চলমান ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় দেশের বিভিন্ন পরীক্ষাকেন্দ্রে গতকাল বৃহস্পতিবার ৫৫ জন ভুয়া পরীক্ষার্থী আটকের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীর কালমেঘ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রেই সন্ধান মিলেছে ৪৬ ভুয়া পরীক্ষার্থীর। এ ছাড়া সাতক্ষীরার দেবহাটায় ৯ ভুয়া পরীক্ষার্থী ও ১ শিক্ষক এবং লালমনরিহাটের হাতীবান্ধায় ১০ ভুয়া পরীক্ষার্থীকে আটক করা হয়।
প্রয়োজনীয় শিক্ষার্থী না থাকায় সংশ্লিষ্ট এসব মাদ্রাসার কর্র্তৃপক্ষ নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্তির জন্য শর্তপূরণ করতে টাকার বিনিময়ে আটক ওই সব শিক্ষার্থীকে ভাড়া করেছিল। সম্প্রতি সরকার নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষার্থী থাকাসহ প্রয়োজনীয় কিছু শর্তপূরণ সাপেক্ষে দেশের ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলোকে জাতীয়করণের ঘোষণা দেয়। আর এর পরিপ্রেক্ষিতে অনেক ইবতেদায়ি মাদ্রাসা কর্র্তৃপক্ষ হাতে গোনা শিক্ষার্থী থাকলেও কাগজে-কলমে অনেক বেশি ভর্তি দেখিয়ে তাদের বিপরীতে ভুয়া পরীক্ষার্থী দিয়ে পরীক্ষা দেওয়ানোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। বিস্তারিত দেশ রূপান্তরের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে।
ঠাকুরগাঁও : ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় বালিয়াডাঙ্গীর কালমেঘ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গতকাল দুপুরে ৪৬ জন ভুয়া পরীক্ষার্থীকে শনাক্ত করেন ওই কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা কেন্দ্র সচিব ও কালমেঘ আর আলী উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক হযরত আলী।
তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরীক্ষা শুরুর প্রথম দিন থেকেই সন্দেহ হয়েছিল। আর এটা সঠিক প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। পরে অনুসন্ধান চালিয়ে সত্যতা পেয়ে গত বুধবার একজন এবং আজ (বৃহস্পতিবার) আরও ৩৬ জন ভুয়া পরীক্ষার্থীকে শনাক্ত করি। বুধবার শনাক্ত করা মাদ্রাসার সব পরীক্ষার্থীই ভুয়া। কিন্তু বাকি নয়জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে আর কেউ আজকের (বৃহস্পতিবার) পরীক্ষায় অংশ নিতে আসেনি।’
কালমেঘ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে শনাক্ত হওয়া ভুয়া পরীক্ষার্থীদের মধ্যে লালাপুর স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার ১০, ছোট পলাশবাড়ি বলিদ্বারা স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার ৮, রায়পুর সাজাদ আলী স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার ১১, আরাজি সরলিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার ৬ ও লালাপুর সফিজ উদ্দীন স্বতন্ত্র মাদ্রাসার ১১ জন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শনাক্ত হওয়া ভুয়া পরীক্ষার্থীরা সম্প্রতি শেষ হওয়া জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) এবং জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষার পরীক্ষার্থী ছিল। এদের মধ্যে কিছু জেডিসি পরীক্ষার্থীকে মাথাপিছু ছয় শ টাকা দিয়ে ভুয়া পরীক্ষার্থী হিসেবে ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিতে বাধ্য করেন সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসাগুলোর প্রধানরা।
গত বুধবার ভুয়া পরীক্ষার্থী হিসেবে শনাক্ত হওয়া লালাপুর গ্রামের এক ছাত্র দেশ রূপান্তরকে বলে, ‘লালাপুর স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক ও তার ছেলে ছয় শ টাকার লোভ দেখিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে বলে। তারা বলে, এতে আমাদের কোনো সমস্যা হবে না, বাকি সবকিছু তারা ম্যানেজ করেছেন।’
এমন চিত্র ভুয়া পরীক্ষার্থী শনাক্ত হওয়া ৫টি মাদ্রাসার কর্র্তৃপক্ষেরই। সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রতি বছর ভুয়া পরীক্ষার্থী দিয়ে ভালো ফলাফল দেখিয়ে বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন মাদ্রাসাগুলোর প্রধানরা।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খায়রুল আলম সুমন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অভিভাবকের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে শনাক্ত হওয়া ৩৬ ভুয়া পরীক্ষার্থীকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত বুধবারও একজনের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। শনাক্ত হওয়া এই ৫টি মাদ্রাসার প্রধানদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উপজেলা শিক্ষা কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কালমেঘ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৭৭ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪৬ জনই ছিল ভুয়া।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোফাজ্জল হোসেন ম-ল বলেন, ‘পরীক্ষায় ডিআর ফরম অনুসারে প্রবেশপত্র ইস্যু করা হয়। ছবির সঙ্গে নামের মিল আছে কি না, তা যাচাই করে মাদ্রাসা সুপার স্বাক্ষর করার পর আমি প্রবেশপত্রে স্বাক্ষর করি। এত শিক্ষার্থীর ছবি কিংবা সে সঠিক পরীক্ষার্থী কি না তা চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। তবে মাদ্রাসার সুপাররা যোগসাজশে এমন কাণ্ড ঘটিয়েছেন।’
সাতক্ষীরা : দেবহাটায় ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে অন্য শিক্ষার্থীদের পরিবর্তে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অভিযোগে ৯ ভুয়া পরীক্ষার্থীসহ এক মাদ্রাসা শিক্ষককে আটক করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে দেবহাটার সখিপুর দাখিল মাদ্রাসা কেন্দ্র থেকে তাদের আটক করা হয়।
এদের মধ্যে আটক নুরুল ইসলাম উত্তর পারুলিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষক। আটক ভুয়া পরীক্ষার্থীরা উত্তর পারুলিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের হয়ে পরীক্ষা দিচ্ছিল। তারা উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। দেবহাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজিয়া আফরিন এসব তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘পারুলিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার এমপিও নেই। এমপিওভুক্তির শর্ত পূরণের জন্য সংশ্লিষ্ট শ্রেণিতে প্রয়োজনীয় শিক্ষার্থী না থাকায় তারা নিজেদেরই প্রতিষ্ঠানের নিচু শ্রেণির শিক্ষার্থীদের দিয়ে এই পরীক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।’
দেবহাটা থানার ওসি বিপ্লব কুমার সাহা বলেন, ‘আটক শিক্ষার্থীরা শিশু হওয়ায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজিয়া আফরিন মুচলেকা নিয়ে তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় দিয়েছেন। আর শিক্ষক নুরুল ইসলামকে আদালতে পাঠানো হবে।’
লালমনিরহাট : হাতীবান্ধায় ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১০ জন ভুয়া পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গতকাল এসএস সরকারি উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে তাদের বহিষ্কার করা হয়।
জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ‘ভাড়ায়’ এনে ওই কেন্দ্রে ভবানীপুর স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার হয়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে বিষয়টি আমলে নেয় কর্র্তৃপক্ষ। এর পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার পরীক্ষা চলাকালে এসএস সরকারি উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে ১০ জন ভুয়া পরীক্ষার্থীকে শনাক্ত করা হয় বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রসচিব ও প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম প্রধান।
২ নম্বর হাতিবান্ধা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক রোকনুজ্জামান সোহেল বলেন, ‘সরকার সম্প্রতি ইবতেদায়ি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণের ঘোষণা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তারা প্রতিষ্ঠানে ভুয়া ছাত্রছাত্রী ভর্তি দেখিয়ে তাদের নামে ভুয়া পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশ নেওয়াচ্ছে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হাতীবান্ধা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সামিউল আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিজ প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণের উদ্দেশ্যে তারা এ রকমটি করেছে বলে আমরাও শুনতে পেরেছি। এ মুহূর্তে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। তবে এর সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্ত মাদ্রাসাগুলোর বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
