বাংলাদেশ-ভারতের গোলাপি টেস্ট আজ শুরু

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০১৯, ০২:০৯ এএম

চারদিকে প্রবল উত্তেজনা। গমগম করছে। কাজের মানুষদের শশব্যস্ত ছোটাছুটি। ইডেন গার্ডেনসে এমন দিন অনেক বছরে একবার আসে। সন্ধ্যা ঘনাতে গোলাপি আলো বন্যার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। সামনের ব্যস্ত পথের নানা রকম গাড়ির শব্দ ছাপিয়ে স্টেডিয়াম ঘিরে সৌরভ গাঙ্গুলির বেঁধে দেওয়া মহাযজ্ঞ অধিকারে নিয়েছে সব। এর মধ্যেও সেই নরম আলো বড় মায়া ছড়ায়। অবশ্য ‘গোলাপি’ বিষয়টা এই কয়েক দিনে কলকাতা থেকে ‘টেস্ট’

 

 

কেড়ে নিয়েছে। মুমিনুল হকের বাংলাদেশ ও বিরাট কোহলির ভারত যে টেস্টের লড়াইয়ে নামছে আজ। ‘পিঙ্ক টেস্ট’ যার পোশাকি নাম। সঙ্গে ‘ঐতিহাসিক’ শব্দটা ব্যবহার না করলেই নয়।

সবাই জানে গোলাপি বলে কৃত্রিম আলোয় স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় শুরু ম্যাচটা ভারত-বাংলাদেশের এমন প্রথম ম্যাচ। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নতুন প্রেসিডেন্ট সৌরভ গাঙ্গুলি এই আয়োজন করেছেন। রাজ্যের ক্রিকেট সংস্থার সাবেক সভাপতি নিজের মাঠে খেলার বাইরের সবকিছু ঐতিহাসিক করে রাখতে কোনো কিছুর কমতি রাখেননি। বহু প্রাচীন শহর কলকাতার নানা অংশে গোলাপির আভা ভিন্নমাত্রা তৈরি করেছে। গোলাপি মাঠের এখানে ওখানে। অতিথিদের পায়ের নিচের গালিচাও হচ্ছে গোলাপি। পিঙ্ক আর গোলাপি শব্দ এবং গোলাপি বল নিয়ে এত আলোচনায় ম্যাচের রণকৌশল নিয়ে প্রশ্ন আসে না।

তবে বাংলাদেশ দল গতকাল ফ্লাডলাইটে শেষ প্র্যাকটিস সেরে ইডেন ছেড়ে গেলে ভারতের ইংরেজ দৈনিক মিররের সিনিয়র সাংবাদিক খুব গম্ভীর হয়ে উঁচু গ্যালারি থেকে মাঠে চোখ রেখে নিমগ্ন। দেখছেন, সন্ধ্যা নামতেই কীভাবে সব ধোঁয়াচ্ছন্ন। ভাবছেন, ম্যাচে নিশ্চিতভাবে শিশিরের প্রভাব পড়বে। সে নিয়ে কথা এত কম হলো কেন!

আসলে আয়োজনটা এত বিশাল বলে যা ঘিরে এতসব, সেই ম্যাচ গতকাল পর্যন্ত পেছনে পড়ে ছিল। দু’দলের অনুশীলন, সংবাদ সম্মেলন প্রথাগতভাবে শেষ হয়েছে। কিন্তু সবশেষে রাতেও আয়োজনের খবর নেওয়ার ব্যস্ততা। ভারত দল অপরিবর্তিত থাকবে বলে জানা। বাংলাদেশ দলে তিন পেসার। মোস্তাফিজ-আল আমিনকে জায়গা দিতে ইবাদত-মিরাজদের বসে যাওয়ার খবর আছে। তবে আসলে কি তা মূল একাদশ দেখার আগে নিশ্চিত হবেন কীভাবে?

প্রায় ৭০ হাজার দর্শক থাকবেন। কান পাতা দায় হবে। টেস্টের শুরু ও শেষে অনুষ্ঠান। মাঝের দুই বিরতিতেও। রাতে চেয়ার সাজিয়ে টেন্ডুলকার-সৌরভদের ফ্যাবুলাস ফাইভের টক শোর মহড়া চলে। বাদক দল অনুশীলন চালায়। রঙিন প্ল্যাকার্ড, ছাতা এটা-ওটা নিয়ে শুরু রিহার্সেল। মাইক্রোফোন টেস্ট হয়। সাদা চাদরে ঢেকে দেওয়া মাঠে একসময় বাদ্য দল মূর্ছনা তোলে, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’ বেজে ওঠে ‘জনগণমন অধিনায়ক জয় হে...।’

বাইরে তখনো ভীষণ ব্যস্ততা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসবেন, থাকবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। ইডেনের যে ঘণ্টা ইতিহাসের ধারক সেটি বাজিয়ে উদ্বোধন করবেন ম্যাচের। বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট খেলা ক্রিকেটাররা আমন্ত্রিত হয়ে কলকাতায় পা রেখেছেন সন্ধ্যায়। আগের দিন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কর্তাব্যক্তিরা চলে এসেছেন। আরও আসার পথে। নিমন্ত্রিত কিংবদন্তি ভারতীয় ক্রিকেটার-খেলোয়াড়-অলিম্পিয়ানদের অনেকে পা রেখেছেন উৎসব নগরে। এই আসা আজও। রুনা লায়লা এবং ভারতীয় শিল্পীদের গানও থাকছে।

ইডেনে তাই পুলিশের শীর্ষকর্তারা তাদের প্রস্তুতির শেষটা ঝালিয়ে নিচ্ছেন। কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনের কর্তারা আরেকবার চোখ বুলিয়ে গেলেন। এর মধ্যে একটা কণ্ঠ আকুল হয়ে উড়ে আসে ভিড় থেকেÑ ‘দাদা, একটা টিকিট হবে?’ তা কি আর হয়? প্রথম চার দিনের টিকিট যে দুদিন আগে বিক্রি হয়ে গেছে!

একে গোলাপি বলে প্রথম ম্যাচ, রাতের আলোয় খেলা। তার ওপর পেছনে ইন্দোরে ইনিংস ও ১৩০ রানে হারের শোচনীয় অভিজ্ঞতা। আর এখন প্রায় ৭০ হাজার স্বাগতিক উৎসবমুখর দর্শকের সামনে খেলা। এ চাপ কীভাবে সামলাবে বাংলাদেশ?

ওটাকে কোনো ভাবনার বিষয় না মেনে মুমিনুল জানিয়ে গেলেন, ‘এই চাপ কোনোভাবেই আসা উচিত নয়। যে যার কাজ ঠিকমতো করছি। চাপ চলে আসার কোনো সুযোগ নেই।’ গোলাপি বলের টেস্ট দুই দলের কাছে অজানা। মুমিনুল বললেন, ‘আমরা সুযোগ কাজে লাগানোর দিকে তাকিয়ে আছি। ম্যাচ নিয়ে আমরা রোমাঞ্চিত।’

কিন্তু এমন সমুদ্রের গর্জনের মতো বিরুদ্ধ সমর্থনকে সম্ভবত উপেক্ষাও করা যায় না। ভারত নেতা কোহলির মনে পড়ে যায় এখানে শেষ যেবার এমন হইহই রইরইয়ের মধ্যে ম্যাচ খেলেছেন সেটির কথা। ‘চমৎকার এক উপলক্ষ। এটা চ্যালেঞ্জও। পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ইডেনে খেলার সময় এমন রোমাঞ্চের মধ্য দিয়ে আমরা গেছি। তখনো এখানে বড় নাম ছিল, সংবর্ধনার ব্যবস্থা আর পরিপূর্ণ স্টেডিয়াম ছিল। এটা কঠিন বা ভয় পাওয়ার মতো পরিবেশ নয়। এটা খুব রোমাঞ্চের।’ তারপরই কোহলি আসল কথায় আসেন, ‘কোনো ব্যাটসম্যানকে আউট করলে আমরা খুব সমর্থন পাব। বোলার নতুন বল হাতে মার্কে দাঁড়ালে ৮০ হাজার মানুষের প্রেরণা পাবে। এর বিরুদ্ধে খেলা সহজ নয়। বোলারকে উৎসাহিত করবে নিশ্চিত। লোকেও উপভোগ করবে। এমন মাইলফলক মুহূর্তে নতুন ট্রেন্ড শুরু করতে পারছি বলে আমরা ভাগ্যবান। এটা সম্মানের।’

ভারতের মাটিতে গোলাপি টেস্টের যাত্রা শুরুর সেই সম্মানের ভাগীদার বাংলাদেশও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটা একটা খেলা। একটা সিরিজের শেষ টেস্ট। ১-০তে এগিয়ে ভারত। প্রতিপক্ষকে হোয়াইটওয়াশ করার অপেক্ষা। বিশ্বের সেরা দলের সঙ্গে অপ্রস্তুত এক দলের এমন ম্যাচের ভাগ্য আগে থেকে অনুমেয়। কোহলির জন্য তাই যে ম্যাচ সম্মানের, পারফরম্যান্সের অভাবে বাংলাদেশের জন্য সেটি অসম্মানের না হলেই হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত