন্স নিয়ে ভারী যানবাহন চালাচ্ছে। বাসের ফিটনেসসহ অন্যান্য কাগজপত্রও বেশিরভাগের মেয়াদ উত্তীর্ণ। অধিকাংশ বাসে ৩৮ সিটের অনুমতি থাকলেও ৪৫ থেকে ৫০ সিটে উত্তীর্ণ করা হয়েছে।
ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিষয়ে বিআরটিএ পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) এ কে এম মাসুদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে আজ (মঙ্গলবার) আটটি স্পটে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়েছে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ৭৯টি মামলা ও ১ লাখ ১৯ হাজার ২০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তবে কাউকে জেল দেওয়া হয়নি।’ তিনি জানান, গত সোমবারও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৮৮টি মামলা এবং ১ লাখ ২১ হাজার ৯০০ টাকা জরিমানা করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত চলবে।
বিআরটিএ’র তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাস, মিনিবাস ও হিউম্যান হলারসহ দেশে মোট নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৩১ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৯। এর বিপরীতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালক আছেন ২০ লাখ। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে ট্রাক-বাস-মিনিবাসসহ যানবাহন চলছে ৮০ লাখের বেশি। কিন্তু বিআরটিএ থেকে মাত্র ২০ লাখ চালকের বৈধ লাইসেন্স রয়েছে।
গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, সকালে বাসের সংখ্যা ছিল খুবই কম। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসের সংখ্যা কিছুটা বাড়তে থাকে। মিরপুর-১, শ্যামলী, আসাদগেট, ফার্মগেট, শাহবাগ, আজিমপুরসহ বিভিন্ন স্থানে সকালে বাসের অপেক্ষায় পথচারীদের অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। যেসব বাস আসছিল তার বেশিরভাগই ছিল যাত্রীবোঝাই। এরপরও ঠাসাঠাসি করে যাত্রী তুলতেও দেখা গেছে বাসগুলোয়। এ সময় বেশি বিড়ম্বনায় পড়েন নারী যাত্রীরা। গতকাল সকাল ৯টার দিকে মিরপুর-১ নম্বর বাসস্ট্যান্ডে কথা হয় জেসমিন খাতুন নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার সঙ্গে। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘ফার্মগেট যাওয়ার জন্য ৩০ মিনিট ধরে অপেক্ষা করছি। বাস খুবই কম। যাও আসছে ওঠার মতো জায়গা নেই। গত বেশ কয়েক দিন ধরেই এ সমস্যায় ভুগছি।’
বিভিন্ন বাসের চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যেসব চালকের বৈধ লাইসেন্স নেই তারা বাস চালাচ্ছে না। এছাড়া অনেক বাসের কাগজপত্র ঠিক নেই। ফলে মালিকরা মামলার ভয়ে বাস নামাচ্ছেন না। ফার্মগেট এলাকায় কথা হয় লাব্বাইক বাসের চালক জহিরের সঙ্গে। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘নতুন আইন অনুযায়ী বাস চালানো কঠিন। আমার কাগজপত্র ঠিক থাকলেও বাসটি ৩৮ সিটের অনুমতি নিয়ে ৪৫ সিট করেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত আটকালে মামলা অবধারিত। তারপরও পেটের দায়ে রাস্তায় নেমেছি।’ তিনি বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালত হয়রানি কম করে। কিন্তু সার্জেন্টরা অভিযান শুরু করলে আর বাস চালাব না।’
এ ব্যাপারে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘নতুন আইন বাস্তবায়ন হলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। কিন্তু আইনের বিরোধিতা করে একশ্রেণির অসাধু চালক ও মালিক সাধারণ মানুষকে জিম্মি করছে। আমাদের গণপরিবহন সেক্টরের সংকটকে এরা ব্যবহার করছে। রাস্তায় গাড়ি নামাচ্ছে না। এতে ভোগান্তিতে পড়ছে সাধারণ মানুষ। গণপরিবহনের এই সংকট মোকাবিলায় সরকারকে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনোভাবেই এদের কাছে নতিস্বীকার করা যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রায় ৮০ লাখ যানবাহনের বিপরীতে ২০ লাখ চালকের বৈধ লাইসেন্স আছে। বাকি ৬০ লাখ চালকের বৈধ লাইসেন্স না থাকায় এরা রাস্তায় নামতে ভয় পাচ্ছে। এদের ব্যবহার করে শ্রমিক ও মালিকদের একটি অংশ পরিবহন সেক্টরে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে।’
এদিকে গতকাল আইন কার্যকরের ১৯ দিন পার হলেও রাজধানীতে ট্রাফিক পুলিশ কোনো অভিযান চালাচ্ছে না। নতুন আইন বাস্তবায়নের জন্য ডিজিটাল পজ মেশিন বা মামলার কাগজের স্লিপ কোনোটিই ট্রাফিক পুলিশের হাতে পৌঁছেনি জানিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফলে মামলাও দিতে পারছে না তারা। আইন অমান্যকারীদের সচেতন করেই দিন পার করছে। ট্রাফিক পুলিশের তেজগাঁও অঞ্চলে দায়িত্ব পালনকারী সার্জেন্ট আবদুর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাস্তায় বাস অনেক কম। খুব একটা নিয়ম লঙ্ঘন করছে না কেউ। আর মামলার জন্য পজ মেশিন ও সিøপ কোনোটাই আমাদের হাতে পৌঁছেনি। ফলে আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা এখন দিচ্ছি না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত