ফুটবলার নিবন্ধনের জন্য এক মাসের বেশি সময় পেলেও বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের দলগুলোর হুঁশ হয়েছে শেষ মুহূর্তে। গতকাল মোট ৪টি দল বাফুফেতে ভিড় জমিয়েছিল দলবদলের আনুষ্ঠানিকতা সারতে। গতবারের চ্যাম্পিয়ন বসুন্ধরা কিংস, তৃতীয় স্থানে থাকা শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্র, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব এবং নবাগত পুলিশ ফুটবল ক্লাব আনুষ্ঠানিকতা সেরেছে। এর মধ্যে বসুন্ধরা কিংস এবং শেখ রাসেল দল গড়েছে মৌসুমের তিনটি শিরোপায় চোখ রেখে। আর মোহামেডান এবং পুলিশ এফসি মাঝারিমানের দল নিয়ে চাইছে একটা সম্মানজনক অবস্থান। তবে বসুন্ধরা কিংসের মতো এ দুটি দলই কাল বাফুফে ভবনে হাজির হয়েছিল ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোড়ার গাড়ির র্যালি করে। সব মিলিয়ে বাফুফে ভবন কাল পরিণত হয়েছিল খেলোয়াড়, কর্মকর্তা এবং সমর্থকের মিলনমেলায়।
আরও শক্তি সঞ্চয় কিংসের
গত মৌসুমে প্রথমবারের মতো শীর্ষ লিগে নাম লিখিয়েই সাফল্য পেয়েছিল বিগ বাজেটের বসুন্ধরা কিংস। চড়া পারিশ্রমিকে স্থানীয় ফুটবলারের পাশাপাশি তারা উড়িয়ে এনেছিল ২০১৮ বিশ্বকাপে খেলা কোস্টারিকার ফুটবলার দানিয়েল কলিনদ্রেসকে। লিগ এবং স্বাধীনতা কাপ শিরোপা জেতা কিংস এবার চাইছে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে এএফসি কাপে। সেখানে ভালো করার লক্ষ্য নিয়ে তারা এবার আরও শক্তি সঞ্চয় করেছে। নাম লিখিয়েছে ১০জন জাতীয় দলের ফুটবলারকে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় দলে খেলা বেশ ক’জনও রয়েছে কিংস স্কোয়াডে। এছাড়া কলিনদ্রেস এবং উজবেক ফরোয়ার্ড বখতিয়ার দুইশবেকভের সঙ্গে যোগ করিয়েছে আর্জেন্টিনার নিকোলাস দেলমন্তে এবং তাজিকিস্তান জাতীয় দলের অধিনায়ক আখতাম নাজারভকে। ফিনল্যান্ড বংশোদ্ভূত বাংলাদেশি মিডফিল্ডার তারিক কাজিকে স্বাক্ষর করিয়ে আরেকটি চমক দিয়েছে তারা। ক্লাবটি এবার নতুন ১৩ জন ফুটবলারকে দলে নিয়েছে। এর মধ্যে জাতীয় দলে নিয়মিত খেলা ডিফেন্ডার ইয়াসিন খান, বিশ্বনাথ ঘোষ এবং বিপলু আহমেদকে শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্র থেকে নিয়েছে তারা। জাতীয় দলের উইঙ্গার রবিউল হাসানকে তারা নিয়েছে আরামবাগ থেকে। এর বাইরে জাতীয় দলে খেলা গোলরক্ষক আনিসুর রহমান, ডিফেন্ডার সুশান্ত ত্রিপুরা, স্ট্রাইকার মতিন মিয়া, তৌহিদুল আলম সবুজ, মাহবুবুর রহমান সুফিল, উইঙ্গার মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে রেখে দিয়েছে তারা। ক্লাবটির সভাপতি ইমরুল হাসান বলেছেন, ‘গতবার রক্ষণভাগ আমাদের বেশ ভুগিয়েছে। তাই এবার এই পজিশনে খুব জোর দিয়েছি। আমাদের রক্ষণভাগ এখন বেশ শক্তিশালী। এএফসি কাপে এবার আমরা দেশের প্রতিনিধিত্ব করব। আন্তর্জাতিকভাবে দেশের নাম ছড়িয়ে দেওয়াই হবে আমাদের মূল লক্ষ্য।’
আগের চেয়ে ব্যালান্সড শেখ রাসেল
গত লিগে তৃতীয় হয়েছিল শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্র। এবার অবশ্য দলটির লক্ষ্য নিজেদের অবস্থানে উন্নতি ঘটানো। তাই তারা মনোযোগ দিয়েছে ভালো মানের স্থানীয় ও বিদেশি ফুটবলার সংগ্রহে। দলের কোচ সাইফুল বারী টিটুর দাবি, গতবারের চেয়ে অনেক বেশি ব্যালান্সড দল গড়েছেন তারা। যদিও বসুন্ধরার হানায় তাদের হারাতে হয়েছে জাতীয় দলের তিন খেলোয়াড়কে। ইয়াসিন, বিশ্বনাথ এবং বিপলুর শূন্যতা পূরণ ছিল টিটুর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, ‘এই তিনজনের বিকল্প নিয়েই আমাদের বেশি কাজ করতে হয়েছে। আমি মনে করি গতবারের চেয়ে এবারের দলটি ব্যালান্সড হয়েছে। গতবারের চেয়ে ভালো করতে পারলেই আমাদের লক্ষ্য পূরণ হবে।’ টিটু মনে করেন এবারের লিগও হবে অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, ‘এবার কমপক্ষে ৬-৭টি দল শিরোপার লক্ষ্য নিয়ে দল গড়েছে। তারা ভালোমানের বিদেশি সংগ্রহ করেছে। ফলে খেলা খুব প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে।’ গোলরক্ষক আশরাফুল ইসলাম রানা ছাড়া রাসেলে এবার জাতীয় দলের আর কোনো ফুটবলার নেই। তবে স্ট্রাইকার তখলিস আহমেদের মতো গত মৌসুমে ভালো খেলা বেশ ক’জন ফুটবলারকে তারা দলে নিয়েছে।
ঐতিহ্য ফেরাতে মরিয়া মোহামেডান
একটা সময় সামনের মৌসুমে দল গঠনই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল মোহামেডানের। ক্যাসিনো ক্যালেঙ্কারিতে জড়িয়ে যাওয়ায় ক্লাবটির ঐতিহ্য পড়েছিল শঙ্কার মুখে। কিন্তু ক্লাবটির ক্রান্তিলগ্নে ঠিকই এগিয়ে এসেছেন মোহামেডানের হয়ে এক সময় আলো ছড়ানো একঝাঁক সাবেক ফুটবলার। পাশে পেয়েছেন এতদিন বঞ্চিত থাকা মোহামেডানপাগল কিছু প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং সংগঠকদের। যারা এক হয়ে গড়েছেন তারুণ্যনির্ভর একটি দল। এ দলে নামি কোনো খেলোয়াড় নেই বললেই চলে। তবে অস্ট্রেলিয়ান কোচ শন লিনের ওপর আস্থা রেখে তারা দাবি করছে বিদেশ থেকে ৫ জন ভালোমানের ফুটবলার দলে নেওয়ার। গত বছর খেলা মালির স্ট্রাইকার সুলেমান দিয়াবাতে এবং জাপানিজ মিডফিল্ডার উরিউ নাগাতাকে রেখে দিয়েছে তারা। ক্লাবের সাবেক অতিরিক্ত সাধারণ সম্পাদক এবং স্থায়ী সদস্য মোস্তাকুর রহমান, ‘আমরা মোহামেডানের ক্রান্তিলগ্নে এক হয়েছি ক্লাবের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে। মোহামেডানকে শেষ হতে দেওয়া যাবে না। আমরা সবাই মোহামেডানকে এগিয়ে নেব এবং তাদের হারানোর অবস্থানে ফিরিয়ে আনব।’ দলের ম্যানেজার ইমতিয়াজ আহমেদ নকীব এই দল নিয়েও দেখছেন বড় স্বপ্ন, ‘খুব অল্প সময়ে আমরা এই দলটি গঠন করেছি। আশা করছি এই দল নিয়েই সেরা তিনের জন্য লড়াই করব।’ মোহামেডানের এক সময়ের তারকা ফুটবলার রুম্মন বিন ওয়ালি সাব্বির কথা দিয়েছেন সামনের মৌসুমে শিরোপার লক্ষ্যে শক্তিশালী দল গড়ার।
মাঠেই প্রমাণ দিতে চায় পুলিশ এফসি
বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপে লিগের শিরোপা জিতে দীর্ঘদিন পর ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে ফিরে এসেছে পুলিশ ফুটবল ক্লাব। ২০১১ সালে ফের ফুটবল দল গঠন করে এই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সে সময় থেকেই তাদের লক্ষ্য ছিল শীর্ষ লিগে খেলার। সেই লক্ষ্য পূরণের পর পুলিশ এফসি চাইছে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে। তাই এখনই তারকার পেছনে না দৌড়ে তারা তারুণ্যে আস্থা রাখছেন। তবে দলের জন্য উড়িয়ে এনেছেন ব্রাদার্স ইউনিয়নের সাবেক সাইপ্রাসের কোচ নিকোলা ভিতরভিচকে। এছাড়া ৫ জন ভালোমানের বিদেশি আনার কথাও বলেছেন ক্লাবটির কর্মকর্তারা। পুলিশ ফুটবল ক্লাবের সভাপতি এবং র্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ আশাবাদী এই দল নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে, ‘আমাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। পুলিশের সঙ্গে ক্রীড়াঙ্গনের সম্পর্ক বহুদিনের। ১৯৭২ সাল থেকে আমরা ফুটবল খেলছি। এছাড়াও অ্যাথলেটিকসেও অংশ নিচ্ছেন আমাদের অ্যাথলেটরা। আমি মনে করি, এই ফুটবলাররা দেশের দু’লাখ পুলিশের প্রতিনিধিত্ব করবেন।’ দলের ম্যানেজার এবং অতিরিক্ত আইজি শেখ মারুফ হাসান বলেন, ‘প্রিমিয়ার লিগে খেলার স্বপ্ন নিয়ে ২০১১ সালে ফুটবল দল গঠন করেছিলাম আমরা। সেই স্বপ্ন আজ বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছে। আমরা ভালো খেলার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।’
